বর্তমান সময়ে যখন পৃথিবী জ্ঞান-বিজ্ঞানে, তথ্যপ্রযুক্তিতে অগ্রসরমাণ, তখন সমাজকে বা রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য দরকার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। আজ থেকে ২৫ বছর বা ৩০ বছর পর কী হবে, সেই চিন্তা এখনই করতে হবে। আজকের সমস্যার জন্য আজকে চিন্তা করলে সমস্যা দূর তো হবেই না, সমস্যায় জট পাকিয়ে যাবে। সমাজ পতিত হবে অতল গহ্বরে। আমাদের দেশে কোনো কাজই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে করা হয় না। আমরা জোড়াতালি দিয়ে কোনোরকমে দিনের কাজ দিনে চালিয়ে নিই। যার ফলে আমাদের চারপাশে যা আমরা সাদা চোখে দেখতে পাচ্ছি, সেই সমস্যার কোনো সমাধান করতে পারছি না।
নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করি প্রথমে, তারপর আলোচনা করব কী ধরনের পরিকল্পনা আগেই নেওয়া উচিত। ২০০১ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি প্রোগ্রামে তিন দেশ ভ্রমণে গিয়েছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশ কাস্টমসের নতুন একটি কাস্টমস কমিশনারেট হবে, যার নাম হবে কাস্টমস ভ্যালুয়েশন কমিশনারেট। তদানীন্তন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মহোদয় আমিসহ আরও একজন কমিশনারকে ডেলিগেটস করে পাঠালেন তিন দেশের পদ্ধতি দেখার জন্য। বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না, আজকের লেখায় যেটুকু দরকার সেইটুকু বলছি। আমরা মালদ্বীপ সফর করে শ্রীলঙ্কায় এসেছি। শ্রীলঙ্কার কাস্টমসের প্রধানকে বলা হয় ডিজি। ডিজি মহোদয় সেই দেশের ডাইরেক্টর ভ্যালুয়েশনকে আমাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, আমাদের যেন সাহায্য করেন। ভালোভাবে সাত দিন আমরা সেখানে সবকিছু দেখার পর, ভারতে আসার আগের দিন ডিজি মহোদয়ের সঙ্গে অফিসে দেখা করতে গেলাম। ডিজি মহোদয় আমাদের মধ্যাহ্নভোজের আমন্ত্রণ জানালেন। মধ্যাহ্নভোজের মধ্যেই ডিজি মহোদয় দু-চারটি বাংলা কথা বললেন। আমার সঙ্গে তদানীন্তন কমিশনার শাহাবুদ্দিন সাহেব ছিলেন, প্রটোকলের কারণে তিনি হয়তো চুপ ছিলেন। আমি একপর্যায়ে সবিনয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘স্যার, আপনি বাংলা কোত্থেকে শিখলেন?’ ডিজি মহোদয় জানালেন, ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে তিনি যখন অর্থ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব, তখন তিনি, একজন উপসচিব ও তাঁদের সেন্ট্রাল ব্যাংকের একজন জিএম বাংলাদেশের মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রাম দেখতে এসে প্রায় পাঁচ সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান করেছিলেন। সেই সময় কিছু কিছু বাংলা শব্দ রপ্ত করেছিলেন। আমি আরও অনুসন্ধিৎসু হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘স্যার, কেমন দেখেছিলেন আমাদের মাইক্রোক্রেডিট?’ তিনি একটু হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘পাঁচ সপ্তাহ খুব বেশি সময় নয়। তবে আমরা দেশে এসে এই ব্যাপারে আমাদের অর্থমন্ত্রীর কাছে নেতিবাচক রিপোর্ট প্রদান করেছিলাম।’
