হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

নেপালের জেন-জি আন্দোলন পরবর্তী: নির্বাচিত সরকারের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

আব্দুর রহমান 

আরএসপির জন্য বড় শক্তি হলো নেপালি জনগণের অকপট আশাবাদ। ছবি: এএফপি

কোভিড মহামারি-পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ—শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে গণ-আন্দোলন হয়। সম্প্রতি দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জেন-জি নেতৃত্বাধীন সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ ও তরুণ নেতা বালেন্দ্র শাহ। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণকে অনেকেই আশার আলো হিসেবে দেখছেন। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে বিস্তর।

এই তিনটি দেশেই আন্দোলনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল—রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কর্মসংস্থানহীনতা এবং ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতা হরণ। বালেন্দ্র শাহ এবং তাঁর দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টির (আরএসপি) জন্য এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করা অনেকটা পাহাড় ঠেলার মতোই। কারণ, প্রথমেই ভঙ্গুর গণতন্ত্রের এই দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্ত কাঠামোর ওপর দাঁড় করাতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে টালমাটাল অর্থনীতি সামলে কর্মসংস্থান তৈরি করে তরুণ প্রজন্মকে আশ্বস্ত করার চ্যালেঞ্জ।

কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র ও র‍্যাপার বালেন্দ্র শাহ নিজে প্রতিশ্রুতিশীল হলেও ধারণা করা হচ্ছে, নেপালের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রথম বাধা আসবে তাঁর দল থেকেই। কারণ, তিনি এই দলের টিকিটে নির্বাচন করলেও তিনি এই দলের কেউই নন। দলটির প্রতিষ্ঠাতা রবি লামিচানে। তিনিও বালেন্দ্র শাহের মতো দুর্নীতিমুক্ত, স্থিতিশীল রাজনীতির প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাত্র বছর চারেক আগে দলটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরই মধ্যে আরএসপি একাধিকবার নেপালে দুটি জোট সরকারের অংশীদার হয়েছে। দলটির বিরুদ্ধে এই অল্প সময়েও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এমনকি খোদ লামিচানের বিরুদ্ধেই আইন অমান্য করার অভিযোগ তোলা হয়েছিল দেশটির সুপ্রিম কোর্টে।

আরএসপি এবং বালেন্দ্র শাহের মধ্যে মূলত একধরনের ‘রাজনৈতিক সম্বন্ধ’ তৈরি হয়েছে। কারণ, বালেন্দ্রর একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম দরকার ছিল, যা নেপালের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো দিতে পারছিল না। আর লামিচানের দরকার ছিল বালেন্দ্রর মতো একজনকে, যে কিনা পুরো দলের মুখ হয়ে উঠতে পারবে। নির্বাচনী বৈতরণি পার হওয়া এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নীতিনির্ধারণ ব্যাপকভাবে আলাদা হওয়ায় স্বার্থের সংঘাত দেখা দেওয়ার সমূহ আশঙ্কা রয়েছে। দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধ সামলানোর পাশাপাশি কিছু মন্ত্রীর মধ্যে দেখা দেওয়া জনতুষ্টিবাদী বা পপুলিস্ট প্রবণতাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি গ্রেপ্তার হওয়ার পর নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুদান গুরুং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আপনারা ভুল প্রজন্মের সঙ্গে পাঙ্গা নিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি মানে প্রতিশ্রুতিই—আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।’ গুরুং এই গ্রেপ্তারকে প্রতিশোধ নয়, বরং ‘বিচারের সূচনা’ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে বিরোধীরা ইতিমধ্যেই ওলির গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে আখ্যা দিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেছে। নতুন আইনমন্ত্রী অবশ্য পরে স্পষ্ট করেছেন, এই গ্রেপ্তার জনগণের ‘আকাঙ্ক্ষা ও ম্যান্ডেট’ অনুসারেই হয়েছে।

আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক দলসংশ্লিষ্ট ছাত্রসংগঠন বিলুপ্ত এবং আমলা, শিক্ষক ও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া নিষিদ্ধ করার যে সিদ্ধান্ত আরএসপি সরকার নিয়েছে, তা নিয়ে ইতিমধেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এই গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘকাল ধরে নেপালের প্রতিষ্ঠানগুলোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। ফলে কেবল একটি ডিক্রি বা আদেশ জারি করেই তাদের সরিয়ে দেওয়া সহজ না-ও হতে পারে। আরএসপি বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মন্ত্রণালয় চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তা তারা পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি। যেমন প্রথমবার এমপি হওয়া সুদান গুরুং একজন অ্যাকটিভিস্ট। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ে তাঁর আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই।

