হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

যুদ্ধ কলঙ্কিত করে বিজ্ঞানীদের অর্জন

মোশফেকুর রহমান

স্বার্থান্বেষী ও ক্ষমতালোভী কিছু মানুষ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কারের অপব্যবহার করে। ছবি: এএফপি

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ আজ আর শুধু স্বচ্ছ নীল নয়, সেখানে গর্জে উঠছে আধুনিক যুদ্ধবিমান; নিখুঁত লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র ন্যানো সেকেন্ডে ছুটে চলে, আর নিঃশব্দে আকাশে ভেসে থাকা নজরদারি ড্রোন সুযোগ বুঝে প্রাণঘাতী আঘাত হানে। স্যাটেলাইট, রাডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জিপিএস—এসব অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে আজকের সমরাস্ত্র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই প্রযুক্তিগুলো কি আসলেই ধ্বংসের জন্য তৈরি করা হয়েছিল?

বাস্তবতা হলো, সামরিক কমান্ডাররা এসব প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে তোলেননি, বরং দিনরাত গবেষণাগারে নিরলস পরিশ্রম করা বিজ্ঞানীরাই গড়েছেন। যেমন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী রবার্ট ওয়াটসন—ওয়াট রাডার প্রযুক্তির পথিকৃৎ। ১৯৩০-এর দশকে তিনি মূলত আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও বায়ুমণ্ডলের পরিবর্তন বোঝার জন্য কাজ শুরু করেন। সীমিত যন্ত্রপাতি এবং অনিশ্চিত তহবিল নিয়ে দিনের পর দিন পরীক্ষা চালিয়ে তিনি এই প্রযুক্তিকে কার্যকর করে তোলেন। কিন্তু খুব দ্রুত সেই প্রযুক্তি পরিণত হয় শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্ত করার যুদ্ধাস্ত্রে।

একইভাবে জার্মানিতে জন্ম নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে কাজ করা বিজ্ঞানী ভের্নার ফন ব্রাউন ছিলেন আধুনিক রকেট প্রযুক্তির অন্যতম স্থপতি। বয়স যখন মাত্র বিশের কোঠায়, তখন তিনি রকেট নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। বহুবার ব্যর্থ হন, এমনকি বিস্ফোরণের ঝুঁকিও নেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল মহাকাশে মানুষের যাত্রা নিশ্চিত করা। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁর প্রযুক্তি ভি-২ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহৃত হয়, যা লন্ডনসহ ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ভয়াবহ ধ্বংস ডেকে আনে। জীবনের পরবর্তী সময়ে তিনি মহাকাশ কর্মসূচিতে অবদান রাখলেও যুদ্ধকালীন সেই অপব্যবহারের জন্য তার ভেতরে অনুশোচনার ছাপ স্পষ্ট ছিল।

ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির মূল ভিত্তি জিপিএস উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখেন মার্কিন বিজ্ঞানী ইভান গেটিং। দীর্ঘ সময় ধরে জটিল গণনা, স্যাটেলাইট সিগন্যালের সঠিকতা এবং বৈশ্বিক নেভিগেশন নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে অসংখ্য প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষ যেন সহজে পথ খুঁজে পায়। অথচ আজ সেই প্রযুক্তি ক্ষেপণাস্ত্রকে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সাহায্য করছে। এভাবেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের দক্ষিণে মিনাব শহরের শাজারাহ তাইয়েবাহ প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় ভবনে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারায় ১৭৫ জন, যাদের প্রায় সবাই খুদে শিক্ষার্থী।

কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি স্থাপন করেন ব্রিটিশ গণিতবিদ অ্যালান টিউরিং। মাত্র ৩০-৪০ বছর বয়সের মধ্যে তিনি এমন সব তাত্ত্বিক ধারণা দেন, যা আজকের আধুনিক কম্পিউটিংয়ের মূল ভিত্তি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি নাৎসি কোড ভাঙার জন্য দিনরাত কাজ করেছেন, প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায়, প্রচণ্ড মানসিক চাপের মধ্যে। তাঁর কাজ লাখ লাখ প্রাণ বাঁচাতে সহায়তা করলেও আজ সেই একই কম্পিউটিং এবং এআই প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয় ড্রোন হামলায় ব্যবহৃত হচ্ছে।

