নির্বাচনের আমেজে ভাসছে দেশ। তারপরও কেমন যেন একটা চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে মানুষের মনে। কী হবে সামনে, তা নিয়ে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তকও নির্দ্বিধায় কোনো মন্তব্য করতে পারবেন বলে মনে হয় না। নির্বাচন কি সেই হতাশাজনক পরিস্থিতিকে পেছনে ফেলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে?
পেছনে ফিরে যাই। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে কোটাবিরোধী আন্দোলন যখন এক দফা আন্দোলনে পরিণত হলো, তখনো কেউ জানত না, সরকারের পতন হবে। সবার মনে আছে নিশ্চয়ই, সে সময়ের দেয়াললিখন কিংবা মিছিল থেকে যে স্লোগান উঠত, তা আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে তুলে ধরত। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় তা বলীয়ান ছিল। সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে, সে দেয়াললিখনগুলো, সে স্লোগানগুলো কি তাহলে মেকি ছিল? মিথ্যে ছিল? নিজের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে এখন তা ছুড়ে ফেলা হয়েছে? এমন প্রশ্ন উঠছে নানা মহলে। যাঁরা দেশ নিয়ে ভাবেন, তাঁদের অনেকেই নিজেকে প্রতারিত বলে ভাবলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
বলা হয়েছিল আন্দোলনটি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত। এরপর বলা হলো, এই আন্দোলন মেটিকুলাস ডিজাইনের ফল। শুরুতে ‘মেটিকুলাস’ কথাটাকে অসার বলে মনে হতো। এখন কিন্তু মনে হয়, কথাটা অসত্য না-ও হতে পারে। যাঁরা ক্ষমতায় এসেছেন কিংবা যাঁদের নিয়ে বর্তমান প্রশাসনের আশা-আকাঙ্ক্ষা, তাঁদের অনেকেই নিশ্চয়ই এই ডিজাইনের অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু সাধারণ মানুষ আর সাধারণ শিক্ষার্থীরা—যাঁদের আমরা ছাত্র-জনতা বলছি, তাঁরা কি জানতেন, দেশের গতিপথ কোন দিকে?
২. অনেক বিষয় নিয়েই মানুষের মনে প্রশ্ন আছে। আসন্ন নির্বাচনের কথা বিবেচনা করে তারই কিছু নিয়ে আলোচনা করা যায়।
প্রথম যে বিষয়টি মনে ধাক্কা দিয়েছিল, তা হলো এইচএসসি পরীক্ষায় অটোপাসের দাবিতে কিছুসংখ্যক শিক্ষার্থী সচিবালয়ের সামনে গিয়েছিল। অনেকেরই মনে পড়ে যাবে, কোটাবিরোধী আন্দোলনের সময় কিছু পরীক্ষা আটকে গিয়েছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে এই অটোপাসের দাবি। দেশের মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করল, সেই দাবি মেনে নিয়েছে সরকার। এ নিয়ে সমালোচনা হয়েছে অনেক, কিন্তু তা কেউ পাত্তা দিয়েছে বলে মনে হয় না। এটা যে মেধার মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বাধা, সেটাও কি কেউ লক্ষ করেনি? অটোপাস শিক্ষার্থীরা কি মেধাবী হিসেবেই বিবেচিত হবে? তাদের যাচাই করার সুযোগ কি থাকছে?
ডিজাইনের মধ্যে ছিল কি না, সেটা অস্পষ্ট, কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকেরা হেনস্তা হচ্ছিলেন পরিবর্তনের পর থেকেই। শিক্ষার্থীদের হাতে সে ক্ষমতা ছিল। সে সময় শুধু নয়, এখন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্র সংসদের নেতারাও শিক্ষকদের নিগ্রহ করছেন। একটা সময় ফেসবুক আর ইউটিউব ভরে গিয়েছিল শিক্ষক হেনস্তার ভিডিওতে। এই বাস্তবতা কি কারও জন্য স্বস্তিকর হয়েছে? আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, এই বাস্তবতা কি আমাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নকে ঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে? কেউ কি এই প্রবণতার মধ্যে ভালো কিছু দেখছেন? শিক্ষকদের হেনস্তা করা যাবে—এ রকম একটি বার্তাই কি পেয়ে গেল না শিক্ষার্থীরা? তাহলে কি নতুন বন্দোবস্তে শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষকেরা নিগৃহীত হবেন, এটাই হয়ে উঠবে তাঁদের ললাটলিখন?
