হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

পরিমাণগত পরিমাপই উন্নয়নের শ্রেষ্ঠ নির্ণায়ক নয়

সেলিম জাহান 

প্রতীকী ছবি

অধিকাংশ মানুষের কাছে ‘উন্নয়ন’ বলতে বোঝায় পরিবর্তনের পরিমাণগত পরিমাপ; যেমন মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি। এ-জাতীয় পরিমাপের তিনটি সীমাবদ্ধতা থাকে— এক, উন্নয়নের ধ্যানধারণা অনেক ব্যাপ্ত এবং গভীর। এর যেকোনো পরিমাপ এই ধারণার পুরোটা যথার্থ এবং সামগ্রিকভাবে ধরতে পারে না। এমন পরিমাপ পুরো ধারণার একটি নির্দেশকমাত্র, পরিপূর্ণ পরিমাপ নয়।

দুই, শুধু একটি একমাত্রিক নির্ণায়ক দিয়ে উন্নয়নের মতো জটিল একটি প্রক্রিয়া মাপা যায় না। এর জন্যও বহুমাত্রিক নির্ণায়ক প্রয়োজন। তিন, উন্নয়ন পরিমাপের জন্য পরিমাণগত পরিমাপ পর্যাপ্ত নয়, এর জন্যও গুণগত পরিমাপ দরকার। আসলে, উন্নয়নের পরিমাণগত সূচকগুলো যদিও উপকারী, কিন্তু এগুলো উন্নয়নের পুরো চিত্র তুলে ধরে না। আসলে একটি দেশ কতটা উন্নত, তা বোঝার জন্য আমাদের দেখতে হবে মানুষের জীবনে এই অগ্রগতির কী প্রভাব পড়ছে। আর তা বুঝতে হলে যে পরিবর্তন তাদের জীবনে ঘটছে, তার গুণগত মানও বিবেচনা করতে হবে।

উন্নয়ন পরিমাপকে একটি একমাত্রিক ভিত্তি থেকে মুক্ত করে একটি বহুমাত্রিক ভিত্তির ওপর প্রতিস্থাপন করার জন্যই মানব উন্নয়ন সূচকের জন্ম। একটি দেশে মানুষের আয়ুষ্কাল বৃদ্ধি, স্কুলে কাটানো বছরের সংখ্যা এবং তাদের মাথাপিছু আয়কে একত্র করে তাদের গড় নিয়ে একটি সমন্বিত সূচক তৈরি করা হয়, যা মানব উন্নয়ন সূচক হিসেবে পরিচিত। একটি দেশের উন্নয়ন পরিমাপের জন্যও এটা কি সর্বোত্তম নির্ণায়ক? মানব উন্নয়ন সূচক সেই দাবি করতে পারে না। কিন্তু এটি তিনটি দাবি করতে পারে। প্রথমত, এই সূচক একমাত্রিক নয়। মানুষের মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে, প্রত্যাশিত গড় আয়ু (স্বাস্থ্যের প্রতীক) এবং শিক্ষার সময়কালকে (জ্ঞানের প্রতীক) সমন্বিত করার ফলে মানব উন্নয়ন সূচক উন্নয়নের একমাত্রিক যেকোনো পরিমাপের চেয়ে ব্যাপ্ত ও বিস্তৃত। সুতরাং, মাথাপিছু আয়ের মতো মানব উন্নয়ন সূচক শুধু অর্থের মাপে উন্নয়নকে মূল্যায়ন করে না, মানুষের কুশলকেও সে মূল্যায়নে বিবেচনা করে। দ্বিতীয়ত, মানব উন্নয়ন সূচক অর্থগত প্রাচুর্য নয়, বরং মানুষের সক্ষমতা এবং সুযোগের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। এবং এটা করার মাধ্যমে এই পরিমাপ শুধু বর্তমান প্রজন্মের কথাই বলে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সক্ষমতা ও সুযোগের কথাও তুলে ধরে। তৃতীয়ত, মানব উন্নয়ন সূচক উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে প্রতিস্থাপন করেছে।

