পৃথিবীর সবচেয়ে বয়স্ক গাছ কোনটি? গাছের নামটি বলার আগে আরেকটি তথ্য জানিয়ে দিই—এটি সেই গাছ, যার নিরাপত্তার জন্য সঠিক অবস্থান গোপন রাখা হয়েছে। গাছটির নাম হলো মিথুসেলাহ। এটি একধরনের পাইনগাছ, যার বয়স প্রায় ৪ হাজার ৮৫০ বছরের বেশি। একবার ভাবুন, একটি গাছকে যেন হুমকিতে না পড়তে হয়, সে জন্য তার অবস্থানই গোপন রাখা হয়েছে! আর আমাদের দেশে শতবর্ষী গাছগুলোর কী হচ্ছে!
শতবর্ষী গাছ হলো সেসব গাছ, যেগুলোর বয়স ১০০ বছরের বেশি হয়েছে। অন্যান্য গাছের তুলনায় শতবর্ষী গাছ পরিবেশের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, এসব গাছ প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন সরবরাহ করে। বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা কমায়। তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ও মাটিক্ষয় নিয়ন্ত্রণ করে। বাংলাদেশের অনেক জায়গা শতবর্ষী গাছের জন্য বিখ্যাত। যেমন, যশোর রোডের গাছ। যশোর রোড ঐতিহাসিক কারণে বিখ্যাত হলেও শতবর্ষী গাছের জন্যও এটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যশোর রোডে অনেক শতবর্ষী কড়ইগাছ রয়েছে। নড়াইল জেলায়ও শতবর্ষী গাছ রয়েছে। এখানে এমন অনেক গাছ আছে, যার বয়স ২০০ বছরের বেশি। চট্টগ্রামের সিআরবি এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজও শতবর্ষী গাছের জন্য পরিচিত। গোপালগঞ্জের মুকসুদপুরে শতবর্ষী জোড়া বট-পাকুড় এখন দর্শনীয় স্থান।
কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় এসব শতবর্ষী গাছ কাটার সংবাদ। কিছুদিন আগে নড়াইলে কাটা হলো শতবর্ষী গাছ। একটি তথ্যমতে, নড়াইলে গত এক দশকে পাঁচ শতাধিক শতবর্ষী গাছ কাটা হয়েছে। সেখানে ৫০ বছরের বেশি বয়সী গাছের তালিকা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও কোনো কাজ হয়নি। এমনকি স্থানীয়দের মতে, যে বন বিভাগের দায়িত্ব এসব সংরক্ষণের, তারাও উদাসীন। আরেকটি পত্রিকার তথ্যমতে, দেয়াল বা বাগান করতেও চট্টগ্রামে কাটা হয়েছে শতবর্ষী গাছ। মার্চে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও বাংলাদেশ রেলওয়ে সম্প্রতি শত বছরের পুরোনো গাছ কেটেছে। তারা বন বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই গাছগুলো কেটেছে। এ রকম অসংখ্য সংবাদ রয়েছে শতবর্ষী গাছ কাটার।
অথচ বাংলাদেশে বন ও গাছ সংরক্ষণ আইন রয়েছে। শতবর্ষী গাছ সুরক্ষায় আইন কঠিন করা হয়েছে। এই আইন অনুযায়ী বন বিভাগ কর্তৃক বিপদাপন্ন বা সংরক্ষিত বা ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষগুলোর মধ্যে প্রাচীন ও শতবর্ষী গাছও অন্তর্ভুক্ত আছে। এসব তালিকাভুক্ত গাছ কোনোভাবেই কাটা যাবে না। সংরক্ষিত বা বিপন্ন গাছ কাটলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা ধরা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বাণিজ্যিক বাগান ছাড়া অন্য কোনো গাছে পেরেক ঠুকলেও সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। আইন অনুযায়ী বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার পূর্ব অনুমোদন সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় বন, সামাজিক বন, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণপরিসরে গাছ কাটা ও অপসারণ করা যাবে। গাছ কাটার আবেদন মঞ্জুর হলেই শেষ হয়ে গেল না। বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তাকে নিশ্চিত করতে হবে যে কর্তিত গাছের বিপরীতে আবেদনকারী একই এলাকায় নির্দিষ্ট প্রজাতি ও সংখ্যার গাছ রোপণ করেছে কি না। তবে রোগাক্রান্ত গাছ, ঝড়ে পড়া গাছ, সড়ক যোগাযোগে বাধা সৃষ্টিকারী গাছ, বজ্রপাত, অগ্নিকাণ্ড, ভারী বৃষ্টি বা অন্য কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত কোনো গাছ কাটার ক্ষেত্রে আবেদন করতে হবে না।
