আমরা যারা দেশের বাইরে থাকি, এবারের নির্বাচন নিয়ে আমাদের আবেগ, উৎকণ্ঠা আর প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। আমরা জানি কত কত বছর মানুষ ভোট দিতে পারেনি। মানুষের আশা-ভরসার জায়গা এই নির্বাচন। গণতন্ত্র না থাকলে কী হয় বা হতে পারে, তার ভুক্তভোগী বাংলাদেশের জনগণ। দেশের বাইরে আমরা ভোট দিই ভিন্ন তরিকায়। অস্ট্রেলিয়ার নির্বাচনে আমাদের ব্যালট পেপার লম্বা। আর যতজন প্রার্থী থাকেন, সবাইকে ‘টিক’ দিতে হয়। কারণ যাঁরা দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের অসম্মান করার রেওয়াজ নেই। কিন্তু আপনি ক্রমবিন্যাস করে দেবেন। কে আপনার বিবেচনায় এক নম্বর আর কে শেষজন। এটাই নিয়ম। তারপর নির্ধারণ করা হবে তাঁদের ভাগ্য। আর একটা ব্যাপার হচ্ছে, টিক চিহ্ন দিতে হয় কাঠপেনসিল দিয়ে। আঙুলে কালি লাগানোর কোনো নিয়ম নেই। কারণ? পেনসিলে চিহ্ন দিলেও কেউ তা মুছে দিতে পারবে না। আর কালি কেন লাগাবে? কারও সাধ্য নেই জাল বা ভোট চুরি করতে পারে। আগেও এ কথাগুলো লিখেছিলাম, একটু মনে করিয়ে দিলাম।
যাহোক, আমাদের দেশে এখনো এমন নিয়ম চালু করা যায়নি। ভবিষ্যতে হবে কি না তা বলা মুশকিল। কিন্তু এবার আমরা মোটামুটি ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার একটা নির্বাচন দেখলাম। সবচেয়ে প্রাচীন দলটি মাঠে ছিল না। সেটা তাদের নিয়তি বা কর্মফল। আমি এ কথা বলতে বাধ্য—মানুষকে ভোট দিতে না দেওয়ার পরিণাম ভোগ করেছে তারা। এ ছাড়া যাঁরা ভোট করেছেন, তাঁরা সবাই ছিলেন আবেগ, উত্তেজনা আর অক্লান্ত উদ্যমে ভরপুর। আমি নির্বাচন নিয়ে বেশি কথা বাড়াব না। যাঁরা দেশের ভেতর আছেন, তাঁরা বলবেন এ নিয়ে।
আমার যেটা চোখে পড়েছে, তা হলো মানুষের উচ্ছ্বাস। মানুষ হঠাৎ যেন মুক্তির স্বাদ অনুভব করেছে। বাক্স ভর্তি হোক আর হাফ খালি বা ভরা হোক, মানুষ এবার যেন হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। এর মূল কারণ একটি ভোট বা নির্বাচন শুধু না, এর পেছনে আছে মানুষের ভয়ভীতি আর আশঙ্কা মুক্তির আবেগ। ভয়ভীতি আমাদের মতো দেশে স্বাভাবিক। এখানে নির্বাচন মানেই হইচই আর মারামারি। সেদিক থেকে তারপরও জনগণ তাদের রায় জানিয়েছে। কারণ তারা পরিবর্তন চায়।
যাঁরা দেশ শাসন করবেন, তাঁদের কাছে মানুষের চাওয়া খুব সামান্য। যত ভিডিও বা নিউজ দেখেছি, সবখানে সাধারণ মানুষ ভালোভাবে ভাত, কাপড় আর নিরাপদ থাকার আশা ব্যক্ত করেছেন। তাঁদের নিরাপত্তা যে বিঘ্নিত হয়েছিল, এটা তার প্রমাণ। এখন আমরা খুব স্বাভাবিক কারণে আশা করব, দেশে নিরাপদ একটা সমাজ থাকবে, যেখানে মুখ খোলার জন্য, লেখার জন্য বা প্রতিবাদের জন্য মানুষ প্রাণ হারাবে না। মানুষকে নিগৃহীত হতে হবে না। গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা ভিন্নমত। এই ভিন্নমত যদি গ্রহণ করা না হয়, আখেরে পরিণাম ভালো হয় না। বারবার এই সত্য বাস্তব হওয়ার পরও আমরা তা মানতে নারাজ।
