হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

রমজানে বইমেলা, আয়ের আশা নাকি নিশ্চিত ক্ষতি

শোয়েব সাম্য সিদ্দিক

সরকার স্টলভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিলেও প্রকাশকদের আশঙ্কা কাটেনি। ছবি: আজকের পত্রিকা আর্কাইভ

শপথের মঞ্চ তখন প্রস্তুত, রাজনৈতিক উত্তেজনা তুঙ্গে। সে সময় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে যায় কয়েক শ প্রকাশকের একটি জরুরি চিঠি। সময় খুব কম, উদ্বেগ অনেক। কারণ একটাই—২০ ফেব্রুয়ারি থেকে বইমেলা শুরুর সিদ্ধান্ত, যা পড়ছে রমজানের মধ্যে। প্রকাশকদের ভয়টা সোজা—এই সময়ে মেলা হলে বিক্রি কমে যাবে। তাই সরকার গঠনের মুহূর্তেই তাঁরা চাইছেন সিদ্ধান্তটি নতুন করে ভাবা হোক।

তিন শতাধিক প্রকাশক চিঠিতে লিখেছেন, রোজার মধ্যে মেলা মানে তাঁদের জন্য সরাসরি ব্যবসায়িক আত্মহত্যা। তাঁদের কথা সহজ। রমজানে মানুষের সময় কম থাকে, কেনাকাটাও কমে যায়। যদিও এবার স্টল ভাড়া দিতে হচ্ছে না, কিন্তু সাজসজ্জা, কর্মচারী খরচ তোলাই তো কঠিন হয়ে পড়বে। একবার টাকা ডুবলে সেটা আর তোলার রাস্তা থাকে না।

অমর একুশে বইমেলা আবেগের জায়গা ঠিকই, কিন্তু হিসাবের খাতায় আবেগ চলে না। বাংলাদেশে বই পড়ার অভ্যাস এমনিতেই কম। ১০২ দেশের মধ্যে অবস্থান ৯৭তম। ৯৫ শতাংশ বইয়ের প্রথম মুদ্রণ ৩০০ কপির কম, তারও ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় না। গত দেড় বছরে বিক্রি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। এই অবস্থায় রোজার মধ্যে মেলা হলে খরচ উঠবে না, এটাই তাঁদের মূল ভয়।

ফেব্রুয়ারিতে রমজান হওয়ার কারণে মানুষের খরচ চলে যাবে ঈদের কেনাকাটায়। ইচ্ছে থাকলেও তারা বই কেনার দিকে নজর দিতে পারবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় মূল ক্রেতা শিক্ষার্থীরাও ঢাকার বাইরে চলে যাবে। ফলে মেলা জমবে না। ফলে প্রকাশকদের লোকসান হওয়ার আশঙ্কা আছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে লজিস্টিক সংকট। নির্বাচনের কারণে নির্মাণসামগ্রীর অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং তাড়াহুড়া করে স্টল তৈরির বাড়তি খরচ। স্টলের বেশির ভাগ কর্মী শিক্ষার্থী, ঈদের আগে তারা বাড়ি যেতে চাইবে। রোজা রেখে সারা দিন কাজ করে ইফতারের পর রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকা তাদের জন্য কষ্টকর হবে। সব মিলিয়ে প্রকাশকদের আশঙ্কা, এই সময়ে মেলা হলে তা উৎসব নয়, বরং নিশ্চিত ক্ষতির আয়োজন হবে।

প্রকাশকদের বিশ্বাস, একটু নীতিগত সহায়তা পেলেই বইশিল্প ঘুরে দাঁড়াতে পারে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশে প্রকাশকেরা ব্যক্তিগত ঝুঁকি নিয়ে, সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই বই প্রকাশ করে থাকেন। রাষ্ট্র যদি একেবারে চুপ থাকে, তাহলে এই শিল্প কত দিন টিকবে? একটি বই বাজারে আনার আগে কম্পোজ, প্রুফ, প্রচ্ছদ, ছাপা, বাঁধাই, বিপণন—প্রতিটি ধাপেই খরচ বড় অঙ্কে দাঁড়ায়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে শতকোটি টাকার বই ছাপা হয়, কিন্তু বাংলা একাডেমির হিসাবে গত বছর বিক্রি হয়েছে ৪৭ কোটি টাকার বই, যা আগের বছরের ৫২ কোটির চেয়ে কম।

