দ্বিচারিতাকে মোনাফেকি বললে বোধ করি বুঝতে সুবিধা হয়। শুরুতে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানেই হেডকোয়ার্টার্স স্থাপন করে জামায়াতের জনবিরোধী তৎপরতা চালু থাকে। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার দাবিতে পাঞ্জাবে তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল। মুসলিম বিবাহ ও বিবাহবিচ্ছেদ অধ্যাদেশকে আইনে রূপদানের উদ্যোগের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা তাদের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক কাজ। সন্তানের জন্মদানের সক্ষমতাকে মেয়েদের পক্ষে নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে তারা অযোগ্যতা জ্ঞান করে, অথচ পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী হিসেবে মিস ফাতেমা জিন্নাহকে তাদের পার্টি সমর্থন করেছে। বাংলাদেশে তারা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যুগপৎ আন্দোলন করেছে। আর খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বকালে নারীনেত্রীর পরিচালনায় তাদের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল মন্ত্রিত্ব করাতেও কোনো প্রকার দ্বিধা প্রকাশ করেননি।
এবারের জাতীয় সংসদের নির্বাচনে তারা একজন নারী প্রার্থীকেও মনোনয়ন দেয়নি, অথচ ওই সংসদেরই সংরক্ষিত নারী আসনে প্রার্থী মনোনয়ন আগেও দিয়েছে, এবারও দিয়েছে। দলের পক্ষে ভোট চাইতে মেয়েদেরকে দ্বারে দ্বারে পাঠাতেও তাদের কুণ্ঠা ছিল না। তারা ইসলামি শাসন কায়েম করতে বদ্ধপরিকর, তবে নির্বাচনে জেতার আশায় হিন্দু সম্প্রদায়ের এক ব্যক্তিকে প্রার্থী করতে অসুবিধা দেখতে পায়নি। তাদের নেতারা কেউ আমির, কেউ নায়েবে আমির, আবার কেউ সেক্রেটারি জেনারেল। জামায়াতিরা নিজেদের সততার বড়াই করেন এবং দেশে সৎলোকের শাসন কায়েম করবে বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ থাকেন। তবে ভোট টানবার আশায় মিথ্যাচারে দ্বিধা করেন না।
বিগত নির্বাচনের সময় তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল যে জামায়াতকে ভোট দেওয়ার অর্থ জান্নাতে যাওয়ার টিকিট কেনা, হয়তো আশা করেছিল যে জ্বলন্ত জাহান্নামের প্রান্তে অবস্থানরত গরিব মানুষ তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিতে উদ্দীপ্ত হয়ে দলে দলে তাদের ভোট দিতে ছুটে আসবে; পরে সমালোচনার মুখে ওই বক্তব্যটি ব্যক্তিগত, দলীয় নয় বলে প্রচার করে। ভোট কেনার জন্য প্রকাশ্যে অর্থ বিতরণ করা হচ্ছে—এমন ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হয়ে সংবাদপত্রে চলে এসেছে।
পূর্ববঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর পরলোকগত আমির গোলাম আযম দ্বিচারিতার সুন্দর দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের তিনি পুরোপুরি বিরোধী ছিলেন, পাকিস্তান রক্ষার কাজে হানাদারদের সমর্থন জানিয়েছেন, ওই বাহিনীর আচ্ছাদনে জামায়াতের অঙ্গসংগঠন আলবদর বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের অনেককে অবিশ্বাস্য নৃশংসতায় হত্যা করেছে। স্বাধীনতার পরে গোলাম আযম দেশ ছেড়েছিলেন। মনে হয়েছিল এই অপবিত্র দেশে তিনি আর আসবেনই না। কিন্তু পরে সময় অনুকূল দেখে ফিরে এসে রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব গ্রহণ ও মহোৎসাহে রাজনীতি করেছেন।
স্বাধীনতার পরে জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রাম এমন দাবিও প্রচার শুরু করে যে গোলাম আযম একজন ‘ভাষাসৈনিক’ ছিলেন। সে দাবির পক্ষে প্রমাণও উপস্থিত করেছে। প্রমাণটি হলো এই যে ঘটনাক্রমে ১৯৪৮ সালে গোলাম আযম ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মনোনীত সাধারণ সম্পাদক। সে সময় ডাকসুর নির্বাচন সরাসরি হতো না, ঘূর্ণমান পদ্ধতিতে পদগুলো বরাদ্দ থাকত বিভিন্ন ছাত্রাবাসের জন্য। ১৯৪৮ সালে সহসভাপতির পদ পেয়েছিল জগন্নাথ হল এবং ওই ছাত্রাবাস দ্বারা মনোনীত হয়ে সহসভাপতি হন অরবিন্দ বসু; সাধারণ সম্পাদকের পদটি প্রাপ্য ছিল ফজলুল হক মুসলিম হলের এবং মনোনয়ন পেয়েছিলেন গোলাম আযম। উল্লেখ্য, পূর্ববঙ্গে তখন ইসলামী ছাত্র সংঘের জন্মই হয়নি এবং জামায়াতে ইসলামী বলে কোনো দল যে আছে, লোকে সেটাও জানত না। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের তরুণ ছাত্র গোলাম আযমের সঙ্গে জামায়াতের তখন কোনো সংস্রবই ছিল না।