বাংলাদেশের সংস্কৃতি আর সমাজের একটা বড় বৈশিষ্ট্য তার উদারনৈতিকতা। এর সঙ্গে ধর্ম বা বিশ্বাস কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক কিছু না। তবু বারবার এর ওপর আঘাত এসেছে। আঘাত এলে গাছের পাতা যেমন ঝরে পড়ে, তেমন অনেক কিছু ঝরে গেছে। কিন্তু গাছ ভেঙে পড়েনি। এটাই আমাদের মূল শক্তি। আঘাত সহ্য করে মহিরুহ সংস্কৃতি প্রমাণ করে দিয়েছে তার কোনো বিনাশ নেই।
বাংলাদেশ যখনই এগোতে থাকে, তখন যাঁরা দূর থেকে দেখেন তাঁরা বলেন, এ দেশের নারীরা আমাদের এগিয়ে রাখেন। তাঁরা কেবল ঘরে ব্যস্ত না আজকাল। তাঁরা পোশাকশিল্প থেকে শুরু করে নানা খাতে আমাদের এগিয়ে রেখেছেন। যদি তাঁদের আমরা সম্মান না করি বা অবহেলা করি, তার প্রতিদান দিতে হয়। বলাবাহুল্য, তার মূল্য অনেক বেশি।
বিশ্ব মিডিয়া, বিশেষত অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া এবার দারুণ কভারেজ দিয়েছে নির্বাচনের। টিভি, সংবাদপত্র—সব জায়গায় এবারের নির্বাচন ও ফলাফলকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার পাশাপাশি সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। ওই যে বলছিলাম, হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো আলো এসে পড়েছে বাংলাদেশের অবয়বে; সে কারণেই আমাদের আগামী হবে সাবধানতা আর গণতন্ত্রের যৌথ পথচলা। তারেক রহমান দীর্ঘকাল লন্ডনে থেকেছেন। গণতন্ত্রের সূতিকাগার নামে পরিচিত বিলেত দেশ তাঁকে কী জানিয়েছে বা কী পাঠ দিয়েছে, সেটাই এখন দেখব আমরা। এমন একটি দেশ বা সমাজে থাকার কারণে তাঁর পরিমিত বাচনশৈলীসহ নানা বিষয় আমাদের ভালো লাগছে। এমনকি ভোটে জেতার পর বিজয় মিছিল বা সমাবেশ না করার সিদ্ধান্তের বিষয়টিও দারুণ।
ভারী কথা থাক। নির্বাচন নিয়ে হালকা কিছু কথা হোক। কমিউনিস্ট শাসিত এক দেশে অপারেশন করাতে গিয়েছিলেন এক লোক। খুব সহজ অপারেশন। টনসিল কেটে বের করতে হবে। মুখ খোলার পরিবর্তে তারা তাকে পিছ ফিরিয়ে শুইয়ে গলার পেছন দিক কেটে কী কী সব করার পর যখন বলল, ‘অল গুড, সব ঠিক হয়ে গেছে’, লোকটা অবাক! তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাঁর কিছু জানার আছে কি না। তিনি বললেন, ‘একটাই প্রশ্ন, আপনারা আমাকে মুখ হাঁ না করিয়ে এতসব করলেন কেন? হাঁ করালেই তো টনসিল বের করে ফেলতে পারতেন।’ অভিজ্ঞ ডাক্তার মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘ভাইসাব, আমাদের দেশে মুখ খোলা নিষেধ। জানেন না আপনি?’
আমাদের বন্ধ মুখ খোলার জন্য যে নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল, তা সম্পন্ন হয়েছে। যাঁরা তা করতে দিলেন, তাঁদের ধন্যবাদ। এখন জাতি ও দেশের বাইরের বাংলাদেশিদের একটাই চাওয়া—শান্তি আর শান্তি। অযথা আগুন, উত্তাপ আর ক্রোধের বাইরে একটা শান্তিময় বাতাবরণ প্রয়োজন। ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় ফিরে যাক, কৃষক তাঁর মাঠে। শ্রমিক ফিরে যাক কলকারখানায়, মানুষ ফিরে যাক যার যার গৃহে। আমাদের এই মায়ার দেশটি মমতায় মাখা এক দেশ। বারবার সে তার এই মায়ার কথা জানান দেয়। এবারও দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণ-অভ্যুত্থানের শক্তি আর গণতন্ত্র মিলে রচিত হোক আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: অস্ট্রেলিয়াপ্রবাসী কলামিস্ট