উম্মে ওয়ারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। বর্তমানে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ওয়ারউইকের রাজনীতি বিভাগে ‘রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ক্রান্তিকালীন ইনসাফ’ বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন। শিশু ধর্ষণ, মব সহিংসতা এবং সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আজকের পত্রিকার মাসুদ রানা।
আমার কাছে মনে হয়, শিশু ধর্ষণের ঘটনা আগেও ছিল। এখনো আছে। বিষয়টি এমন নয় যে হঠাৎ করে শিশু ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে গেছে। আমরা এখনকার মতো আগে সচেতন ছিলাম না। পরিবারের লোকজন, আত্মীয়স্বজন ও শিক্ষক একজন ছেলে বা মেয়েশিশুকে ধর্ষণ বা যৌন হয়রানি করতে পারত। সেখানে পুলিশের কাছে যাওয়া তো পরের ব্যাপার। আমরা যখন বলি, ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে, তখন আমরা মোটাদাগে বিচার করি প্রতি মাসে কয়টি ধর্ষণের অভিযোগ থানায় দায়ের হয়েছে। এর বাইরেও তো অনেক ঘটনা থাকে। অনেক পরিবার আছে ধর্ষণের ঘটনা বাইরে জানাজানি হোক, তা তারা চায় না। সে জন্য বলছি এসব কোনো সাম্প্রতিক বিষয় না।
তবে কেন শুধু শিশুদের ধর্ষণের জন্য টার্গেট করা হয়, সেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন। যাদের শিশুদের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা থাকে, তারাই শিশুদের টার্গেট করে ধর্ষণ করে এবং হত্যাও করে। কিন্তু এ শ্রেণির বাইরেও একটা বড় অংশ আছে, যারা নিজেদের বিকৃত যৌন চাহিদা ভোগ, নিজের জীবনের কোনো হতাশা এবং নিজেই কখনো যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে—এ রকম নানা কারণে তারা শিশুদের বেছে নেয়। শিশুদের বেছে নেওয়ার জন্য আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ আছে। এ প্রসঙ্গে অপরাধবিজ্ঞানে ‘রুটিন অ্যাকটিভিটি থিওরি’র কথা বলা যেতে পারে। এটা অনুযায়ী, তিনটি শর্ত পূরণ হতে হয় একটি অপরাধ সংগঠনের জন্য—অপরাধটি করতে আগ্রহী কোনো ব্যক্তি; তার জন্য উপযুক্ত কোনো শিকার, যেটাকে আবার সুইটেবল টার্গেটও বলা হয়; কার্যকর কোনো সুরক্ষার জন্য অভিভাবকত্বের অভাব। শিশুদের কেন ধর্ষণ করা হয়, সেটা আমরা এই থিওরির আলোকে পর্যালোচনা করতে পারি। কারণ, শিশুরা এ রকম ধর্ষকদের জন্য সহজ বা উপযুক্ত শিকার। শিশুরা যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির চেয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে অনেক দুর্বল হয়। তাই তাদের সহজেই প্রভাবিত করা যায়। শিশুরা এমন সহজ-সরল যে তাদের চকলেট বা উপহারের কথা বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে নির্জন কোনো জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। শিশুদের কোনো পার্থক্য করার পরিপক্বতা থাকে না যে, কে ভালো আর কে খারাপ ব্যক্তি। তা ছাড়া, অধিকাংশ সময় শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয় পরিচিতদের কাছ থেকে। তারা প্রতিবেশী ও পরিবারের কেউ হতে পারে। সে কারণে কাউকে তাদের অবিশ্বাস করার সুযোগ কম থাকে। আসন্ন বিপদ জেনেও শিশুরা আসলে নিজেদের রক্ষা করতে পারে না। কারণ, তাদের সেই শারীরিক ও মানসিক শক্তি থাকে না। আবার অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের বলা হয়, এ ঘটনাটি কাউকে বলবে না, তাহলে তোমাকে সবাই খারাপ বলবে। তাই বিভিন্ন কারণেই শিশুরা সহজ টার্গেট হয়। আর এ কারণেই শিশুদের টার্গেট করে ঘটনাগুলো বেশি ঘটে থাকে।