সেই সময় আমাদের দেশে মাইক্রোক্রেডিটের রমরমা অবস্থা। আমরা ডিজি মহোদয়ের মুখের দিকে তাকাতেই তিনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘বুঝতে পেরেছি তোমরা কী জানতে চাও।’ তিনি নিজ থেকে বললেন, ‘শোনো, তোমাদের দেশে যেভাবে মাইক্রোক্রেডিট দেওয়া হয় এবং যে প্রক্রিয়ায় কিস্তি আদায় করা হয়, এটি একটি অমানবিক ব্যাপার। মানুষ হয়তো কোনো রকম দুবেলা খেয়ে থাকে। তবে তার মাথায় সব সময় কিস্তির টাকা পরিশোধের চিন্তা ঘুরপাক খায়। সে সাধারণ চিন্তা বা বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা করতে ভুলে যায়। হয়তো খেয়েপরে বেঁচে থাকে, তবে তার ব্যক্তিসত্তা হারিয়ে ফেলে, শুধু কঙ্কালের মতো দেহটা পৃথিবীতে কাজ করে যায়। এটাই প্রধান কারণ। আরও একটা ছোট্ট কারণ আছে। সেটা হলো তোমাদের মুসলিমপ্রধান দেশ, তোমাদের দেশের লোকজন সারা সপ্তাহ কাজ করে সপ্তাহ শেষে তারা কিস্তি দেয়। শ্রীলঙ্কা বুড্ডিস্ট কান্ট্রি। এখানে লোকজন সারা সপ্তাহ কাজ করে সপ্তাহ শেষে দারু পান করে, বাড়তি পয়সা ব্যয় করে। এখানকার মানুষ কিস্তি দিতে পারবে না। এই সুপারিশ করে আমরা রিপোর্ট পেশ করার পরে আমাদের অর্থমন্ত্রী রাষ্ট্রীয়ভাবে মাইক্রোক্রেডিট ব্যবস্থা চালু করার চিন্তা পরিহার করেন।’
এখন আমরা বুঝতে পেরেছি, আসলেই মাইক্রোক্রেডিটের জালে যদি দেশের বেশির ভাগ মানুষকে জড়িয়ে ফেলা যায় তাহলে দারিদ্র্য দূর হয় না। হয়তো সাময়িক কিছু মানুষ খেয়েপরে বেঁচে থাকে। সুদূরপ্রসারী দারিদ্র্য দূর হয় না বরং দারিদ্র্যের আষ্টেপৃষ্ঠে সমাজ জড়িয়ে যায়। এখন আপনারা যদি একটু চারদিকে তাকান তাহলে দেখবেন, যেসব পরিবার বা মানুষজন মাইক্রোক্রেডিটের আওতায় রয়েছে, তাদের সার্বিক অবস্থা কী রকম। আমরা যদি এই দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে মাইক্রোক্রেডিটের মতো উচ্চ সুদের ঋণের জালে আবদ্ধ না করতাম, তাহলে মনে হয় আমাদের দারিদ্র্যবিমোচন আরও ত্বরান্বিত হতো।
বর্তমান সময়ে যে অবস্থায় আছি—এ অবস্থায় যেকোনো সময় আমরা পড়তে পারি—এই কথাটা আগে খেয়াল রাখা উচিত ছিল। বহির্বিশ্বের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমাদের বোঝা উচিত ছিল, শুধু নির্দিষ্ট দু-একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সঙ্গেও যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক স্থাপন করা জরুরি ছিল। আমাদের আগেই চিন্তা করা উচিত ছিল, মধ্যপ্রাচ্য যেকোনো সময় বড় রকম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে পারে। ২০২৫ সালে সে রকম একটি প্রক্সি যুদ্ধ হয়েছিল। তখনই আমাদের অনুধাবন করা উচিত ছিল, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরম্ভ হলে আমরা জ্বালানি সংকটে পড়ব। স্থবির হয়ে যাবে আমাদের অর্থনীতি, আমাদের জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে যাবে। শুধু জ্বালানির চাহিদার কারণে নয়, রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের বাধা আসবে, এই কথাটা মাথায় রাখা উচিত ছিল।