যুদ্ধকালীন এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রতিফলন দেখা যায় বিজ্ঞানীদের নিজস্ব অনুশোচনায়। মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী ও আপেক্ষিকতাবাদের জনক আলবার্ট আইনস্টাইন (জার্মান বংশোদ্ভূত) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পারমাণবিক গবেষণাকে উৎসাহ দিলেও যুদ্ধের শেষ দিকে এর ভয়াবহতা দেখে গভীরভাবে অনুতপ্ত হন। অন্যদিকে, মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী জে রবার্ট ওপেনহাইমার, যিনি পারমাণবিক বোমা তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, পরীক্ষার পর বলেছিলেন, ‘আমি যেন মৃত্যুর রূপ ধারণ করেছি, পৃথিবী ধ্বংসের দূত হয়ে উঠেছি।’

তাঁর এই গভীর স্বীকারোক্তি ও অনুশোচনা বিজ্ঞানীদের অন্তর্দ্বন্দ্বের এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে ওঠে।

বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইউভাল নোয়াহ হারারি মনে করেন, ‘মানুষ প্রযুক্তিগতভাবে দেবতার মতো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, কিন্তু নৈতিকতায় এখনো শিশু রয়ে গেছে।’ একইভাবে, তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং সতর্ক করেছিলেন, ‘প্রযুক্তির অগ্রগতি যদি মানবিকতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে, তবে সেটাই মানবজাতির সবচেয়ে বড় বিপদ হয়ে উঠতে পারে।’

আজকের যুগের সীমিত অথবা সর্বাত্মক যুদ্ধ সেসব সতর্কবার্তাকেই বাস্তবে রূপ দিচ্ছে। যে প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করার জন্য তৈরি হয়েছিল, সেটিই আজ অনেক মানুষের জীবন মুহূর্তে কেড়ে নেওয়ার সবচেয়ে নিখুঁত অস্ত্র হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞানীরা নিজে কখনো ধ্বংস চাননি, কিন্তু স্বার্থান্বেষী ও ক্ষমতালোভী কিছু মানুষের সিদ্ধান্তই তাঁদের সেই অর্জনকে নিরপরাধ মানুষ হত্যা ও পরিবেশ ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয়, প্রশ্নটি মানুষের। আমরা কি আমাদের জ্ঞানকে মানবতার সেবায় ব্যবহার করব, নাকি তাকে ধ্বংসের হাতিয়ার বানাব? কারণ, মানব বসতি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও উপাসনালয়ে আঘাত হানা প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্রের ভেতরে শুধু বিস্ফোরক আর প্রস্তুতকারক দেশের নাম লুকিয়ে থাকে না। এই প্রাণহানির মধ্য দিয়ে কলঙ্কিত হয় বিজ্ঞানীদের বহু বছরের নিরলস পরিশ্রম, স্বপ্ন এবং মানবতার প্রতি তাঁদের নির্মল ভালোবাসা।

‘দেশ মানে এক লোকের পাশে অন্য লোক’

মাছের শরীরে বিষাক্ত ধাতু

নিউমুরিং নিয়ে সরকার এখন কী করবে

পাহাড়ের সবুজে স্বপ্নের খামার

তাহলে গোলামিই আমাদের পছন্দ!

শিক্ষায় দুর্নীতি দমনে অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত

বিজেপি বাংলা ভাষা ও বাঙালি পরিচয়কেই ভাগ করতে চায়: স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্য

পয়লা বৈশাখ: সংকোচনের বিপরীতে অসংকোচের শক্তি

বিদ্যমান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মানোন্নয়নই অধিক জরুরি

হরমুজ সংকটে আমাদের করণীয়