ঘটনা আরও এই যে ওই সময়ে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান ঢাকায় আসেন এবং ডাকসুর পক্ষ থেকে তাঁকে একটি মানপত্র দেওয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার দাবি জানাবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মুদ্রিত মানপত্রটি সহসভাপতি অরবিন্দ বসু পড়বেন—এটাই ছিল স্বাভাবিক, কিন্তু তিনি যেহেতু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, তাই তাঁর কণ্ঠে রাষ্ট্রভাষার দাবি উচ্চারিত হলে পাছে মুসলিম লীগ সরকার ওই ঘটনাকে ব্যবহার করে এমনটা প্রচার করার সুবিধা পায় যে আন্দোলনটি হিন্দুদের দ্বারা অনুপ্রাণিত; সেই বিবেচনায় গোলাম আযমকে ওটি পড়তে বলা হয়েছিল। এর বেশি কোনো ভূমিকা তাঁর ছিল না; থাকা সম্ভবও ছিল না। মানপত্রটি পড়ে শোনানোর কাজটিকে পুঁজি করেই গোলাম আযমের ভাষাসৈনিকত্বের দাবি।
তবে ১৯৭০ সালে ওই পুঁজিকে মূল্যবান মনে করা দূরে থাক, তিনি কলঙ্ক বলেই জ্ঞান করেছিলেন। যার প্রমাণ মেলে পশ্চিম পাকিস্তানে প্রদত্ত তাঁর এক বক্তৃতায়, যেখানে তিনি কোনো প্রকার রাখঢাক না করে পরিষ্কার জানিয়েছিলেন যে উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা উচিত ছিল এবং ভাষা আন্দোলন ছিল একটি ভুল পদক্ষেপ। (ইমতিয়ার শামীম, শান্ত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সন্ত্রাস, ২০২৫, পৃ ২২৮)
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের যে আধিপত্য, তার পেছনে একটা কারণ মাদ্রাসা শিক্ষার বিস্তার। আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের ক্ষমতায় থাকাকে পোক্ত করার পক্ষে যে পদক্ষেপগুলো নিয়েছে, তার মধ্যে একটি হচ্ছে মাদ্রাসা শিক্ষাকে উৎসাহিত করা। এমনিতেই মাদ্রাসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে, বাড়তেই থাকে। কারণ, ওই শিক্ষায় খরচ কম, অনেক ক্ষেত্রে এমনকি বিনা মূল্যেই পাওয়া সম্ভব। তাতে গরিব মানুষের সন্তানেরা ‘শিক্ষিত’ হওয়ার সুযোগ পায়। যে জন্য দেখা যাচ্ছে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা যখন কমে, মাদ্রাসাশিক্ষার্থীর সংখ্যা তখনো বাড়তির দিকেই থাকে। ধনী ব্যক্তিরা মাদ্রাসা খোলে, প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের আগ্রহ যৎসামান্য। তিন কারণে। প্রথমত, মাদ্রাসা খোলা সহজ ও কম ব্যয়সাপেক্ষ। দ্বিতীয়ত, এই বিবেচনা যে—ধর্মীয় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করলে ইহকালে সম্মান এবং পরকালের জন্য পুণ্যের সঞ্চয় বৃদ্ধি—উভয় দিক থেকেই মুনাফা-প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে। তৃতীয়ত, ধনীদের ভেতর এই বোধ যে মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে গরিব মানুষের সন্তানেরা সন্তুষ্ট থাকবে, তারা গরিবি বৃত্তেই আটক রয়ে যাবে, ধনীদের সন্তানদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামবে না।
এটাও লক্ষণীয় যে গত বছর এইচএসসি পরীক্ষায় মূল ধারার ফল গত পাঁচ বছরের তুলনায় সবচেয়ে খারাপ হলেও মাদ্রাসার ফল অতটা মন্দ হয়নি। এটা হয়তো দুই কারণে ঘটেছে। প্রথম কারণ হতে পারে যে পরীক্ষার খাতা দেখার ক্ষেত্রে মাদ্রাসা-শিক্ষকেরা মূল ধারার পরীক্ষকদের তুলনায় অধিক হৃদয়বান হন। দ্বিতীয় কারণ এটা যে মাদ্রাসা শিক্ষায় জোর দেওয়া হয় মুখস্থ করার ওপরে। মুখস্থ থাকলে প্রশ্নের উত্তর সুন্দরভাবে দেওয়া যায় এবং ভালো নম্বরও পাওয়া যায়। এটা একধরনের নকল করা বটে; প্রশ্নের উত্তর কাগজে লিখে না এনে মনের ভেতরে লুকিয়ে নিয়ে আসা! তৃতীয়ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময়ে শিক্ষার্থীরা যে কোচিং সেন্টারে যায়, সেখানে বিদ্যাশিক্ষা দেওয়া হয় না, প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দক্ষতা বৃদ্ধি করা হয়। মুখস্থ করবার যে দক্ষতা মাদ্রাসাশিক্ষার্থীরা অর্জন করেছে, ভর্তি পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অনুশীলনে সেটা আরও বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং ওই দক্ষতাকে ব্যবহার করে মাদ্রাসার ছাত্ররা অন্য পরীক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো ফল করে।
শেখ হাসিনা তো মাদ্রাসা শিক্ষাকে সাধারণ শিক্ষার সমমানের বলে স্বীকৃতিদানের বন্দোবস্ত করে রেখে গেছেন; মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা তাদের মাদ্রাসা স্তরের পরীক্ষার ভালো ফলের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ভালো ফল যুক্ত করে মূল ধারার প্রার্থীদেরকে ডিঙিয়ে যায়। এসব কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মাদ্রাসার ধারা থেকে আসা শিক্ষার্থীদের আধিপত্য দেখা যায়।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়