হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

আর কবে জামায়াত এমন সুযোগ পাবে

এত কিছু হিসাবনিকাশের পরও বটমলাইন হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী হেরে গেছে। তাদের জন্মের পর থেকে এবারই প্রথম তারা এককভাবে সরকার গঠনের একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে আবার কবে পাবে এমন সুযোগ, বলা কঠিন।

মাসুদ কামাল

বিএনপি নিজেও বুঝতে পারছে, তারাই পেয়েছে হিন্দুদের ভোট। ছবি: আজকের পত্রিকা

মধ্যবিত্তের খাদ্যাভ্যাসে একটা লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। প্রায়ই দেখবেন, এরা তেমন কোনো জরুরি কারণ ছাড়াই বাইরে খেতে যায়। ছেলে, মেয়ে, স্বামী, স্ত্রী—সবাই মিলে একবেলা রেস্টুরেন্টে গিয়ে খেয়ে আসে। এই পরিবর্তনটা ঠিক কবে থেকে শুরু করেছে, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। এমনও হতে পারে, এরই মধ্যে সে গবেষণা হয়ে গেছে, অথবা চলছে। এই যে পরিবর্তিত ধারা, এরও আবার একটা বৈশিষ্ট্য আছে। বাইরে খেতে যায় তারা সন্ধ্যার দিকে। রাতের খাবারটা রেস্টুরেন্টে খায়। বড়জোর মধ্যাহ্নভোজনে। কিন্তু সকালের নাশতা করতে যায়, তেমন খুব একটা দেখিনি। বাসায় নাশতার সব আয়োজন রয়েছে, তারপরও ‘খুশিতে-ঠ্যালায়-ঘুরতে’ স্বামী-স্ত্রী মিলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে নাশতা করতে আমি তেমন একটা দেখিনি।

সেই অস্বাভাবিক কাজটিই গত শনিবার আমি ও আমার স্ত্রী করেছি। দিনটি ছিল ১৪ ফেব্রুয়ারি, ভ্যালেন্টাইনস ডে। ঠিক এ কারণেই কি? তা মনে হয় না। আগের বছরেও একটা ভ্যালেন্টাইনস ডে ছিল। তখন তো হয়নি। এবার তাহলে পার্থক্যটা কোথায় ছিল। পার্থক্যটা হচ্ছে—ঠিক দুই দিন আগেই, ১২ ফেব্রুয়ারি একটা জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেছে। যে নির্বাচনে ইসলাম নামধারী রাজনৈতিক শক্তির পরাজয় ঘটেছে। ১৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পুরো ফলাফল প্রকাশিত হয়ে যায়। ফল প্রকাশের পর ঢাকায় যত নারীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে বা দেখা হয়েছে, সবার চোখেমুখেই যেন একটা স্বস্তির ছায়া আমি দেখেছি। দেখে মনে হয়েছে, তাদের মুখের সেই শুকিয়ে আমসত্ত্বের ভাবটা যেন আর নেই।

আমরা গিয়েছিলাম বাসা থেকে সামান্য দূরে, একটা রেস্টুরেন্টে। আমাদের সামর্থ্যের তুলনায় একটু ব্যয়বহুল। ঢুকেই দেখি পুরো রেস্টুরেন্ট ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। ঢোকার মুখেই গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বিশাল আকৃতির একটা হার্ট-শেপ করা হয়েছে। টেবিলে-টেবিলে ফুলদানি, ফুল। অত সকালে গ্রাহক খুব একটা নেই, আমরাই সম্ভবত দ্বিতীয় কাস্টমার। সেখানে কর্মরত একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম, গত বছর তাঁরা এমন আয়োজন করতে পারেননি। এবারও পারবেন কি না, দুই দিন আগেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি!