আগামী পাঁচ বছরে ৭ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং নেপালকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে প্রতিশ্রুতি দলটি দিয়েছিল, তা পূরণ করাও হবে বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ ১০০ দফার সংস্কার কর্মসূচিতে এই লক্ষ্যগুলো নিয়ে কোনো কথা নেই। একটি তুলনামূলক রুদ্ধ বা ক্লোজড ইকোনমি উন্মুক্ত করলেই এক মেয়াদে ফল পাওয়া না-ও যেতে পারে। নতুন সরকারকে একদিকে যেমন যুবসমাজের অর্থনৈতিক সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, অন্যদিকে রক্ষণশীল নীতি থেকে সুবিধাভোগী বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোর বাধাও সামলাতে হবে। এ ছাড়া দলটি বিভিন্ন খাতে ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে তরুণদের বিদেশযাত্রা রোধ এবং আগামী পাঁচ বছরে নেপালকে একটি আইটি রপ্তানি হাবে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এসব প্রতিশ্রুতি সফল করতে হলে আরএসপিকে কেবল অর্থনীতি নয়, আমলাতন্ত্রের মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলোও দূর করতে হবে। যদিও সংস্কার কর্মসূচিতে এই অদক্ষতাগুলোর বেশ কিছু চিহ্নিত করা হয়েছে, তবে সংশোধনী পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা ধারণার চেয়েও কঠিন হতে পারে। সরকারের তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হবে ইরান যুদ্ধ এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব। প্রায় ১৯ লাখ নেপালি সেই অঞ্চলে কাজ করেন, যাঁরা নেপালের মোট রেমিট্যান্সের ৪০ শতাংশের বেশি পাঠান।

সফল হতে হলে আরএসপিকে কেবল অর্থনীতি নয়, আমলাতন্ত্রের মৌলিক সীমাবদ্ধতাগুলোও দূর করতে হবে। বছরের পর বছর ধরে একটি অকেজো রাষ্ট্রব্যবস্থায় অভ্যস্ত জনগণের কাছে সামান্য উন্নতিও ইতিবাচক হিসেবে গণ্য হবে। কিন্তু ডিজিটালাইজেশনের জন্য নেপালের বর্তমান ব্যবস্থা, প্রতিষ্ঠান ও সম্পদের ব্যাপক আধুনিকায়ন প্রয়োজন। সরকারকে ডিজিটাল বৈষম্যও দূর করতে হবে। কারণ, নেপালের ৪০ শতাংশের বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে না।

আরএসপি নির্বাচনী ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিধান সংশোধনের লক্ষ্যে সাত দিনের মধ্যে একটি সাংবিধানিক পর্যালোচনা আলোচনাপত্র প্রকাশের প্রস্তাব দিয়েছে। তবে নিম্নকক্ষে তাদের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সংশোধনী পাস করার জন্য তা যথেষ্ট না-ও হতে পারে। কারণ, এর জন্য উচ্চকক্ষ এবং প্রাদেশিক সভাগুলোতেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রয়োজন। সংবিধান প্রবর্তনের পর থেকেই অনেকে এর পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছেন এবং গত সেপ্টেম্বরের আন্দোলনে এর ভঙ্গুরতা প্রকাশ পেয়েছে। তবে এই সংবিধান ছিল বছরের পর বছর ধরে চলা ঐকমত্য এবং রাজনৈতিক আলোচনার ফসল। এর ভিত্তিতে হাত দিলে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে।

দলটি জনতুষ্টিবাদী প্রতীকী রাজনীতি করুক বা শাসন সংস্কারে মনোযোগ দিক—আরএসপি এখন আর নিজেকে অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতে পারে না। যেহেতু তারা ক্ষমতায়, তাই তারা এখন নিজেই এস্টাবলিশমেন্ট। পরিবর্তনের আশায় দীর্ঘদিন ধরে হতাশ হয়ে থাকা এক বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশার ভার এখন তাদের কাঁধেই। সাবেক সরকারগুলোর ব্যর্থতার কারণে নেপালের মানুষ হয়তো নতুন নেতৃত্বের প্রতি কিছুটা ধৈর্য দেখাবে, কিন্তু আজ হোক বা কাল, তারা ফলাফল দেখতে চাইবে।

