এক নাটকীয় পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। হলুদ জার্সি দীর্ঘদিন ধরে ব্রাজিলের জাতীয় গৌরব, ঐক্য এবং ক্রীড়া নৈপুণ্যের উৎকর্ষের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে, বিশেষ করে ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর থেকে ব্রাজিল ফুটবলের চিরচেনা ছন্দ ও দক্ষতার গ্রাফ যেন ক্রমেই নিম্নমুখী।
ব্রাজিল ফুটবলের এই ছন্দপতনের অনেক কারণই ক্রীড়াগত বিশ্লেষণে খুঁজে পাওয়া যায়। খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো, কোচিং দর্শনের পরিবর্তন, ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবলের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কিংবা প্রশাসনিক দুর্বলতা তার মধ্যে রয়েছে। তবে এসবের পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ফুটবলের সঙ্গে রাজনীতির গভীর সংযোগ। গত এক দশকে ব্রাজিলের ফুটবল ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মেরুকরণের অংশে পরিণত হয়েছে।
একসময় ফুটবল ছিল ব্রাজিলের জাতীয় পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। এটি ছিল ঐক্যের প্রতীক, আবার কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সামাজিক স্বীকৃতি এবং অধিকার আদায়েরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। কিন্তু ২০১৪ সালের বিশ্বকাপের মাত্র এক বছর আগে জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে দেশজুড়ে আকস্মিক গণবিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষের অভিযোগ ছিল, বিশ্বকাপ আয়োজনের বিপুল ব্যয় জনগণের মৌলিক চাহিদাকে উপেক্ষা করে বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে। শুরুতে বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক দাবিতে আন্দোলন শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই তা প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফের সরকারের বিরুদ্ধে বৃহৎ রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নেয়। এর পরিণতিতে ২০১৬ সালে তাঁর অভিশংসন ঘটে এবং দুই বছর পর কট্টর ডানপন্থী জাইর বলসোনারো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
এই রাজনৈতিক আবহে ব্রাজিলের হলুদ জার্সিও ধীরে ধীরে তার ঐতিহ্যগত অর্থ হারাতে শুরু করে। জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক থেকে এটি ক্রমে রক্ষণশীল জাতীয়তাবাদ এবং বামপন্থাবিরোধী রাজনীতির দৃশ্যমান প্রতীকে রূপ নেয়। দিলমা রুসেফের অভিশংসনের দাবিতে এবং পরে বলসোনারোর সমর্থনে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভগুলোতে এই জার্সি কার্যত একধরনের রাজনৈতিক ইউনিফর্মে পরিণত হয়। এর সঙ্গে প্রায়ই দেখা যেত জাতীয় পতাকা এবং ‘আমাদের পতাকা কখনোই লাল হবে না’ ধরনের স্লোগান। প্রতীকীভাবে এই অবস্থান রক্ষণশীল গোষ্ঠীকে দেশের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে উপস্থাপন করে। রূপান্তরটি ছিল ধীরগতির, কিন্তু এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর।
এ প্রক্রিয়াকে ‘জাতীয় প্রতীক হরণ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন গবেষকেরা। তাঁদের মতে, বলসোনারো এবং তাঁর সমর্থকেরা জাতীয় জার্সিকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন যে, সেটি ধীরে ধীরে সর্বজনীন জাতীয় প্রতীক না থেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
এই পরিবর্তন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ব্রাজিল জাতীয় দলের তারকাদের রাজনৈতিক অবস্থানের মধ্য দিয়ে। ২০২২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ১৩ সেকেন্ডের একটি টিকটক ভিডিওতে ফুটবল তারকা নেইমার প্রকাশ্যে বলসোনারোর প্রতি সমর্থন জানান। ভিডিওটিতে তাঁকে বলসোনারোর ব্যালট নম্বরসংবলিত প্রচারণার গানের তালে নাচতে দেখা যায়। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই বলসোনারো সেটি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন।
নেইমারের পথ অনুসরণ করে থিয়াগো সিলভা, দানি আলভেস, রোনালদিনহো, রিভালদো, রোমারিও, ফেলিপে মেলো ও লুকাস মউরার মতো বর্তমান ও সাবেক একাধিক ফুটবলারও প্রকাশ্যে বলসোনারোর প্রতি সমর্থন জানান। এমনকি, পেলের মতো বিশ্বখ্যাত কিংবদন্তিকেও বলসোনারোর পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। ফলে ব্রাজিলীয় সমাজের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতিফলন ফুটবল অঙ্গনেও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তারকাদের এই অবস্থান সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে। ক্লাব এবং জাতীয় দলের যোগাযোগ কৌশল ক্রমেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। কারণ, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত মতামত আর কেবল ব্যক্তিগত থাকেনি; তা ক্লাবের ব্র্যান্ড, স্পনসরের ভাবমূর্তি এবং জাতীয় দলের পরিচয়ের অংশে পরিণত হয়েছে। ফলে খেলোয়াড়েরা শুধু ক্রীড়াবিদ নন, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবেও আবির্ভূত হন। তাঁদের অবস্থান জনমত গঠনে ভূমিকা রাখতে শুরু করে।
