আন্তর্জাতিক নারী দিবস
এবারের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ‘অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ, সব নারী ও কন্যার জন্য হোক’। আজই তো সেই দিবস, ৮ মার্চ। ১৯৭৫ সাল থেকে জাতিসংঘ এ দিনেই দিবসটি পালন করে আসছে। কেন? যাঁরা বারবার ভুলে যান, তাঁদের একটু ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে হয়। মূলত বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নারী শ্রমিকদের আন্দোলন ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের মধ্য দিয়েই জন্ম হয় নারী দিবসের। এই দিবস নারীদের অর্জনকে যেমন সম্মান জানায়, তেমনি সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সমতা আনার লক্ষ্যে লড়াই চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়।
কিছু কথা বলার আগে খানিকটা পেছনে ফেরা যাক। ১৯০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে নারী শ্রমিকেরা কাজের সুষ্ঠু পরিবেশ, ন্যায্য মজুরি ও ভোটাধিকারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯০৯ সালে জার্মান নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে প্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হয়। পরে ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে দ্বিতীয় সম্মেলনে ৮ মার্চকে নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন ক্লারা। ১৯১১ সালে ইউরোপের কিছু দেশে প্রথমবারের মতো এই দিবস পালিত হয়। ১৯১৪ সাল থেকে বেশ কয়েকটি দেশে নারী দিবস পালিত হতে থাকে। একাত্তরে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের আগে থেকেই এখানে দিবসটি পালিত হয়ে আসছিল। তারপর তো জাতিসংঘই আন্তর্জাতিকভাবে এই দিনটিকে স্বীকৃতি দেয়। যদিও প্রায় ৬৫ বছর পর!
এবারের প্রতিপাদ্য বিষয়ে ফিরে আসতে হয়। অধিকার, ন্যায়বিচার, উদ্যোগ—তিনটি শব্দকে নারীর জন্য শিরোপা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। বরাবরের মতো নারীকে এগুলো আদায়ই করে নিতে হবে। নারী বঞ্চিত হয় সম্পত্তির অধিকার থেকে। খুন, যৌন নিপীড়ন, পারিবারিক নির্যাতন কিংবা ধর্ষণের শিকার নারীরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ন্যায়বিচার পায় না। আর যারা পারিবারিক কলহের কারণে, ধর্ষণের শিকার হয়ে কিংবা যৌন নিপীড়নের কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তাদের জন্য বিচারের খাতাটা যেন চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। ইদানীং অনেক নারী উদ্যোক্তা হিসেবে যখন উপার্জন শুরু করেছেন, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁদের চরিত্রের ব্যবচ্ছেদ করা হচ্ছে। তাঁদের জন্য এই সমাজ এমনটাই উদ্যোগ নিয়েছে!
নারী দিবস আমরা প্রতিবছর পালন করি ঠিকই। কিন্তু এই চিত্রগুলো বদলায় না। কোথাও একদল মানুষ নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়, আবার কোথাও এর চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ নারীদের হেয় করতে সদা প্রস্তুত থাকে। আমরা নিশ্চয়ই গত দেড় বছরে খেয়াল করেছি, রাস্তাঘাটে নারীদের হীনভাবে অসম্মান, অপমান, উত্ত্যক্ত আর লাঞ্ছিত করার ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে। আইনের ফাঁক গলে ছুটে গেছে অন্যায়কারী। মনে হয়, পৃথিবী যত দিন বেঁচে আছে, নারীদেরও নিজের জন্য লড়াই করে বাঁচতে হবে। কেউ তাঁদের শিরোস্ত্রাণ হিসেবে ‘অধিকার’, ‘ন্যায়বিচার’ বা ‘উদ্যোগ’ পরিয়ে দেবে না। এগুলো নারীকে আদায় করে নিতে হবে। আর এই আদায় করার পথ যে কতটা বন্ধুর, তা নারীমাত্রই জানেন। অলমতি বিস্তরেণ।
একটা ব্যাপার জানেন কি? পৃথিবীর অনেক দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি ছুটি থাকে। আফগানিস্তানকে আমরা নারীদের জন্য পশ্চাৎপদ অঞ্চল ভাবলেও, তাদের কিন্তু এমন ছুটির ব্যবস্থা আছে! আজারবাইজান, বেলারুশ, বুরকিনা ফাসো, কম্বোডিয়া, কিউবা, জর্জিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, লাওস, মঙ্গোলিয়া, মন্টেনিগ্রো, রাশিয়া, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, উগান্ডা, ইউক্রেন, উজবেকিস্তান, ভিয়েতনাম, জাম্বিয়া প্রভৃতি দেশে ৮ মার্চ ছুটি দেওয়া হয়। তবে চীন, মেসিডোনিয়া, মাদাগাস্কার ও নেপালে শুধু নারীরা এদিন ছুটি কাটান, বাকিদের জন্য কোনো ছুটি নেই। ব্যাপারটা কিন্তু মন্দ না। একটা দিন নারীরা আরাম করলে নিশ্চয়ই কাজের কোনো ক্ষতি হয় না। ঘরের কাজেও বিরতি দেওয়া উচিত।
এ নিয়ে অবশ্য কেউ কেউ অতি উৎসাহে বলতে পারেন, নারীদের ঘরে থেকে ‘আরাম’ করাই ভালো। কিংবা কর্মঘণ্টা ৫ করা? যাঁরা এমনটা মনে করেন, বিশেষ করে পুরুষেরা, তাঁরা তাহলে ঘরে-বাইরে হাড়ভাঙা খাটুনি করুক, নারীকে সব সময় বিশ্রামে রাখুক এবং তাঁদের ফরমাশ খাটুক। নয়তো দ্বিচারিতার মুখোশ খুলে নারীদের সত্যিকারের মর্যাদা দিক।
লেখক: সহসম্পাদক, আজকের পত্রিকা