ঝিনাইদহে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার পর নাসীরুদ্দীন মামলা করতে গেলে থানার সামনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের ব্যাপক বিক্ষোভের ঘটনা সারা দেশে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সম্পর্কে লাগাতার আক্রমণাত্মক ও অশালীন বক্তব্যের কারণে নাসীরুদ্দীনের ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় শুধু যে বিএনপির লোকজনই খুশি, তা কিন্তু নয়, নানা দলমতের মানুষেরও এ নিয়ে মজা করতে দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
এসব দেখে আমিও একটি ছোট পোস্ট দিই। তাতে লিখি, ‘কাউকে পছন্দ না হলে বর্জন করুন। কেউ অন্যায় করলে নিয়মমাফিক প্রতিবাদ করাও সংগত। কিন্তু মব-হামলা ভালো নয়। ঝিনাইদহে নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা ঠিক হয়নি।...’ আমার এই বক্তব্যের সমর্থক সমাজে নিশ্চয়ই আছেন; তবে ফেসবুক পোস্টের মন্তব্যে তেমনটি দেখা যায়নি। যাঁরা মন্তব্য করেছেন, তাঁদের সবার কথার অর্থ একটাই—নাসীরুদ্দীনের সঙ্গে যা হয়েছে, ঠিকই হয়েছে। মানুষের এই মনোভাব সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য মোটেই শুভ নয়।
ঝিনাইদহের ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার দেওয়া বক্তব্য আরও উদ্বেগজনক। নাসীরুদ্দীনের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যদি গ্রেপ্তার না করা হয়, আপনারা যদি ভায়োলেন্স (সহিংসতা) বেছে নেন, তাহলে আমাদেরকেও ভায়োলেন্স বেছে নিতে বাধ্য হতে হবে।’ ক্ষমতাসীন দল ও সরকারকে হুঁশিয়ার করে সাবেক উপদেষ্টা আসিফ বলেন, ‘বিরোধী দল থেকে বারবার সদিচ্ছা দেখানো হলেও সরকারি দল ভায়োলেন্স চাচ্ছে। আমাদের রক্ত গরম এবং বয়স কম হলেও আমরা বুঝি যে কখন কী করতে হবে, কখন দেশ গড়ার দিকে কাজ করতে হবে। কিন্তু যদি সরকারি দল ভায়োলেন্স চায়, সেটাকেই একমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নিতে চায়, তাহলে এটা যে আমাদের থেকে বেশি কেউ পারবে না, সেটা ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি।’
আসিফ মাহমুদের এই বক্তব্য একদিকে যেমন উদ্বেগের, অন্যদিকে বিশেষ ইঙ্গিতবহও। পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্যে ব্যাপক জনরোষের শিকার হয় থানাসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা। পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে ৫ হাজার ৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়। এর মধ্যে এখনো উদ্ধার হয়নি ১ হাজার ৩২৮টি। এগুলোর মধ্যে আছে ৩৩টি এসএমটির মতো সাবমেশিনগান। এ ছাড়া রয়েছে এসএমজি ২২২টি, চায়নিজ রাইফেল ১ হাজার ২টি, এসএমজি-টি ৩১টিসহ বিভিন্ন মডেলের অত্যাধুনিক অস্ত্র। অস্ত্র লুটের প্রথম ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই। সেদিন নরসিংদী জেলা কারাগারে নজিরবিহীন হামলা, অগ্নিসংযোগ ও অস্ত্র লুটের ঘটনা ঘটেছিল। কারাগারের অস্ত্রাগার এবং কারারক্ষীদের কাছ থেকে ৮৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৮ হাজারের বেশি গুলি লুট করা হয়। সেই অস্ত্র-গুলির কিছু অংশও কি আন্দোলন চলাকালে ব্যবহৃত হয়নি? আসিফের কথায় তেমন কোনো ইঙ্গিত কি মেলে? উদ্ধার না হওয়া এসব আগ্নেয়াস্ত্র কিন্তু এখনো বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের সময় নীল টি-শার্ট ও সাদা পাঞ্জাবি পরা দুই যুবক কোমর থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের মতো কিছু একটা বের করে সেটি নিয়ে টানাটানি করছিলেন। সেই ছবি ও ভিডিও ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ওই দুই যুবকের পরিচয় কী—সেই প্রশ্নও ঘুরে বেড়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ প্রসঙ্গে এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা এক সংবাদমাধ্যমকে বলেন, দুই যুবক আশিক ও সিয়াম স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তাঁরা এনসিপি করেন না। কিন্তু নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে তাঁরা ভালোবাসেন। ঝিনাইদহ সফরের খবর পেয়ে তাঁরা স্বেচ্ছাসেবক হতে আগ্রহী হন। তাঁদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিল না। এটি একটি স্ট্রিজ, যা একধরনের লাঠি।
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত, সমালোচিত, মব ও সংঘাত উসকে দেওয়া ব্যক্তি নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।’ নাছির ফেসবুকে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর সঙ্গী দাবি করে দুই অস্ত্রধারীর কয়েকটি ছবি ও তাঁদের পরিচয়ও পোস্ট করেন। তিনি আরও লেখেন, ‘শুক্রবার ঝিনাইদহে গিয়েছিলেন মব করার জন্য, কিন্তু সেখানে সাধারণ জনতা পাটওয়ারীকে ডিম নিক্ষেপ করেছে। এ সময় তাঁর সঙ্গে থাকা সন্ত্রাসীরা সাধারণ জনতার উদ্দেশে গুলি করার চেষ্টা করে।’ অস্ত্রধারী দুজনের পরিচয় প্রকাশ করে তিনি লেখেন, ‘অস্ত্রধারী দুজন শিবিরের সন্ত্রাসী। তাদের একজন সিয়াম উদ্দিন তূর্য (পাঞ্জাবি পরা)। তার বাবা জামায়াতের নেতা সল্টু মাস্টার (শিক্ষক, বদরগঞ্জ মাদ্রাসা)। আরেকজন আশিক (টি-শার্ট পরা)। তার বাবা বাদশা (মৃত)। তিনি শিবিরের নেতা।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা ছাড়াও এ দেশে অনেক অঘটনের সঙ্গেই জামায়াত-শিবিরের নাম জড়িয়ে আছে। বিপুল অর্থের ভান্ডার আর ‘গুপ্ত’ পরিচয়ে থাকা অনেক লোকজন থাকায় এসব দিয়ে নানা সময়ে নানা নামের সংগঠন বানাতে দলটি পারঙ্গম। এনসিপিও তেমনই একটি দল বলে অনেকের অভিমত। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের তখনকার সমন্বয়ক আবদুল কাদের গত ২২ এপ্রিল এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘ওপরে-ওপরে পার্টি, ভেতরে-ভেতরে “প্রক্সি উইং”—এনসিপির অবস্থা যদি এমন হয়, তাহলে দল হিসেবে এনসিপির ভবিষ্যৎ কী?’
