১৯ শতকের প্রথমার্ধে আমাদের দেশে ইংরেজি তথা আধুনিক শিক্ষার গোড়াপত্তন ঘটেছিল মূলত ইংরেজদের হাত ধরে। তবে আর কিছু যেমনই হোক, শত বছরেও এখানকার কোনো প্রতিষ্ঠানে মাস্টার্স পড়ার কোনো সুযোগ সৃষ্টি কিংবা বন্দোবস্ত পরিলক্ষিত হয়নি। অথচ বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি ১৭০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন অন্তত ১৭৫টি কলেজে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স পড়ার ব্যবস্থা। ঢাকা মহানগরীতে প্রক্রিয়াধীন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে থাকা সরকারি সাতটি কলেজের প্রতিটিতেই এখন মাস্টার্স পড়া যায়। কালের আবর্তে ভাগ্য আর সুযোগ যাই বলি না কেন, আমাদের কাছে এসে ধরা দিয়েছে। আমার নিজ জেলা কিশোরগঞ্জে দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অন্তত চারটি কলেজে রয়েছে মাস্টার্স পড়ার ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত। অবশ্য এমনটা এখন দেশজুড়েই।
বঙ্গভঙ্গের সময় অবিভক্ত বাংলায় একটিই মাত্র বিশ্ববিদ্যালয় ছিল—কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় (স্থাপিত ১৮৫৭ সাল)। এ ছাড়া অবিভক্ত বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশ, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, আসাম প্রভৃতি) কলেজ ছিল মোট ৩৭টি। ৩৭টির মধ্যে ‘পূর্ববঙ্গ ও আসামে’ (নবগঠিত প্রদেশ) ১১টি এবং অবশিষ্ট বঙ্গে ছিল ২৬টি কলেজ। একই সময় (১৯০৫) পুরো বাংলায় এমএ পড়ার কলেজ ছিল মোট তিনটি। বিখ্যাত ঢাকা কলেজ (১৮৪১), চট্টগ্রাম কলেজ (১৮৬৯), রাজশাহী কলেজ (১৮৭৩), জগন্নাথ কলেজ (১৮৮৪) প্রভৃতি বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের তখন ‘ভরা-যৌবন’; খ্যাতি ও গৌরব-গরিমা, অনেক দিক থেকেই। তা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ (বর্তমান বাংলাদেশ) ও আসামে (নবগঠিত প্রদেশের অংশ) এমএ পড়ার মতো কোনো কলেজ বা বন্দোবস্ত ছিল না সে সময়।
গোটা পাকিস্তান আমলে (১৯৪৭-১৯৭১) হাতে গোনা কয়েকটি বিখ্যাত কলেজে দু-চারটি করে বিষয়ে অনার্স চালু থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে বাংলাদেশের কোনো কলেজে মাস্টার্স কোর্স চালু ছিল কি না আমার জানা নেই। ঢাকা মহানগরীসহ বৃহত্তর ঢাকা, বৃহত্তর ফরিদপুর ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ এলাকায় বর্তমানে ১৭টি জেলা। স্বাধীনতা লাভের পর এ সুবিস্তীর্ণ এলাকার (১৭ জেলা) মধ্যে ১৯৭৩ সালে বাংলা ও ইতিহাস বিষয়ে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে প্রথম মাস্টার্স কোর্স (এমএ) চালু করা হয়। ১৯৬৪-১৯৬৫ সেশনে কলেজটিতে উল্লিখিত দুটি বিষয়ে (বাংলা ও ইতিহাস) অনার্স চালু করা হয়েছিল। মাস্টার্স তো দূরের কথা, ঢাকার বিখ্যাত তথা দেশ সেরা বলে উপমহাদেশে সুপরিচিত ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) দু-তিনটি করে বিষয়ে অনার্সই চালু করা হয় স্বাধীনতার পরে, বোধ করি ১৯৭৩ সালে।
১৯৭৮ সালে আমি অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন তখন মোট ডিগ্রি কলেজ ১৩৮টি (এর মধ্যে ঢাকা মহানগরীতে ২৬টি কলেজের অবস্থান)। মোট ১৩৮টি কলেজের মধ্যে ঢাকা ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন জেলার ১০টি কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স চালু ছিল। আর ১০টি অনার্স কলেজের মধ্যে এক-দুটি বিষয় করে মাস্টার্স চালু ছিল ৪টিতে। ঢাকা কলেজ এবং ইডেন কলেজ নয়, মহানগরীতে ৬-৭টি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স চালু ছিল একমাত্র জগন্নাথ কলেজেই। জগন্নাথের পর দ্বিতীয় মাস্টার্স কলেজ হলো বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ (চার বিষয়ে), তৃতীয় ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজ (বাংলা ও ইতিহাস) ও চতুর্থ মাস্টার্স কলেজটি মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ (বাংলা)।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতোই ১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে ডিগ্রি স্তরের আশপাশের কলেজগুলো এ দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন হয়। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে দীর্ঘদিন তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) অধীনে থাকা ৪৫৫টি কলেজের যাবতীয় দায়িত্ব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১৯৯২ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ২৩টি জেলার (ঢাকা বিভাগের ১৭ ও খুলনা বিভাগের ৬টি) মোট ২১৮টি কলেজের মধ্যে ১৫টিতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্সে পাঠদান চালু ছিল। উল্লিখিত ১৫টি কলেজের মধ্যে কোনো কোনোটিতে একটি কিংবা দুটি বিষয়ে (সরকারি তিতুমীর কলেজ: বাংলা ও রসায়ন; সরকারি বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ: বাংলা ও অর্থনীতি; সরকারি কবি নজরুল কলেজ: ইসলামী শিক্ষা; নরসিংদী সরকারি কলেজ: বাংলা; মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ: বাংলা; বরিশালের সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ: (অর্থনীতি)।
১৫টি কলেজে অনার্স কোর্সে পাঠদানের পাশাপাশি ২৩ জেলার ১০টি কলেজে বিভিন্ন বিষয়ে মাস্টার্স কোর্সও চালু ছিল। যেমন ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, আনন্দ মোহন কলেজ, ব্রজমোহন কলেজ, করটিয়া সা’দত কলেজ প্রভৃতি। মাস্টার্স কোর্সে পাঠদানকারী ১০টি কলেজের মধ্যে কোনো কোনোটিতে হাতে গোনা একটি কিংবা দুটি বিষয়ে তা চালু ছিল: ফরিদপুরের রাজেন্দ্র কলেজ (অর্থনীতি), মানিকগঞ্জের দেবেন্দ্র কলেজ (বাংলা, দর্শন ও গণিত), বরিশালের সৈয়দ হাতেম আলী কলেজ (অর্থনীতি) ও টাঙ্গাইলের ব্রাহ্মণ শাসন কলেজ (বাংলা ও দর্শন)।
সময় বদলেছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা কোথায় ছিলাম আর এখন কোথায় এসে উপনীত হলাম! স্বাধীনতার পর একে একে ৫৫ বছর অতিক্রম—সামান্য কোনো ব্যাপার নয়। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা দিয়ে ইতিমধ্যে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। দেশে বর্তমানে ৫৮টি পাবলিক ও ১১৫টি বেসরকারি বা প্রাইভেট মিলে মোট ১৭৩টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সরকারি-বেসরকারি মোট ২ হাজারের বেশি ডিগ্রি কলেজের মধ্যে ৮৮২টিতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও ১৭৫টিতে চালু রয়েছে মাস্টার্স কোর্স।
ঢাকা মহানগরীর মোট ৩৬টি ডিগ্রি কলেজের মধ্যে কয়টিতে মাস্টার্স চালু আছে, এখন তা আমার জানা নেই। তবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রক্রিয়াধীন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীন বহুল আলোচিত সরকারি ৭টি কলেজের প্রতিটিতেই (ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, তিতুমীর কলেজ, কবি নজরুল কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ ও মিরপুর বাঙলা কলেজ) ৮-১০ কিংবা ১৫-২০টি করে বিষয়ে মাস্টার্স পড়া ও পড়ানোর ব্যবস্থা-বন্দোবস্ত রয়েছে।
পাবলিক আর বেসরকারি যাই হোক, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে কলেজে মাস্টার্স পড়া কিংবা সম্পন্ন করাটা একদিক থেকে বিরাট এক সুযোগ। আগের তুলনায় এ এক অকল্পনীয় ব্যাপার, ভাবনার অতীত। তবে জেলায় জেলায়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা স্তরে মাস্টার্স তথা উচ্চশিক্ষা লাভের বিস্তর সুবিধা থাকা সত্ত্বেও সঠিক পরিকল্পনা ও পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ ও উপযুক্ত দেখভালের অভাবে উচ্চশিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হতে চলেছে। ফলে পরীক্ষা পাসের সনদ আছে তো উপযুক্ত কর্মসংস্থান নেই, আর থাকলেও তা আহরিত জ্ঞান ও শিক্ষার সঙ্গে একেবারে সংগতিহীন। কিসের সিলেবাস আর কিসেরইবা পাঠপরিক্রমা, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কিংবা বাইরে পড়াশোনার খবর নেই, কিছুদিন পরপর ফরম পূরণ; পরীক্ষা আর পরীক্ষা। এসব কিছুই বেশ মোটাদাগে প্রশ্নের সম্মুখীন। সার্বিক দিক বিবেচনায় কর্তৃপক্ষের এ ব্যাপারে অধিকতর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা দরকার।