কিন্তু এসব সত্ত্বেও, মানব উন্নয়ন সূচকের তিনটি সীমাবদ্ধতা সুবিদিত। এক, মানুষের কুশলের নানা মাত্রিকতা এই পরিমাপে থাকলেও সেখানে মানুষের কণ্ঠস্বরের স্বাধীনতা কিংবা অংশগ্রহণের সুযোগ অথবা মানব নিরাপত্তা অনুপস্থিত। দুই, মানব উন্নয়ন সূচক পরিমাণগত পরিমাপ; এখানে গুণগত দিক বিবেচনা করা হয়নি। তিন, মানব উন্নয়ন সূচকও একটি গড় পরিমাপ। সুতরাং, যেকোনো গড় পরিমাপের সীমাবদ্ধতা এই সূচকেও বিদ্যমান।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, গুণগত মান প্রতিফলিত করে মানব উন্নয়ন সূচক কী করে পরিশীলিত করা যায়? পরিসংখ্যানবিদেরা সব সময় জানেন, পরিমাণের তুলনা করা গুণগত মানের তুলনার চেয়ে সহজ। কিন্তু যেহেতু বিদ্যমান পরিমাণগত সূচকগুলোই আমাদের কাছে প্রধান হাতিয়ার, তাই তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো প্রায়ই উপেক্ষিত হয়, বিশেষ করে যখন আমরা অগ্রগতির তুলনা করি কিংবা নীতিনির্ধারণ করি। অথচ কোনো নির্দিষ্ট সূচকে ‘অগ্রগতি’ মানেই প্রকৃত উন্নয়ন নয়। বিশ্ব যদি কখনো উন্নয়নে সমতা অর্জন করতে চায়, তাহলে আমাদের গুণগত মান পরিমাপের পদ্ধতি বদলাতে হবে। যেমন একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মান নির্ধারণ করতে গবেষকেরা জানতে চান, শিক্ষার্থীরা আসলেই শিখছে কি না। এর জন্য বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নিতে হয়, যা শুধু উপস্থিতি গণনার চেয়ে অনেক বেশি জটিল কাজ। বিশ্বজুড়ে শিক্ষার সুযোগ বাড়ছে, আগের চেয়ে বেশি শিশু স্কুলে ভর্তি হচ্ছে এবং উপস্থিত থাকছে। কিন্তু শিক্ষার মানের ফাঁক কীভাবে পরিমাপ করব? বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৫ কোটি শিশু মৌলিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে না, যদিও তাদের অর্ধেক অন্তত চার বছর স্কুলে কাটিয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু নেই যে অধিকাংশ দেশে ধনী এলাকাগুলোর স্কুলে ভালো সুযোগ-সুবিধা, দক্ষ শিক্ষক এবং ছোট ক্লাস থাকে।

এই বৈষম্য দূর করতে হলে ভর্তি নয়, বরং শেখার ফলাফল পরিমাপ করতে হবে।

মানব উন্নয়ন সূচকের আয়ুষ্কাল বিবেচনা করা যাক। শুধু পরিমাণগত উপাত্ত দেখলে দেখা যাবে যে বিশ্ব আরও স্বাস্থ্যকর হচ্ছে এবং মানুষ আগের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে আছে; ১৯৯০ সাল থেকে গড় আয়ুষ্কাল প্রায় ছয় বছর বেড়েছে। কিন্তু মূল্যায়ন করলে দেখা যাবে, বহু মানুষ দীর্ঘকাল বাঁচলে তাঁদের জীবনকালের একটি বড় সময় প্রায়ই অসুস্থতা ও অক্ষমতার সঙ্গে কাটে—যেমন স্মৃতিভ্রষ্টতা, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী বিশ্বে প্রায় ৫ কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। সুতরাং পরিমাণের নিরিখে কত বছর আয়ু পাওয়া গেল, সেটাই একমাত্র কথা নয়, সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, সেই সব বছরের গুণগত উৎকর্ষ কতটা ছিল। অতিরিক্ত আয়ুষ্কাল জন্ম ও মৃত্যুর তথ্য থেকে সহজে নির্ণয় করা যায়, কিন্তু জীবনমান পরিমাপের সূচক নির্ধারণ করতে হলে বিভিন্ন রোগ ও অক্ষমতার বিস্তৃত তথ্য প্রয়োজন। দুর্ভাগ্যবশত, এই তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হওয়ায় অনেক জীবনমান সম্পর্কিত উপাত্ত অসম্পূর্ণ বা খুব কম সময়ে পরিশীলিত করা হয়।