এমনটা আমি মনে করি না। কারণ, এ পর্যন্ত বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের এমন কোনো গবেষণা আমার চোখে পড়েনি, যেখানে প্রমাণিত হয়েছে মৃত্যুদণ্ড বা কঠিনতম শাস্তি দিলে ধর্ষণের মতো অপরাধ কমে আসবে। ধর্ষণ করার পেছনে যে সামাজিক কারণগুলো আছে, সেগুলোকে সব সময় শাস্তি দিয়ে দমন করা সম্ভব না। আমাদের একটি প্রচলিত ধারণা আছে, মৃত্যুদণ্ড দিলে মানুষের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হবে, এতে উদাহরণ তৈরি হবে, ধর্ষকেরা আর ধর্ষণ করবে না—এটা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। যেমন কয়েক দিন আগে মিরপুরে একটি শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হলো। সেই ধর্ষক নাকি ইয়াবা খেয়ে অপকর্মটি করেছে। ধরা যাক, কোনো ব্যক্তির এমন যদি কোনো মানসিক সমস্যা থাকে, তার আসলে হিতাহিত জ্ঞানই থাকে না যে, অপরাধটি করার পরে তার সঙ্গে কী হতে পারে; সেটা নিয়ে সে চিন্তিতও থাকে না। কোনো শিশুকে দেখে তাদের যে ইচ্ছাটি হয়, সেটিই মূলত তাদের কাছে প্রাধান্য পায়। কাজেই এ ক্ষেত্রে অপরাধটি হওয়ার পরে কী হবে, সেটার চেয়ে আমাদের দেখতে হবে এ ধরনের অপরাধ আমরা কীভাবে কমাতে পারি। অপরাধগুলো যেন আর না ঘটে, সেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। এগুলো নিয়ে গবেষণা না করে শুধু শাস্তি দিয়ে শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধ করা বা কমানো সম্ভব না।
মবের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সরকার ছিল না। এ সরকারের মধ্যে এমন কোনো উপাদান ছিল না যে তার কারণে তাদের আমরা একটি পরিপূর্ণ সরকার বলতে পারি না। তারপরেও দুঃখজনকভাবে হলেও সত্যি যে কী ভয়ংকরভাবে সে সময় মব সহিংসতা বেড়েছিল! সে সময় মবের শিকার হয়েছে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে মাজার, হিন্দুধর্মাবলম্বী, দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অফিস। মবের যে সহিংসতা সেটা কোনোভাবেই সেই সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি।
তারই একটা ধারাবাহিকতা হিসেবে বর্তমান সরকারের আমলেও সেটা দেখা যাচ্ছে। মে মাসে যে ৩২ জন মবের শিকার হয়েছেন, সেটা তো একটা আশঙ্কাজনক ব্যাপার। নির্বাচিত সরকারের সময়েও কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একটা শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ দিতে পারছে না বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেন রোধ করতে পারছে না, সেটা ভেবে দেখা দরকার। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অনেক বড় ঘটনা। আর এ রকম ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা ফিরে আসতে সময় লাগে। এ ধরনের ঘটনা দু-তিন যুগ পরে ঘটে থাকে। এই ঘটনার পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মনোবল ভেঙে যায় এবং অনেকে থানা ছেড়ে পালিয়ে যায়। অনেক থানা পুড়িয়ে দিয়ে অস্ত্র লুট করা হয় এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে হত্যা করা হয়। আমার কাছে মনে হয়, পূর্ববর্তী ঘটনার ধারাবাহিকতায় পুলিশ বাহিনী এখনো সম্পূর্ণভাবে সক্রিয় না থাকার কারণেই মবের ঘটনা ঘটছে।
নতুন সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র তিন মাস হয়েছে। তারা ১৯ বছর পর ক্ষমতায় এসেছে। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি, অর্থনীতি খাতে ধসের ঘটনাগুলো নিয়েই এ সরকারকে চলতে হচ্ছে। আমরা দেখেছি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে কী পরিমাণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছিল। কারণ, সে সময় যে কেউ যেকোনো অপকর্ম করতে পেরেছে। সে সবের জন্য কোনো জবাবদিহির ব্যাপার ছিল না।
নির্বাচিত সরকারের কাছে নিশ্চিতভাবে আমাদের অনেক প্রত্যাশা ছিল, তারা কঠোরভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করবে। প্রধানমন্ত্রী থেকে আইন ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিভিন্ন সময় বক্তৃতায় আশার কথা শোনাচ্ছেন। কিন্তু সে সবের কোনো প্রতিফলন সেভাবে দেখতে পাচ্ছি না। যদিও অনেক দায়িত্বের ভার নিয়ে এ সরকার যাত্রা শুরু করেছে। একই সঙ্গে কিছু মৌলিক বিষয় থাকে যেগুলোর জন্য মানুষ অপেক্ষা করতে চায় না। যেমন দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, শিশু