বিশ্বের অনেক জায়গায় গাছ কাটা নিয়ে বেশ কিছু আইন আছে। যেমন, ইউপি ট্রি সংরক্ষণ আইন। এটি সংশোধিত হয় ২০১৭ সালে। এই আইন অনুযায়ী নিম, আম, মহুয়া, পিয়াল ইত্যাদি গাছ কাটার আগে অনুমতি নিতে হয়। এই আইনে এ-ও বলা আছে, যদি একটি বড় গাছ কাটা হয়, তবে তার বিপরীতে জন্য ১০টি ছোট গাছ লাগাতে হবে। ১০টি ছোট গাছ লাগাতে যদি জমি কম পড়ে, সে ক্ষেত্রে বাকি জমি বন বিভাগকে দিতে বলা হয়েছে। ১৯২৭ সালের ভারতীয় বন আইন অনুযায়ী প্রতিটি রাজ্যে গাছ কাটা বন্ধে বিধিনিষেধ রাখার কথা বলা হয়েছে। এখানেও গাছ কাটার জন্য অনুমতি এবং অনুমতি ছাড়া গাছ কাটলে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের কথা বলা আছে। ২০০৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বনাঞ্চল সংরক্ষণ আইনেও গাছ কাটা বন্ধে বলা হয়েছে, বনাঞ্চলের কোনো গাছ কাটা যাবে না। তবে আগাছা-জাতীয় গাছ কেটে ফেলতে বা অপসারণ করতে পারবে। এখানেও বেআইনিভাবে গাছ কাটলে এক বছরের কারাদণ্ড এবং ৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১৯৭১ সালে ভারতের মহারাষ্ট্রের গাছ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, বেআইনি গাছ কাটার শাস্তি ১ হাজার থেকে ৫ হাজার এবং এক সপ্তাহ থেকে এক বছরের কারাদণ্ড।
নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক গবেষণামতে, পৃথিবীতে এখনো যে পরিমাণ গাছ টিকে আছে, তার সংখ্যা ৩.০৪ ট্রিলিয়ন। গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫.৩ বিলিয়ন গাছ কাটা হয়। গত ১২ হাজার বছরে পৃথিবীর ৪৬ শতাংশ গাছ চিরতরে নেই হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি গাছ আছে রাশিয়ায়। এর পরিমাণ ৬৪২-৬৯৮ বিলিয়ন। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে কানাডা। এখানে রয়েছে ৩১৮-৩৬১ বিলিয়ন গাছ। ব্রাজিলে আছে ৩০২-৩৩৮ বিলিয়ন গাছ। আমেরিকায় ২২২-২২৮ বিলিয়ন। চীনে ১৪০-১৭৮ বিলিয়ন। সবচেয়ে ঘন বন রয়েছে ফিনল্যান্ডে। বাংলাদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। একটি দেশের ২৫ শতাংশ বন থাকার কথা থাকলেও বাংলাদেশে রয়েছে ৮ শতাংশের মতো। বাংলাদেশে শতবর্ষী গাছের মোট সংখ্যা এখনো জানা নেই। তবে কয়েক হাজার শতবর্ষী গাছ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর মধ্যে বেশ কিছু গাছ রয়েছে বিখ্যাত, যেমন—যশোর রোডের কড়ই, সিলেটের বট, ময়মনসিংহের শিমুল, ঢাকার ফুলার রোডের তেঁতুলগাছ ইত্যাদি। এসব গাছ থাকলেও তেমন রক্ষণাবেক্ষণ নেই। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় গাছ কাটার উৎসব তো লেগেই আছে। বর্তমান সরকার গাছ রোপণের ব্যাপারে অনেক জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে। বন বিভাগ তথা সরকারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হতে পারে এসব শতবর্ষী গাছকে রক্ষা করা। যেসব গাছ আমাদের ছায়া দেয়, অক্সিজেন দেয়, সেসব গাছ বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তো আমাদেরই।
ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র ,পরিবেশবিষয়ক লেখক