আসলেই নির্বাচনের এক রেজাল্টই অনেক কিছু পাল্টে দিয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ‘ধর্মভিত্তিক’ রাজনীতির প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাই অনেক ক্ষেত্রে ব্যাহত হচ্ছিল। কার জীবনযাপন কেমন হবে, কোন দিবস পালন করা যাবে বা কোনটা যাবে না, কোন শব্দ উচ্চারণ করা যাবে বা যাবে না, এমনকি নারীর ওড়নার অবস্থান ঠিক থাকল কি থাকল না—সেসব নিয়েও চলত দারুণ খবরদারি। এসবের পাশাপাশি একটা খবর রটে গিয়েছিল যে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নারীদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়েছে। তাদের মহিলা শাখা তালিমের মাধ্যমে গ্রামের নারীদের জামায়াতের প্রতি আকৃষ্ট করতে পেরেছে। এর মাঝে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের ভূমিধস বিজয়, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মেয়েদের হলে পর্যন্ত শিবিরের সাফল্য ভিন্ন রকম একটা বার্তা দিচ্ছিল। কেউ কেউ এমনও ভাবছিলেন, জামায়াত কেবল ভালোই করবে না, তারা নির্বাচনে জিতেও যেতে পারে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াগুলোও এমন প্রচারণা চালাচ্ছিল যে যতই দিন যাচ্ছিল, মনে হচ্ছিল জিতেই বুঝি যাবে তারা!

এর মধ্যে অনেক পদক্ষেপও নিয়েছিল তারা। ইসলামি দল হয়েও হিন্দু ভোট পেতে প্রথমবারের মতো একজন হিন্দুকে মনোনয়নও দিয়েছিল। তবে নারী ভোট বাড়াতে কোনো নারীকে প্রার্থী করতে পারেনি। অথচ কিছুদিন আগেই জুলাই সনদে এই দলটিই বলে এসেছিল, এই নির্বাচন থেকেই ন্যূনতম ৫ শতাংশ নারীকে মনোনয়ন দেবে তারা। কিন্তু মুখে যা-ই বলুক, যে দলিলেই স্বাক্ষর করে আসুক, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা তাদের আদর্শেরই অনুগত থেকেছে। কেবল তা-ই নয়, নারীদের প্রতি তাদের মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে দলের গুরুত্বপূর্ণ অনেক নেতার কথাবার্তায়ও। দলের আমির শফিকুর রহমান যুক্তরাষ্ট্রে এক বক্তব্যে প্রথম বললেন নারীদের চাকরিতে কর্মঘণ্টা কমানোর কথা, এরপর আল জাজিরাকে দেওয়া ইন্টারভিউতে জানালেন নারী নেতৃত্বের প্রতি তাঁদের মনোভাবের কথা। ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন কায়েম করা নিয়ে তাঁদের একেক নেতা বললেন একেক কথা। এ রকম ভিন্ন ভিন্ন মত মানুষকে বিভ্রান্ত করতে থাকল, নারীদের অনেককে করল আতঙ্কিত। সবশেষে, নির্বাচনের একেবারে আগে আগে সাতক্ষীরার এক জামায়াত নেতা বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানালেন—বাইরে যেতে হলে নারীদের সঙ্গে মাহরাম নিয়ে যেতে হবে। এমনকি তিনি যদি অমুসলিম নারী হন, তবু!

সন্দেহ নেই এই বিষয়গুলো অনেকেই ভালোভাবে নেয়নি। নির্বাচনের আগে নারীদের টেনশন বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি ঢাকা শহরে ভোট দিয়েছি। ভোট দিতে গিয়ে ভোটকেন্দ্রে তেমন একটা ভিড় দেখিনি। কিন্তু তার মধ্যেও ভিড় যা কিছু ছিল, নারীদের বুথের সামনেই ছিল। পুরো হিসাবটা এখনো পাইনি, তারপরও আমার কেন যেন মনে হয় এবার প্রচুর নারী ভোটার ভোট দিয়েছেন। আর সেই নারীরাই মূলত ডুবিয়েছেন জামায়াতকে।