এখন আমরা আসলেই একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছি। আজকে ভাবছি কালকে কী অবস্থা হবে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ কি শেষ হবে, আমরা কি আমাদের জ্বালানি সংকট দূর করতে পারব, না আরও জটিল হবে—এসব ব্যাপারে কিছুই ভাবতে পারছি না। আমাদের যদি বিকল্প জ্বালানি কেনার ব্যবস্থা থাকত, যেমন রাশিয়া, ব্রুনেই, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশ থেকে তেল আমদানির ব্যবস্থা করে রাখা যেত, তাহলে বোধ হয় এত সংকটে এই মুহূর্তে পড়তে হতো না।
নদীমাতৃক উপকূলীয় কয়েকটি জেলায় মৎস্য আহরণ ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে জ্বালানি তেলের অভাবে। ছোট ছোট দেশীয় নৌকা ডিজেলচালিত ইঞ্জিন দ্বারা চলে। এইসব ইঞ্জিনের জন্য তারা ডিজেল পাচ্ছে না। জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যেতে পারছেন না। একেবারেই বিল অঞ্চলের সাধারণ মানুষ সেচকাজের জন্য ডিজেল পাচ্ছেন না। ভরা মৌসুমে যদি সেচ না দিতে পারে, তাহলে বোরো ফসল ভালো হবে না। খাদ্য ঘাটতি দেখা দেবে। আশা করি, আমাদের কর্তাব্যক্তিরা এখন থেকেই চিন্তা করবেন, খাদ্য ঘাটতি হলে কোন দেশ থেকে কীভাবে চাল-গম আমদানি করা যাবে। এইসব আমদানির ক্ষেত্রে বাধাবিপত্তি সব এখনই দূর করে রাখতে হবে।
এলএনজি, এলপিজি আমদানির ব্যাঘাত ঘটলে বিদ্যুৎ ঘাটতি হবে। বিদ্যুৎ ঘাটতি হলে শিল্প উৎপাদনসহ অনেক কিছুর ওপরেই এর প্রভাব পড়বে। একবার মানুষ যদি সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ পাওয়ায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, তখন কিন্তু লোডশেডিংয়ে বিরক্ত হবে, এমনকি পথে নামতেও দ্বিধাবোধ করবে না। তাই সরকারকে এ ব্যাপারে যথেষ্ট মনোযোগী হতে হবে। ইতিমধ্যেই বাসাবাড়িতে ব্যবহারের জন্য এলপিজির দাম বৃদ্ধি করা হয়েছে। এই বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষ খুবই বিরক্তি প্রকাশ করছে। এরপর যদি বিদ্যুৎ না থাকে, তাহলে আরও বিরক্ত হবে। গত কয়েক দিনে বড় বড় শহরের বহুতল যেসব ভবনে লিফটের ব্যবস্থা আছে, সেখানে ডিজেলচালিত জেনারেটর আছে। বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকলে জেনারেটর দিয়ে লিফট চালানো হয়। এই জেনারেটর চালানোর জন্য তেল কিনতে গেলে পাম্প থেকে তেল দিচ্ছে না। তাদের উত্তর—এ রকম ড্রামে তেল নিয়ে মানুষ মজুত করে, তাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হয়রানি করে। বিদ্যুৎ চলে গেলে লিফট বন্ধ থাকে, অনেক সময় লিফটের মধ্যে মানুষ আটকা পড়ে।
ছোট ছোট এইসব সমস্যা বড় আকার ধারণ করার আগেই সুপরিকল্পিতভাবে এর সমাধান করা উচিত। অথবা সমাধানের পথ মাথায় রেখে অগ্রসর হওয়া উচিত। আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রোঅ্যাকটিভ অর্থাৎ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেওয়া দরকার, সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার মানসিকতা থাকা দরকার। রাজ্য যাঁরা পরিচালনা করবেন, অবশ্যই তাঁদের এদিকে খেয়াল রাখতে হবে।