প্রকাশনাশিল্পের সংকট বিশ্বজুড়ে থাকলেও বাংলাদেশে তার গভীরতা বেশি। ইউনেসকোর তথ্যমতে, বিশ্বে বই পড়ার হার কমছে, তবে ভারতে সাপ্তাহিক গড় পাঠ সময় ১০ ঘণ্টা ৪২ মিনিট, সেখানে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। সর্বশেষ মেলায় বহু প্রকাশক বিনিয়োগ তুলতে পারেননি, অথচ পুরো আয়োজনের আর্থিক ঝুঁকি তাঁদেরই বহন করতে হয়েছে।

তাই তাঁদের বড় দাবি সরকারি বই ক্রয়ের নীতিতে পরিবর্তন এনে মানসম্মত বই রাষ্ট্রীয়ভাবে কেনা হোক, যাতে ঝুঁকি কমে এবং সাহস নিয়ে নতুন বই প্রকাশ করা যায়। অনেক দেশে এ ধরনের সহায়তা প্রকাশনাশিল্পকে টিকিয়ে রেখেছে। আমাদের দেশেও শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মচারীদের বই কেনায় উৎসাহ দেওয়া গেলে পাঠক বাড়বে। কারণ, বাস্তবতা হলো অধিকাংশ বই খুব সীমিত সংখ্যায় ছাপা হয় এবং সেই সীমিত মুদ্রণই প্রকাশকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

ঈদের পর মেলা আয়োজন করা গেলে মানুষের খরচের চাপ কিছুটা কমে এবং বই কেনার আগ্রহ বাড়ে। অন্যদিকে, কেউ কেউ বলছেন, ফেব্রুয়ারির সময়সূচি ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত, এটা বদলালে ঐতিহ্য নষ্ট হবে। কিন্তু প্রকাশকেরা বলছেন—মেলা চাই, তবে ধ্বংসের পথে যেতে চাই না। বাংলাদেশে বইয়ের বাজার ছোট, আর পাঠকের অভ্যাসও কম। ইউনেসকোর রিপোর্ট অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পাঠকের হার কমার কারণ অর্থনৈতিক চাপ। ফেব্রুয়ারিতে রমজান আর ঈদের কারণে এই চাপ বাড়বে।

আমার ব্যক্তিগত মতামত, ফেব্রুয়ারিতে ভাষাশহীদদের স্মরণে একটি সংক্ষিপ্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর প্রতীকী বইমেলা রাখা যেতে পারত, যেখানে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হতো কিন্তু ব্যাপক বিক্রয় কার্যক্রম থাকত না। নির্বাচন বা দুর্যোগের মতো বিশেষ অবস্থায় এই প্রতীকী আয়োজনটুকু রেখে পরে সবাই মিলে বসে আসল মেলার সময় ঠিক করা যেত।

তবু সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে অমর একুশে বইমেলা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার স্টল ভাড়া মওকুফের ঘোষণা দিলেও প্রকাশকদের আশঙ্কা কাটেনি। তাঁদের মতে, ভাড়া পুরোপুরি মওকুফ হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে পুঁজি উঠবে না। মেলা তো লেখক, পাঠক আর প্রকাশকদের নিয়েই, তাহলে তাদের মতামত ছাড়া একতরফা সিদ্ধান্ত কেন?

যেহেতু এই মেলার প্রাণ একুশকে ঘিরেই, তাই একুশেই হয়ে উঠুক সত্যিকারের প্রাণের মেলা। এর আগে বাংলা একাডেমি চত্বর থেকে মেলা সরানোর সময় তুমুল বিতর্ক উঠেছিল, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে সময়ের প্রয়োজনে সেই পরিবর্তন সবার জন্যই মঙ্গলজনক হয়েছে। তাই প্রতিবছরই মেলার সময় নিয়ে, বিশেষ করে জাতীয় কোনো সংকট বা রমজানের সঙ্গে সংঘাত হলে, সব পক্ষের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলা জরুরি।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

যেকোনো চুক্তি করার এখতিয়ার অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না: ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া

জাপানে বাংলা ভাষার অগ্রযাত্রা

আমাদের ভাষার সংগ্রাম ও বর্তমান সময়

বিএনপির প্রতিশ্রুতি, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা

নতুন সরকারের প্রথম দিন ও সামনের পথ

একুশের এক বিস্মৃত শহীদ আবদুস সাত্তার

মধ্যপ্রাচ্যে কি কোনো দিন শান্তি আসবে

মারণ-রাজনীতির নয়া হাতিয়ার এআই-অ্যালগরিদম

আরব বিশ্বের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশের অর্থনীতি: বর্তমান সমস্যা ও ভবিষ‍্যৎ অন্তরায়