বাংলাদেশে ভোটের হিসাবনিকাশের কিছু থিওরি আছে। এ ক্ষেত্রে রিজার্ভ ভোট বা পকেট ভোট বলে একটা বিষয় আছে। নারী ভোটের বাইরে সে রকম আরেকটা বড় পকেট ছিল হিন্দু ভোট। মোট ভোটের কমপক্ষে ৭ শতাংশ ছিল হিন্দু ভোট। হিন্দুদের ভোট জামায়াত তেমন একটা পায়নি। হিন্দুরা যে জামায়াতকে ভোট দেয়নি, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হচ্ছে কৃষ্ণ নন্দীর পরাজয়ের ঘটনা। খুলনার বাটিয়াঘাটা ও দাকোপ এলাকা নিয়ে খুলনা-১ আসন। হিন্দু অধ্যুষিত এ এলাকায় বেশির ভাগ সময় একজন হিন্দুই সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। এভাবে হিসাব কষেই জামায়াতে ইসলামী একটি আসন পেতে নিজেদের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে একজন হিন্দুধর্মাবলম্বীকে মনোনয়ন দেয়। সেই ব্যক্তিটিই কৃষ্ণ নন্দী। এত কিছুর পরও জামায়াত কিন্তু এই আসনটি পায়নি। অনেক ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন কৃষ্ণ নন্দী। বিএনপির প্রার্থী আমির এজাজ খানের কাছে ৫০ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে জামায়াতকে হিন্দুরা ভোট দেননি, এমনকি জামায়াতের প্রার্থী হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও দেননি!

এই যে হিন্দুদের ভোট বিএনপির বাক্সে যাওয়া, এর কিন্তু অন্য একটা দিক রয়েছে। এর আগে হিন্দুদের ভোট সাধারণত যেত আওয়ামী লীগের কাছে। তার বিপরীতে হিন্দুরা যে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে বিশাল কিছু সুবিধা পেত, তা-ও নয়। বরং হিন্দুদের ঘরবাড়ি দখল, নির্যাতন—এসব অপকর্ম আওয়ামী ক্যাডাররাই বেশি করেছে। অনেক হিন্দুধর্মাবলম্বীর সঙ্গে আমার বিভিন্ন সময়ে এসব নিয়ে কথা হয়েছে। তাদের বক্তব্য, ‘আমরা যদি বিএনপিকে ভোট দিই, তারপরও তো তারা সেটি বিশ্বাস করবে না। আমরা রয়েছি উভয়সংকটে।’

কিন্তু এবার পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। আওয়ামী লীগ এবার ভোটের মাঠেই নেই। ফলে বিএনপি নিজেও বুঝতে পারছে, তারাই পেয়েছে হিন্দুদের ভোট। এখন এই ভোট তারা ধরে রাখতে পারবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। ভবিষ্যতে বিএনপি যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, সংখ্যালঘুরা যদি তাদের প্রত্যাশিত গুরুত্ব পায়, নিশ্চিত থাকতে পারে, হিন্দু ভোটের বিশাল পকেটটি বিএনপির কাছেই থাকবে।

এত কিছু হিসাবনিকাশের পরও বটমলাইন হচ্ছে, এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী হেরে গেছে। তাদের জন্মের পর থেকে এবারই প্রথম তারা এককভাবে সরকার গঠনের একেবারে কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। ভবিষ্যতে আবার কবে পাবে এমন সুযোগ, বলা কঠিন। অনেকে হয়তো ভাবতে পারেন, এবার অনেক ভোট পেয়েছে, অনেক আসনও পেয়েছে, তাই ভুলগুলো শুধরে নিলে আগামীবার একটা সুযোগ আসতে পারে। তবে আমি কিন্তু তা মনে করি না। আমার ধারণা, মাঠে আওয়ামী লীগ না থাকাতেই জামায়াত এত ভালো করেছে। আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ থাকবে না, এমন নাও হতে পারে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

বন্ধ মুখ খোলার জন্য নির্বাচনের প্রয়োজন ছিল

যেমন বাংলাদেশ চাই

শিল্পকারখানার বর্জ্যদূষণ বন্ধ করা দরকার

অপরাপর ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি বাঙালিদের উপেক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি আছে

বামদের রাজনীতি কি মুমূর্ষু

নতুন পরীক্ষার সামনে পুরো জাতি

ব্যতিক্রম এক নির্বাচনের কথা

বন্ধুর পথ তবু সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দোলাচলে সংসদ নির্বাচন

নতুনের প্রত্যাশা