অনেকেই বলবেন, গণ-আন্দোলনের পর এ রকম ঘটনা ঘটতেই পারে। পারে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা কত দিন ধরে চলতে পারে? বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও যখন শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেই প্রবণতা দেখা যায়, তখন বলতেই হয়, এর মধ্যে ভুল আছে, অন্যায় আছে, নৈতিকতার অভাব আছে। এই নির্যাতনকারী শিক্ষার্থীরা সমাজের জন্য কোনো সুখবর নিয়ে আসতে পারে কি? শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কটিও কি সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে? দেশের সিংহভাগ শিক্ষার্থী কি তাঁদের নেতাদের এহেন কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেন? প্রশ্নগুলো এড়ানো যাবে না।
৩. একথা কি অস্বীকার করা যাবে, সরকার পরিবর্তনের পর সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ? আওয়ামী লীগ-বিরোধিতার নাম করে মুক্তিযুদ্ধকে তুচ্ছ করার প্রবণতা কি দেখা যায়নি? সেটাও কি পরিকল্পনার অংশ ছিল? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে সেটা খুবই ভয়াবহ পরিকল্পনা। মুক্তিযুদ্ধকে যারা মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেনি, তারা এবং চৈনিক বামদের একাংশ মিলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে চেয়েছে। কেউ কেউ ইতিহাস থেকে মুছে দিতে চেয়েছে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। কিন্তু ইতিহাস অন্য সাক্ষ্য দেয়। আওয়ামী লীগ সরকার দেশের জনযুদ্ধটাকে আওয়ামী লীগের নিজস্ব যুদ্ধ বলে প্রচার করে অন্যায় করেছে, কিন্তু সে কারণে মুক্তিযুদ্ধকে অগ্রাহ্য করতে হবে—এ কেমন কথা? শেখ মুজিবুর রহমানের সংগ্রাম, তাঁর অনমনীয় নেতৃত্বের কারণে স্বাধিকারের প্রতি বাঙালির অঙ্গীকার, এগুলো ভুলে গিয়ে তাঁর শরীরে ফ্যাসিবাদী তকমা এঁটে দিলেই কি ইতিহাস পাল্টে যাবে? আওয়ামী লীগ তাদের মতো করে ইতিহাস লিখতে চেয়েছে, সেটা মোটেই ঠিক হয়নি। কিন্তু এখন যাঁরা মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবদানকে অগ্রাহ্য করছেন, তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে কী অবদান রেখেছিলেন, সে কথা কি তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে না?
ফেসবুক বা ইউটিউবে রাজনীতির মাঠটিকে যেমন দেখা যায়, আদতে কি দেশের মানুষ সেভাবে দেশকে দেখছে? যোগাযোগমাধ্যমের শক্তি ভয়ংকর। যা ঘটে বা ঘটে না, তা নিয়ে যখন তোলপাড় হতে থাকে, তখন সেই হাজারো বক্তব্যের ভিড়ে সত্য যাচাই করে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। আমরা এখন সে রকম অরাজক এক যোগাযোগমাধ্যমের শাসনে দিন কাটাচ্ছি।
জোটের রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বর্তমান কর্মকাণ্ড অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কোন দলের কোন অবস্থান, সেটা ঠিকভাবে অনেক সময় বোঝা যায় না। এটা স্পষ্ট, এই সরকারের কর্মকাণ্ডে ভারতবিরোধিতা ও ফ্যাসিবাদ নিয়ে কথাবার্তা যতটা স্থান পেয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের গৌরব ততটা পায়নি। সত্যের খাতিরে বলতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারগুলোর কথা স্মরণ করে দেশ গড়ার চেয়ে অন্যদিকে নজর দেওয়ার ফলে ছাত্র-জনতার মনে হতাশা জমেছে। এটা যেকোনো কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে, হাটে-মাঠে-ঘাটে গিয়ে কিছুক্ষণ যে কারও সঙ্গে কথা বললেই যে কেউ বুঝে নিতে পারবেন। যে ছাত্র-জনতার কথা বলে রাজনীতির মাঠ দখল করার চেষ্টা করেছে কেউ কেউ, সেই ছাত্র-জনতা কিন্তু ক্ষমতাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে যোজন দূরে গিয়ে অবস্থান নিয়েছে, এ কথা না বুঝলে বিপদ। এই দেশে স্বাভাবিক গণতন্ত্র বিকশিত হবে, নাকি নানা ধরনের রক্ষণশীল শক্তি তাদের দন্ত-নখর মেলে রক্তাক্ত করবে দেশটাকে, সে প্রশ্নটির মীমাংসা হয়নি।
প্রধান উপদেষ্টা বারবার জোর দিয়ে বলছেন, ১২ ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে। এত জোর দিয়ে বলার কি কিছু আছে? জোর দিয়ে বলার কারণ কি কোনো ধরনের শঙ্কা? নির্বাচন বানচালের কোনো শঙ্কা আছে কি? নির্বাচন কমিশন আর সরকারের পক্ষ থেকে নির্বাচনের জন্য পরিবেশ অনুকূল আছে বলা হচ্ছে। আসলেই কি নির্বাচনের বুথগুলোয় সহজে যেতে পারবে ভোটার? নাকি কেউ বাধা দেবে? বাধা দিলে তা ঠেকানোর কোনো উপায় কি রয়েছে?
