দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েন, অবিশ্বাস এবং অস্থিরতার পর বাংলাদেশ আবারও এক নতুন অধ্যায়ের সামনে দাঁড়িয়ে। প্রায় দেড় দশকের শাসনামল ঘিরে বিরোধী দলের ওপর দমনপীড়ন, একতরফা নির্বাচনের অভিযোগ এবং তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষমতার অপব্যবহার নিয়ে জনমনে যে ক্ষোভ জমে উঠেছিল, তার বিস্ফোরণ ঘটে জুলাই গণ-আন্দোলনে। সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকারের পতন এবং পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন—সব মিলিয়ে দেশ এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল নিয়ে যেমন তীব্র সমালোচনা ছিল, তেমনি আন্দোলন-পরবর্তী সময়েও প্রত্যাশা অনুযায়ী স্থিতিশীলতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি, এমন অভিযোগও উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্ত ছাত্র প্রতিনিধিদের ওপর ছিল ব্যাপক প্রত্যাশা। কিন্তু প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার অভাব, নীতিনির্ধারণে সমন্বয়হীনতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে সমালোচনা বাড়তে থাকে। কোথাও কোথাও মবতন্ত্র, ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নে হামলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা—এসব ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই চেতনা কেবল রাজনৈতিক স্বাধীনতার নয়; এটি সাম্য, মানবিক মর্যাদা, বহুত্ববাদ ও সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশেরও প্রতিশ্রুতি। তাই যখন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয়, সাংবাদিক বা রাজনৈতিক মতভিন্নতার মানুষ হয়রানির শিকার হন, তখন তা কেবল একটি সরকারের ব্যর্থতা নয়—রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। যে বাংলাদেশ আমরা চাই, সেখানে ভিন্নমত শত্রু নয়; বরং গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সাম্প্রতিক গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। নির্বাচনের ফল নিয়ে বিতর্ক থাকলেও জনগণ ভোটের মাধ্যমে নিজেদের মতপ্রকাশের সুযোগ পেয়েছে—এটাই গণতন্ত্রের প্রাণ। এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির নেতৃত্বে আছেন তারেক রহমান, আর দীর্ঘদিন ধরে দলের প্রতীকী নেতৃত্বে ছিলেন প্রয়াত খালেদা জিয়া। দেশের বাইরে অবস্থান করেও দলকে সংগঠিত রাখা এবং নির্বাচনী সাফল্য অর্জন—এটি নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক কৌশল ও সংগঠন দক্ষতার প্রমাণ।
তবে নির্বাচনে জেতাই শেষ কথা নয়; বরং এটি একটি বড় দায়িত্বের শুরু। জনগণ এখন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, প্রতিযোগিতামূলক কিন্তু সহনশীল রাজনীতি দেখতে চায়। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে যদি নতুন সরকার প্রশাসনকে দলীয়করণমুক্ত রাখতে পারে, আইনের শাসন নিশ্চিত করতে পারে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেয়, তবেই পরিবর্তনের অর্থবহ সূচনা হবে।
বাংলাদেশ একটি বহু ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতের দেশ। এখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ নানা সম্প্রদায়ের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। ধর্মীয় পরিচয় কখনোই নাগরিক অধিকারের মাপকাঠি হতে পারে না। যে বাংলাদেশ আমরা চাই, সেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচবে। ধর্মান্ধতা বা উগ্র মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, এটি ইতিবাচক বার্তা। এখন প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে সংখ্যালঘু অধিকার সুরক্ষা, ঘৃণা প্রচার রোধ এবং সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার করা।
সংস্কৃতি বাংলাদেশের আত্মা। বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক চর্চা পয়লা বৈশাখ, একুশে বইমেলা, লোকসংগীত, নাট্যচর্চা—এসব কেবল উৎসব নয়; এগুলো আমাদের অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রকাশ। সাম্প্রতিক অস্থিরতায় যখন সাংস্কৃতিক পরিসর হুমকির মুখে পড়ে, তখন তা আমাদের জাতিসত্তার জন্যই অশনিসংকেত। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে সংস্কৃতি ও সৃজনশীলতার অবাধ বিকাশ নিশ্চিত করা।
অর্থনীতির ক্ষেত্রেও নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ কম নয়। মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বৈদেশিক ঋণের চাপ—এসব বাস্তব সমস্যা মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে
প্রভাবিত করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন নীতির ধারাবাহিকতা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি।
সবচেয়ে বড় কথা, আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে ক্ষমতার পরিবর্তন হবে শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক। যেন আর কোনো দল বা গোষ্ঠী রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি মনে না করে। সংসদ হবে বিতর্ক ও নীতিনির্ধারণের কেন্দ্র, প্রতিহিংসার মঞ্চ নয়। গণমাধ্যম স্বাধীন, বিচার বিভাগ নিরপেক্ষ এবং নির্বাচন কমিশন শক্তিশালী হবে।
মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র—সেই স্বপ্ন পূরণ এখনো অসম্পূর্ণ। নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা যদি সহনশীলতা, আইনের শাসন এবং সম-অধিকারের ভিত্তিতে এগোতে পারি, তবে অতীতের বিভাজন পেরিয়ে একটি উন্নত, আত্মমর্যাদাশীল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
আজ সময় প্রতিশোধের নয়, পুনর্গঠনের; ক্ষমতার নয়, দায়িত্বের। জনগণ কথা নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণের অপেক্ষা করছে; যা নির্ধারণ করবে—আমরা সত্যিই কি সেই বাংলাদেশ গড়তে পারলাম, যেমন বাংলাদেশ আমরা চাই।
লেখক: কলেজশিক্ষক ও সংস্কৃতিকর্মী