তেমনিভাবে, যে মাথাপিছু আয় অর্জিত হয়েছে, তা মোট জাতীয় আয় সমতাভিত্তিক উপায়ে বণ্টিত হওয়ার পরে পাওয়া গেছে কি না, সেটাই আয়ের গুণগত মাত্রিকতাকে প্রকাশ করে। একইভাবে, পরিবেশকে নষ্ট করে যা পাওয়া যায়, তা কখনো গুণসম্পন্ন প্রবৃদ্ধি হতে পারে না। মানব উন্নয়ন সূচকের গুণগত পরিমাপের আরও একটি পন্থা হলো এই সূচকের বিভাজন—আঞ্চলিকভাবে, গ্রাম ও নগরের মধ্যে, নানান আর্থসামাজিক গোষ্ঠীর মধ্যে এবং নারী-পুরুষের মধ্যে। বিভাজিত মানব উন্নয়ন সূচকের মাধ্যমে বিভিন্ন অঞ্চল, নানান আর্থসামাজিক গোষ্ঠী, গ্রাম ও নগর এবং নারী-পুরুষের মধ্যে মানব উন্নয়নের গুণগত পার্থক্য বোঝা যায়।

যখন পরিসংখ্যানবিদেরা দেশগুলোর তুলনা করেন, তখন তাঁদের সমতুল্য তথ্য দরকার হয়। উদাহরণ হিসেবে, স্কুলে উপস্থিতি তুলনা করতে গবেষকেরা প্রতিটি দেশে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা গণনা করেন, যা স্কুল-বয়সী শিশুদের মোট সংখ্যার তুলনায় নির্ধারিত হয়। কিন্তু শিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তদেশীয় গুণগত মানের তুলনা অত সোজা নয়। বহুক্ষেত্রে এ-জাতীয় গুণগত মূল্যায়ন পাঠ্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, এমন পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে। শিক্ষার গুণগত মূল্যায়নের দেশভিত্তিক তুলনার এটি একটি উপায়। এ-জাতীয় মূল্যায়নের পরীক্ষা অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর শিক্ষার একটি সমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরে এবং সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৈষম্যও প্রকাশ করে। উদাহরণ হিসেবে, সামাজিক-অর্থনৈতিকভাবে যারা পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থী, তারা উন্নত শিক্ষার্থীদের তুলনায় বিজ্ঞান বিষয়ে মৌলিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হওয়ার প্রায় তিন গুণ বেশি ঝুঁকিতে থাকে। মাথাপিছু আয়ের ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতা সমতাভিত্তিক ডলারের মাধ্যমে নানান দেশের আয়কে প্রতিফলিত করে একটি তুলনামূলক মূল্যায়ন করা হয়।

সমাজবিজ্ঞানী উইলিয়াম ব্রুস ক্যামেরন ১৯৬৩ সালে লিখেছিলেন, ‘যা কিছু গণনা করা যায়, তা সব গুরুত্বপূর্ণ নয়, আর যা গুরুত্বপূর্ণ, তা সব গণনা করা যায় না।’ কথাটি আজও সত্য। তবে মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে বলা যায়: ‘যা কিছু গণনা করা হয়, তা সবকিছুর জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়।’ ন্যায়সংগত মানব উন্নয়নের জন্য নীতিনির্ধারকদের উচিত পরিমাণের চেয়ে গুণগত মানের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া। মানুষ কীভাবে উন্নয়নের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, তা বুঝতে পারলেই আমরা এমন নীতি তৈরি করতে পারব, যা তাদের জীবনে প্রকৃত মূল্যবান পরিবর্তন আনবে।

অমানবিক বিশ্বরাজনীতি

অস্ত্র ব্যবসার উন্মাদনা বনাম ডুমস ডে

সুচিত্রা সেন

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত

বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ও উত্তরণের পথ

বিশ্বরাজনীতির উত্তাপ ও বাংলাদেশের কৃষি

ফুটপাতে উচ্ছেদ

রোষানলে আত্মহত্যা

গণভোট অবৈধ হলে গণভোটের রায় কীভাবে বৈধ

সংবিধান সংশোধন বনাম সংস্কার