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা রাজধানীর একটি হোটেলে ‘উচ্চশিক্ষার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা-২০২৬’ শীর্ষক দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সম্মেলন উদ্বোধনকালে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে তিনি তরুণদের কেউ কেউ নির্বাচিত হবে, কেউ শিক্ষামন্ত্রী হবে—এ রকম কথা বলেছেন। ভালো বক্তা হিসেবেই ড. ইউনূস সারা বিশ্বে পরিচিত। শাসক নয়, বক্তা হিসেবেই তিনি বিশ্বজুড়ে নাম করেছিলেন। তিনি স্বপ্ন দেখাতে পারেন। স্বপ্নের শেষে বাস্তবতা কোথায় এসে দাঁড়াবে, সেটা বক্তার বিবেচ্য বিষয় নয়। উপস্থিত সুধীমণ্ডলীর বাহবা পাওয়া সেখানে সহজ। কিন্তু দেশ পরিচালনার সময় শুধু স্বপ্ন দেখানো অনেকটা শুকনো কথায় চিড়ে ভেজানোর মতো ব্যাপার। সবাইকে বুঝতে হবে, দেশ শুধু একদল উদ্যোক্তা দিয়ে চলে না। এনজিও দিয়ে চলে না। যাদের ছাত্র-জনতা বলা হচ্ছে, তারা ফিরে গেছে ঘরে। তারাই মূল চালিকাশক্তি। তারাই দেশটা চালায়। তাদের জন্যই টিকে থাকে দেশ। এ কথা ভুললে চলবে?
এ ছাড়া আরও বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে ঝুলছে, গণভোট নিয়ে। এই বিষয়টি নিয়ে ধাঁধা এখনো কাটেনি। যেভাবে ব্যালটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার জন্য একগাদা প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে, তাতে কীভাবে ভোট দিতে হবে, সে সংশয় কি কেটেছে দেশের মানুষের? যদি কোনো একটি পয়েন্ট ভোটারের পছন্দ না হয়, বাকিগুলো পছন্দ হয়, তখন তিনি ‘হ্যাঁ’ ভোট দেবেন নাকি ‘না’ ভোট দেবেন? এই সমস্যার সমাধান আসলে সম্ভব বলে মনে হয় না। ব্যাংকগুলো ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যে প্রচারণা চালাচ্ছে, তার কোনো আইনি ভিত্তি আছে কি?
এ রকম নানা প্রশ্ন আরও উঠবে। নির্বাচন সময়মতো হতে হলে আরও অনেক বিষয়ে উদার হতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। বর্তমান সিইসি কি বুঝতে পারছেন, তিনি কোন সংকটে পড়েছেন? যদি এই সরকারের আমলে অবাধ, সুষ্ঠু একটি উৎসবমুখর নির্বাচন উপহার দিতে না পারেন, তাহলে ক্ষমতা বদলের পর তাঁর কী হাল হবে, সেটা মনে রেখেই তো তাঁকে নির্বাচনের দায়িত্ব নিতে হবে। নইলে নতুন ঐতিহ্য অনুযায়ী গলায় জুতার মালা আর হইহই করা বিশৃঙ্খল জনতার চাপে তাঁর কী দশা হবে, সেটা নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না।
আমরা এখন এমন দিশাহীন অবস্থায় আছি।