ধর্ষণ, মব, ছিনতাই এবং হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশ বেড়ে গেছে। সরকারকে এই ঘটনাগুলো নিয়ন্ত্রণে আরও বেশি মনোযোগ দিতে হবে বলে মনে করি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করা হয়েছিল, সেটা নাকি আবার পরিবর্তন করা হবে। তার চেয়েও জরুরি হলো তাদের মনোবল ফিরিয়ে আনা এবং দেশের বিভিন্ন জায়গায় যে নানা অপরাধের ঘটনা ঘটছে, সেগুলো কেন নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তা নিয়েও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে সরকারের পক্ষ থেকে কথা বলা দরকার। কোন জায়গায় তারা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে, সেসব জায়গায় কাজ করা দরকার।
সাধারণ মানুষের কাছে দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা কখনোই সুদৃঢ় ছিল না। বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থায় রাজনৈতিক ও অর্থের প্রভাব থাকে। এগুলো তো আসলে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাই জনগণের অনাস্থা না বলে আস্থা কম ছিল বলা যায় না, যা বরাবরই একেক সরকারের আমলে বিদ্যমান থাকে। এটা একটি বিরাজমান পরিস্থিতি বলতে হবে। মানুষ কেন আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মবের ঘটনা ঘটাচ্ছে—এগুলোর জন্য রাজনৈতিক কারণও দায়ী।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে প্রায় ১৫০-২০০টি মাজার ভাঙা হয়েছে। এগুলো রাজনৈতিক ঘটনাপ্রসূত ঘটনা নয় কি? কেন শুধু সারা দেশে মাজারকে টার্গেট করা হলো? প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, ছায়ানট ও উদীচী অফিসে যে আগুন লাগানো হলো, সেগুলো কি বিচারব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা থেকে করা হয়েছে? ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলেই বোঝা যাবে, দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করার জন্য ঘটনাগুলো ঘটানো হয়েছে। এ ছাড়া, একজন হিন্দু ছেলেকে মেরে তাঁর লাশ পুরিয়ে ফেলা হয়েছিল। একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কারণেই তো ঘটনাগুলো ঘটেছিল। এগুলো কোনোভাবেই সরলভাবে দেখার সুযোগ নেই। অপরাধবিজ্ঞানে ‘র্যাশনাল চয়েস থিওরি’ আছে। এই থিওরি অনুযায়ী—মানুষ র্যাশনাল চিন্তা করে, অপরাধ করলে তার পেইন ও প্লেজার (আনন্দ) কতটুকু। আপরাধ করার পর যখন কোনো ব্যক্তির মনে হবে তাঁর শাস্তি হওয়ার আশঙ্কা কম, তখন তিনি বারবার অপরাধ করবেন। আমার মনে হয়, এটিও একটি কারণ।
এ সময়টা আসলেই বেশি সময় নয়। তিন মাসের মধ্যে দেশের বিভিন্ন খাতকে বুঝে, আত্মস্থ করে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা—এটা একটা কঠিন কাজ। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না। সে কারণে আইনশৃঙ্খলা ভীষণভাবে খারাপ ছিল। বিনিয়োগও ছিল না। সে সময় দেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের নানা দুর্নীতির কথা এখন শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল হামের প্রাদুর্ভাবকে নিয়ন্ত্রণ করা। যেটা আগের সরকারের গাফিলতির কারণে হয়েছে। আমি মনে করি, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের যে গাফিলতি ছিল সেগুলোর কুফল ক্ষমতায় বসে তাদের ভোগ করতে হচ্ছে। সেগুলোকে আসলে তাদেরকে টেনে নিয়ে যেতে হচ্ছে। সেই সমস্যাগুলোকে তাদের সমাধান করতে হচ্ছে। মানুষ আসলে দিন শেষে দ্রব্যমূল্য নিয়ে চিন্তা করে। এর মধ্যে সামনে বাজেট পাস হবে।
আইনশৃঙ্খলা, অর্থনীতি, শিক্ষা যেকোনো সরকারের কাছে অগ্রগামী চিন্তার বিষয় হওয়া উচিত। এসব নিয়ে সরকারের অনেক কিছু করার আছে। বিএনপি ১৯ বছর পরে ক্ষমতায় আসায় ধীরে ধীরে মানুষের জীবনমানের উন্নতি কীভাবে হতে পারে, সেটা সবার চাওয়া। তারা অনেক ধরনের চেষ্টা করছে। ফ্যামিলি, কৃষক কার্ড তারা দেওয়া শুরু করেছে। সেটাকে আমি সাধুবাদ জানাই। যদিও তাদের অনেক চ্যালেঞ্জ আছে।