জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলেদের জন্য কোনো হল নেই, যদিও ছাত্রীদের জন্য একটি হল রয়েছে। ফলে হাজারো শিক্ষার্থীকে বাধ্য হয়েই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মেসে থেকে পড়াশোনা করতে হয়।
আমরা কয়েকজন রাজধানীর দোলাইরপাড়ের একটি মেসে থাকি। বাসায় লাইনের গ্যাস না থাকায় রান্নার একমাত্র ভরসা এলপিজি সিলিন্ডার। কয়েক দিন আগে সকালে বাসার গ্যাস শেষ হয়ে যায়। গ্যাস কিনতে বাজারে গিয়ে পড়তে হয় মহাবিপাকে। সরকার-নির্ধারিত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ২৫৩ টাকা হলেও দোকানদার আমার কাছে ২ হাজার টাকা দাবি করেন। শুনে মাথায় বাজ পড়ার অবস্থা! আরও কয়েকটি দোকানে ঘুরলাম। কেউ বলেন সিলিন্ডার গ্যাস নেই, কেউ আবার দাম আরও বেশি চান। এক দোকানদারকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘দাম এত বেশি কেন?’ জবাব দিলেন, ‘আমাদেরই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তবে অপেক্ষা করেন, কাল-পরশু কমবে হয়তো।’ কিন্তু তার পরদিন বাজারে গিয়ে দেখি দাম আরও বেশি। শেষ পর্যন্ত সেই দোকান থেকে ২ হাজার টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে বাধ্য হলাম।
সিলিন্ডার গ্যাসের দাম হঠাৎ এভাবে বেড়ে যাওয়ার যৌক্তিক কোনো কারণ দোকানদারদের কাছে থেকে জানতে পারিনি। তবে পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম, সিলিন্ডার গ্যাস সরবরাহকারী দেশের দুটি বড় প্রতিষ্ঠান হঠাৎ করেই গ্যাস আমদানি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে দোকানদারদের ডিলারের কাছ থেকে চড়া দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। এ কারণে ভোক্তাপর্যায়েও মূল্য বেশি।
প্রশ্ন হলো, এই ভোক্তা কারা? তারা কি ধনী? তারা কি বিকল্প জ্বালানির সুযোগ রাখে? বাস্তবতা হলো, তাদের বড় একটি অংশ আমাদের মতো শিক্ষার্থী, নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষ, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; যাদের মাস চলে টানাটানি করে। অবস্থা যদি এ-ই হয় তাহলে আমাদের মতো সাধারণ শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষেরা যাব কোথায়?
সিলিন্ডার গ্যাসের এই অস্থিরতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি বাজার ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতা এবং শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কারসাজি। যখন সারা বিশ্বের জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে, তখন আমাদের দেশে কেন বারবার সাধারণ মানুষকে এভাবে জিম্মি করা হয়? যারা বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের সামর্থ্য রাখে না, তাদের জীবনের ওপরই কেন বারবার এ বিপর্যয় নেমে আসবে?
সরকারের প্রতি বিশেষ অনুরোধ, আপনারা আরও সচেষ্ট হোন। শুধু দাম নির্ধারণ করে দিলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে নিশ্চিত করতে হবে, নির্ধারিত দামেই গ্যাস বিক্রি হচ্ছে। কোনো ডিলার বা বিক্রেতা নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশিতে বিক্রি করলে তার লাইসেন্স বাতিলসহ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
কেউ সিন্ডিকেট করে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করলে তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করা যেতে পারে। এর ফলে আমদানিকারক থেকে খুচরা বিক্রেতা পর্যন্ত সিলিন্ডার পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া ডিজিটাল ট্র্যাকিংয়ের আওতায় থাকবে। এতে বোঝা যাবে, ঠিক কোথায় মজুতদারি করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে।
জ্বালানি কোনো বিলাসী পণ্য নয়; এটি মানুষের মৌলিক চাহিদার অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিছুসংখ্যক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীর অতি মুনাফার হিংস্র লালসার কাছে সাধারণ মানুষের জীবন জিম্মি থাকতে পারে না। প্রশাসন কঠোর হলে এবং বাজার তদারকি জোরদার করলে এ সংকট সমাধান করা মাত্র কয়েক দিনের ব্যাপার। আমরা চাই, সরকার দ্রুত সচেষ্ট হোক এবং সিন্ডিকেটের এই আগুনের হাত থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করুক।
লেখক: শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়