হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব

তাপস মজুমদার 

ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি একটা খবর বেশ আলোচিত হয়েছে, স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতির পদে শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানো হবে। শুনে অবাক, খটকাও লাগল। খটকা লাগার অবশ্য বড় কোনো কারণ ছিল না। কেননা, আমাদের দেশে দলীয় সুবিধা প্রদানের অদ্ভুত কিছু রীতি চালু রয়েছে।

যিনি দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচনে পরাজিত হন, দল ক্ষমতায় গেলে তিনি পরবর্তী সময়ে কোনো কোম্পানি বা করপোরেশনের পরিচালক অথবা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পেয়ে থাকেন। এমন ক্ষেত্রে ওই ব্যক্তির যোগ্যতা কোনো মাপকাঠি নয়। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তাঁর জানাশোনা, পরিকল্পনা, দক্ষতা বা সৃজনশীলতা মুখ্য নয়। দেখা যায়, একজন আপাদমস্তক দলবাজ মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। খুব সামান্য ব্যতিক্রমসহ এ রকম অনেক উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে।

মনোনয়ন বা নিয়োগ নিয়ে সাধারণভাবে আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। ক্ষমতাসীন দল যেখানে সুযোগ আছে, সেখানে তার সমর্থকদেরকেই দায়িত্ব দেবে—এটি স্বাভাবিক ব্যাপার। তবে প্রশ্ন হলো, স্কুল-কলেজের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে কর্তৃপক্ষ সরাসরি দলের সমর্থক কোনো ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতেই পারে। কিন্তু আমরা চাই সেই নেতৃত্ব হোক প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব। যদিও আমরা জানি রাজনৈতিক, বিশেষত সরকারি দলের মানুষের একটা ভার আছে।

ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি একজন নেতা, পরিচালক, পথপ্রদর্শক। স্কুল বা কলেজের পরিচালনা পর্ষদকে তিনি নেতৃত্ব দেবেন। নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বিভিন্ন সমস্যায় সমাধান দেওয়া, প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের ক্ষেত্রে নতুন নতুন পথ খুঁজে বের করা তাঁর কাজ হবে। এ গোটা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সংগত কারণেই মানুষটিকে চিন্তাশীল, সমদর্শী ও দূরদর্শী হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে পড়াশোনা জানলেই তিনি অমন সব বৈশিষ্ট্য অর্জন করে ফেলবেন, এমনটি ভাববার কোনো কারণ নেই। তবু সাধারণভাবে বলা যায়, শিক্ষিত হলে যেকোনো বিষয় সহজে বুঝে ফেলার মতো সক্ষমতা বেশি থাকে। অন্ততপক্ষে কিছুটা দীপ্তির সন্ধান তাঁর কাছে পাওয়া যেতে পারে।

সামাজিক মাধ্যমে দেখলাম অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন এবং মনে হয়েছে প্রশ্নটি সংগত যে, সভাপতির শিক্ষাগত যোগ্যতা কমানো হবে কেন? দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৫০ ছাড়িয়ে গেছে। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা মুরগির ছানার মতো বাড়ছে, অর্থাৎ পড়াশোনা জানা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, সেখানে যেকোনো অ্যাসাইনমেন্ট বা নিয়োগের যোগ্যতা কোন যুক্তিবলে হ্রাস করা হবে! আর সেটা যেনতেন জায়গা নয়—খোদ শিক্ষার কেন্দ্রে।

শিক্ষা নিয়ে একটা হেলাফেলার মনোভাব আমাদের চিরদিনই ছিল। হয়তো সেটা সচেতনভাবেই। ব্রিটিশরা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা দিয়ে আমাদেরকে সুবিধাভোগী অবস্থানে অধিষ্ঠিত হওয়ার একটা ন্যায়ানুগ পথ হিসেবে চিহ্নিত করে দিয়ে গেছে। দুর্ভাগ্য হলো, যুগের পর যুগ এ জন্য ব্রিটিশকে দায়ী করলেও কখনো আমরা সে ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে তাৎপর্যপূর্ণ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করিনি। অথচ ব্রিটিশরা কিন্তু সেই শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কখনো ছিল না, এখনো নেই।

সাম্প্রতিককালের একটা উদাহরণ টানি। দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা নিয়েই প্রথমে ১১টা সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল এবং তা নিয়ে রাষ্ট্রে তোলপাড় শুরু হয়েছিল। সেসব সংস্কারের কপালে কী জুটেছে, তা দেশ ও জাতি জানে এবং ভবিষ্যতে আরও ভালোভাবে জানবে। এ ক্ষেত্রে আমরা যেটা লক্ষ করলাম, এত এত কমিশনের মধ্যে শিক্ষা সংস্কার-সংক্রান্ত কোনো কমিশন ছিল না। অথচ কে না জানে, যদি এ দেশে শিক্ষাব্যবস্থাটা এমন হতো যে সেখানে নৈতিক, বিবেকবান, নির্লোভ, দায়িত্বপরায়ণ মানুষ সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত থাকত, তাহলে দেশ এতটা পিছিয়ে থাকত না। সবদিক থেকেই এগিয়ে যেত। বিশ্বাস করা যায়, হয়তো অন্য অনেক সংস্কারের দরকারই হতো না।