এনসিপি থেকে বিভিন্ন সময়ে পদত্যাগ করা বেশ কয়েকজন নেতারও এমনটাই দাবি। গত ডিসেম্বরে এনসিপি ছেড়েছিলেন দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তাজনূভা জাবীন। তখন তিনি বলেছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে জোট হওয়ার বিষয়টিতে শুধু আদর্শগত বা ঐতিহাসিক কারণে নয়, বরং যে প্রক্রিয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটিই তাঁর প্রধান আপত্তির জায়গা। তাঁর দাবি, এটিকে রাজনৈতিক কৌশল বা নির্বাচনী সমঝোতা বলা হলেও বাস্তবে এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার ফল। এর পরের মাসে দল ছাড়েন বান্দরবান জেলা এনসিপির সদস্যসচিব মোহাম্মদ এরফানুল হক। ওই সময় তিনি বলেন, ৫ আগস্টের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে সারা দেশে এনসিপির অবস্থা ভালো নয়। তাদের জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে মিশে যাওয়া ছাড়া আর কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ৫ আগস্ট-পরবর্তী মব সন্ত্রাসে এনসিপি ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতাই বেশি দেখা যায়। এমনকি মব সন্ত্রাসের সমালোচকদের দেখে নেওয়ার হুমকি তখন কে কীভাবে দিয়েছিলেন, সে ঘটনার ভিডিও ফুটেজ এখনো ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।
চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের বিজয়-পরবর্তী সময়ে ক্রমবর্ধমান মব সন্ত্রাস বা দঙ্গলবাজির পরিপ্রেক্ষিতে গত বছরের জুনে ‘তোমার অন্যায়ে জেনো এ অন্যায় হয়েছে প্রবল’ শিরোনামে লিখেছিলাম, ‘মনে রাখা দরকার, একটা অন্যায় দিয়ে আরেকটা অন্যায়কে কখনোই জায়েজ করা যায় না। এমন চেষ্টা করলে বরং হিতে বিপরীত হয়ে থাকে। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে যেকোনো অপরাধ বহুমাত্রিক রূপ নেয় এবং জ্যামিতিক হারে বাড়ে। বিশেষ করে ক্ষমতার পালাবদল হলে প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার রূপ-মাত্রা কতটা বাড়ে, সেটা বাংলাদেশের মানুষের চেয়ে কে আর বেশি জানে।’ তখনো ভাবিনি এত কম সময়ের মধ্যে এমন বিপরীত প্রতিক্রিয়া দেখতে পাব।
তখন আশঙ্কা ছিল, মব সন্ত্রাসের যারা শিকার হচ্ছিল, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলে তারা প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরও বেশি মাত্রায় সহিংসতা ঘটাতে পারে। গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার যে পরিবর্তনটা হয়েছে, সেটা তো একটা ধারাবাহিকতা ছাড়া কিছু নয়। অনেক বিষয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন সত্ত্বেও বর্তমান সরকার যে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারেরই লিগ্যাসি বহন করছে, তা নিয়ে খুব বেশি বিতর্কের অবকাশ কি আছে? গত সরকারের উপদেষ্টার বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাওয়াটা তো সামান্য একটি নজির মাত্র। তখনকার মব সন্ত্রাসের অনেক ঘটনায় বর্তমান ক্ষমতাসীন দল কিন্তু কেবল নীরব দর্শকই ছিল না, কোনো কোনো ঘটনায় তাদের লোকজন সরাসরি জড়িত ছিল; বিশেষ করে আদালত অঙ্গনে সংঘটিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে।
কাজেই এখন বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে যা ঘটছে তাকে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বলাই সংগত। ‘ব্যাক ফায়ার’ হওয়ার আশঙ্কা তো আছে তখন, ৫ আগস্ট-পরবর্তী দেড় বছরে যাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁরা যখন রাজনীতির মাঠে পুরোপুরি ফিরে আসবেন। এই অনিবর্তনীয় পরিণতি এড়ানো সম্ভব হতে পারে কেবল বর্তমান ক্ষমতাসীনদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তনের মাধ্যমে।
আজাদুর রহমান চন্দন, সাংবাদিক ও গবেষক