তবে, যাই হোক না কেন—এই নির্বাচন নেপালের রাজনীতিতে এক বড় পরিবর্তনের সূচনা করছে। নেপালি কংগ্রেস ও বামপন্থী শক্তিগুলোর বিপর্যয়ের পাশাপাশি জাতিগত ও বর্ণভিত্তিক পরিচয় নিয়ে রাজনীতি করা দলগুলোও প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মূলত রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক প্রভাবশালী বর্ণ ও জাতিগোষ্ঠীর কাছ থেকে অধিকার আদায়ের দাবিই ছিল তাদের রাজনীতির মূল সুর। কিন্তু আরএসপির বিজয় এবং বালেন্দ্র শাহের নিজের মদেশি পরিচয়কে একটি বৃহত্তর নেপালি পরিচয়ের মধ্যে তুলে ধরার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে এসব বিভাজন বর্তমানে কিছুটা থিতিয়ে এসেছে। রাজনীতির পুরোনো লক্ষ্য যদি হয়ে থাকে প্রতিনিধিত্ব, তবে আরএসপি তার বদলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই সামাজিক ও রাজনৈতিক উন্নতির মূল চাবিকাঠি হিসেবে তুলে ধরছে।

সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের পথে কিছু প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা পাঁচজন নারী মন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছে। এর মধ্যে ঐতিহাসিকভাবে পিছিয়ে পড়া সম্প্রদায় থেকেও প্রথমবারের মতো মন্ত্রী করা হয়েছে। তবু আইন সভায় এখনো সেই পুরোনো বৈষম্যের প্রতিফলনই দেখা যাচ্ছে। পার্লামেন্টে আগের চেয়ে তরুণদের উপস্থিতিতে উজ্জ্বল হলেও প্রায় অর্ধেক সংসদ সদস্যই প্রভাবশালী খাস-আর্য নৃগোষ্ঠীর। এটি অন্তর্ভুক্তির মূল লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। এ ছাড়া আরএসপি তাদের সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (পিআর) প্রার্থী হিসেবে সমাজের উচ্চবিত্তদের বেছে নিয়েছে, যা মূলত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে ইতিবাচক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যকে ম্লান করে দিয়েছে।

তবে আরএসপির জন্য বড় শক্তি হলো নেপালি জনগণের অকপট আশাবাদ, যা গত দুই দশকে দেখা যায়নি। ওলির গ্রেপ্তারের পর শুরু হওয়া প্রতিবাদে জনগণের ম্লান সাড়া ইঙ্গিত দেয় যে, সাবেক দলগুলো তাদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের পর এখনো ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে। কিন্তু এখনই তাদের বিদায় ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়াটা তাড়াহুড়ো হয়ে যাবে। তবে এটি এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে দ্রুত নগরায়ণ এবং জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ফলে নেপালি সমাজে যে বিশাল পরিবর্তন এসেছে, সে সম্পর্কে দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্ব ছিল একেবারেই বেখবর।

এ বছরের নির্বাচনের চূড়ান্ত রায় এটাই বলছে যে আরএসপি সরকার এখন জেন-জি বিপ্লব-পরবর্তী নেপালের গতিপথ নির্ধারণ করবে। সরকারের সংস্কার কর্মসূচি যদি সফলভাবে এগিয়ে যায়, তবে সাবেক দলগুলোর বিরোধী রাজনীতি হিসেবে দেওয়ার মতো আর কিছুই থাকবে না। নেপালি জনগণের অকৃত্রিম আশাবাদই এখন আরএসপির বড় সহায়ক। দলটি যদি স্বজনপ্রীতি ও দুঃশাসনের চক্র ভেঙে সত্যিকারের সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের মনে আশার আলো জ্বালাতে পারে, তবে তারা হয়তো নেপালি রাজনীতির এক নতুন যুগের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে আছে।

আইএমএফের সতর্কতায় কতটা ভয় পাওয়া উচিত

ছায়ানটের বর্ষবরণ: বাঙালির প্রতিবাদ ও প্রাণের স্পন্দন

ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক উৎসব: পাহাড়ি সংস্কৃতির অনন্য রূপ

সাতসকালেই কোন দুর্দিনের পূর্বাভাস

বৈশাখ থাকুক চির সমুজ্জ্বল, চির মঙ্গলময়

টিকার জন্য দায় না দিয়ে পরিস্থিতি সামলে নেওয়া জরুরি: ডা. মুশতাক হোসেন

বৈশাখের অর্থনীতি: আনন্দের আড়ালে সাধারণের জীবন

পয়লা বৈশাখ এবং শিল্প-সমৃদ্ধ ভাবনা

প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব

আওয়ামী লীগ, মুজফ্ফর আহমদ ও কালো আইন