বলা হয় শাসককুল নাকি শিক্ষাকে ভয় পায়। এই পুরোনো আমলের আপ্তবাক্য এখনো মানতে হবে আমাদের! অথচ শাসকেরা ভয় পাক আর না পাক—কারও শাসনকাল যে চিরস্থায়ী নয়, এটা অবধারিত। তাহলে কেন তারা সংস্কারের উদ্যোগ নেবে না! ভয় কোথায়! বরং সৎ-সংস্কারের পথে গেলেই আবার জনগণের সমর্থন পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসে কমল হীরের পাথর আর তার আলো প্রসঙ্গে অমিতের একটা বাণীর শেষ দিকে বলা হয়েছে, ‘পাথরের ভার আছে; আলোর আছে দীপ্তি’। আলোচ্য ক্ষেত্রে আমরা যদি রাজনৈতিক কোনো ব্যক্তিকে পাথর ধরে নিই কিন্তু তাঁর যদি দীপ্তি না থাকে, তাহলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। অতএব, আমাদের পাথর এবং দীপ্তি দুটোই খুঁজতে হবে।

এখনো আমাদের সমাজে কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা কোনো দলের সমর্থক হলেও ব্যক্তি হিসেবে উদার, নিরপেক্ষ ও বিবেকবান। আবার দল করেন না এমন মানুষও এ রকম বৈশিষ্ট্যের আছেন। দলীয় আনুগত্য থাকুক বা না থাকুক ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তেমন মানুষকেই নিযুক্ত করা হোক—যিনি একাধারে বিদ্যানুরাগী, দেশপ্রেমিক, বিবেকবান ও

নিরপেক্ষ। এর সঙ্গে পড়াশোনায় উচ্চতর ডিগ্রি থাকলে খুব ভালো।

সমাজ মাধ্যমে এ বিষয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা উদ্বিগ্নতার প্রধান কারণ হলো, আমাদের এখানে কম পড়াশোনা জানা মাস্তান কিসিমের অনেক লোক আছেন, যাঁরা রাজনীতি করেন। তাঁদের না আছে ন্যূনতম জ্ঞান, না আছে দেশপ্রেম, না আছে বিবেকবোধ, না আছে নিরপেক্ষ দৃঢ়চিত্ত। যিনি ভয়শূন্য চিত্তে সত্য ও সঠিক কথাটি বলতে না পারেন, যিনি সিদ্ধান্ত নিতে সততার সঙ্গে তাঁর জ্ঞানকে প্রয়োগ করতে না পারেন, তিনি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেবেন কী করে!

এ কথা অনস্বীকার্য, কোনো প্রতিষ্ঠান যদি দল-মতনির্বিশেষে সমান দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলে তবে তাঁর সামাজিক সুফল সেই দলের ঘরেই যায়, যে দলের সরকার ক্ষমতায় থাকে। আমাদের দেশে সরকারগুলো নিঃস্বার্থভাবে এবং দূরদর্শিতার সঙ্গে এসব বিষয় দেখে না বলে তাদের নিজ নিজ দলকে পরবর্তী নির্বাচনে জয়ের জন্য নানাবিধ কূটকৌশল অবলম্বন করতে হয়। এটা প্রায় নিয়মিত চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।

শিক্ষা নিয়ে নতুন সরকারকে গভীর অভিনিবেশসহকারে ভাবতে হবে। দলীয় কর্মী হলেই নয়; বরং খুঁজে পেতে হবে। একটি নিরপেক্ষ, দক্ষ, দায়িত্বশীল, দেশপ্রেমিক ব্যবস্থাপনা কমিটি উপহার দেওয়ার সর্বোচ্চ ও আন্তরিক চেষ্টা সরকার করে দেখবে বলে আমরা বিশ্বাস করতে চাই। প্রয়োজনে ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যদের সম্মানীর ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। পাশাপাশি কোনো আলগা একটি পয়সাও সেখান থেকে যেন অর্জন করার সুযোগ না থাকে, তা নিশ্চিত হতে হবে। একই সঙ্গে কমিটির কাজের মূল্যায়নের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য শক্তিশালী মনিটরিং টুলস ও ইভ্যালুয়েশন মেকানিজম থাকতে হবে।

দেশকে সুস্থ পথে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে উল্লিখিত সৎ-গুণের সমাহার ঘটানোর কোনো বিকল্প নেই। যদিও শুধু শিক্ষাক্ষেত্রে নয় প্রশাসন, বিচার, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই এই একই কথা প্রযোজ্য।

ধর্মীয় অনুশাসন থেকে জনকল্যাণের রাজনীতি

সুবিধাবঞ্চিতদের পুষ্টির উৎসব হোক কোরবানি

বদলে যাওয়া কোরবানির অর্থনীতির গল্প

দঙ্গলবাজির ব্যাক ফায়ার না ফ্রেন্ডলি ফায়ার

প্রবাসের দেশপ্রেম, বন্যার সিডনি জয়

যে তিন বিষয় কৃষকবান্ধব বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত

হামের কারণে এত শিশুর মৃত্যু পদ্ধতিগত হত্যাকাণ্ড

সর্বক্ষেত্রে জাগরণ দরকার

এভাবে কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো চলতে পারে

প্রবীণেরাও অর্থনীতির চাকা