একই সঙ্গে সমর্থকদের মধ্যেও বিভাজন গভীর হয়। একাংশ হলুদ জার্সিকে দেশপ্রেমের প্রতীক হিসেবে দেখলেও অন্য অংশ এটিকে একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। ফলে যে জার্সি একসময় জাতীয় ঐক্যের প্রতীক ছিল, সেটিই রাজনৈতিক পরিচয়ের সূচকে পরিণত হয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেও জাতীয় দলের সাবেক কোচ তিতে দলকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা করেছিলেন। যদিও নেইমার প্রকাশ্যে বলসোনারোকে সমর্থন করেছিলেন, তিতে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে দল বিশ্বকাপ জিতলেও তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে যাবেন না। কিন্তু খেলোয়াড়দের প্রকাশ্য রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ড্রেসিংরুমের ভেতরে ও বাইরে একধরনের মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে। বর্তমান ও সাবেক ফুটবলারদের একটি অংশ উগ্র-ডানপন্থার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় ব্রাজিলের ফুটবল কাঠামোর ভেতরে অলিখিত আদর্শিক বিভাজন তৈরি হয়েছে, যা খেলোয়াড়দের ওপর মনস্তাত্ত্বিক চাপও সৃষ্টি করেছে।
অন্যদিকে স্পনসর প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমও রাজনৈতিক বিতর্কের ঝুঁকি বিবেচনায় নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। ফুটবল অর্থনীতিও এর বাইরে থাকেনি। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে ব্রাজিলের নতুন জার্সি নিয়ে বিতর্ক। ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান নাইকি বিকল্প জার্সি হিসেবে লাল রঙের একটি নকশা তৈরি করেছিল। কিন্তু ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দাবি করে, এই রং বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির প্রতীকী রঙের সঙ্গে মিলে যায়। ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের মুখে ব্রাজিল ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি সমির খাউদ শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক স্পর্শকাতরতার কারণেই ওই লাল জার্সির বাজারজাতকরণ বাতিল করতে বাধ্য হন।
এমন মেরুকরণের কারণে ফুটবল প্রশাসনের ওপরও জনচাপ বেড়ে যায়। যখন জাতীয় দলের প্রধান মুখগুলোকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়, তখন ফেডারেশনের পক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে ফুটবল প্রশাসনকে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি প্রতিটি সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও মোকাবিলা করতে হয়।
ব্রাজিলের ফুটবল কাঠামোর বর্তমান সংকটকে শুধু মাঠের ফলাফল দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি একই সঙ্গে একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংকট। একসময় যে ফুটবল জাতিগত বিভাজন অতিক্রম করে পুরো ব্রাজিলকে এক পতাকার নিচে দাঁড় করিয়েছিল, আজ সেই ফুটবলই রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। জাতীয় দলের খেলা যেখানে একসময় পুরো দেশকে একত্র করত, সেখানে এই মেরুকরণের কারণে সাধারণ সমর্থকদের একটি বড় অংশ সেলেসাওদের ম্যাচ থেকে নিজেদের আবেগময়ভাবে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। এমনকি বর্তমান বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভাকেও মন্তব্য করতে হয়েছে যে ‘আমাদের আবার হলুদ-সবুজ জার্সি পরা শুরু করতে হবে, যাতে কোনো ফ্যাসিস্ট দেশের রং ছিনিয়ে নিতে না পারে।’ জার্সির এই রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিংয়ের কারণে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এর বাণিজ্যিক আবেদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হলুদ জার্সি, যা একসময় ছিল ব্রাজিলীয় পরিচয়ের সর্বজনীন প্রতীক, এখন অনেকের কাছে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিনিধিত্ব করে। এর ফলে মাঠের বাইরের বিভাজন মাঠের ভেতরেও প্রভাব ফেলছে। দীর্ঘ মেয়াদে ব্রাজিল যদি আবারও বিশ্ব ফুটবলে তাদের ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে চায়, তবে শুধু কৌশলগত বা কারিগরি সংস্কার নয়, ফুটবলকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঊর্ধ্বে তুলে এনে জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।