হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

শত বছর পরেও শিখাগোষ্ঠীর প্রাসঙ্গিকতা

আসাদুজ্জামান খান মুকুল, নান্দাইল, ময়মনসিংহ

মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ছিল বাৎসরিক প্রকাশিত ‘শিখা’ পত্রিকা। ছবি: সংগৃহীত

বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে পুরো বাংলায়ই এক অস্থির সময় বিরাজ করছিল। বাঙালি মুসলমান সমাজ ছিল গোঁড়ামি, কুসংস্কার ও শাস্ত্রের অন্ধ অনুশাসনে আড়ষ্ট। ঠিক সেই পরিবেশে ঢাকাকেন্দ্রিক এক ঐতিহাসিক বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সৃষ্টি হয়। এই জাগরণ ইতিহাসের পাতায় ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে সুপরিচিত। এর সাংগঠনিক নাম ছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। যেটা আবার ‘শিখাগোষ্ঠী’ নামেও পরিচিত ছিল। শিখাগোষ্ঠীর বিদ্রোহ ছিল সুসংগঠিত ও লক্ষ্যভিত্তিক। এটি কেবল অন্ধকার সমাজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ নয়, চিন্তার মুক্তি ও আধুনিকায়নের পক্ষে এক দার্শনিক লড়াইও ছিল। সংগঠনের মূলমন্ত্র ছিল ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব’—যার মাধ্যমে মানুষকে তথাকথিত জ্ঞানের স্থবিরতা থেকে বেরিয়ে এসে যুক্তি ও নিজস্ব বিচারবুদ্ধিতে নির্ভীকভাবে বেঁচে থাকার আহ্বান। এই অবস্থানই ছিল বস্তুত ইউরোপীয় রেনেসাঁর মূল চেতনা এবং সর্বকালের উদার জাগরণ-প্রয়াসের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মানুষকে মানবিকতার উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা।

১৯২৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম হল ইউনিয়ন কক্ষে বাংলা ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম সাহিত্য সমাজ। এই উদ্যোগটি ছিল কয়েকজন তরুণ, যুক্তিবাদী ও প্রগতিশীল শিক্ষক-ছাত্রের সাহসী উদ্যোগের ফসল। এটি ছিল পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজকে জ্ঞান, যুক্তি ও মানবতাবাদের আলোকে আলোকিত করার প্রয়াস।

নবগঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই আন্দোলনের সূতিকাগার ও প্রাণকেন্দ্র। এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক আবুল হুসেন, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কাজী আবদুল ওদুদ এবং যুক্তিবিদ্যার অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেনের মতো চিন্তাবিদেরা। তাঁরা কেবল একাডেমিক গবেষণায় মনোনিবেশ না করে সরাসরি সামাজিক সংস্কারের কাজেও নেমে পড়েন। কারণ, তাঁরা অনুধাবন করেন যে পশ্চাৎপদ বাঙালি মুসলমান সমাজের প্রগতির পথে কেবল শিক্ষার অভাব বা অর্থনৈতিক দুর্বলতা নয়; এর পেছনে রয়েছে আড়ষ্ট বিচারবুদ্ধি ও শাস্ত্রানুগত্যের বেড়াজাল, যা তাদের চিন্তা-চেতনাকে স্থবির করে রেখেছে। তাঁরা ছিলেন এক অর্থে বাংলার দ্বিতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত।

এই আন্দোলনকে কেবল ঢাকায় সীমাবদ্ধ না রেখে পূর্ব বাংলার বৃহত্তর জনমানসে ছড়িয়ে দিতে মোতাহের হোসেন চৌধুরী ও আবদুল কাদিরের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মোতাহের হোসেন চৌধুরী মূলত ছিলেন সাহিত্য সমাজের সাধারণ সম্পাদক এবং তাঁর মননশীল গদ্যের মাধ্যমে মুক্তচিন্তার ধারণাকে শৈল্পিক রূপ দেন। যার প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর ‘সংস্কৃতির কথা’ সংকলনে। তিনি সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতাবাদের মাধ্যমে ‘মানুষের রুচির মুক্তি’কে কেন্দ্রবিন্দুতে এনেছিলেন। শিখাগোষ্ঠীর তরুণেরা শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবদ্ধ না থেকে বরং বিভিন্ন সভা-সমিতি ও সাহিত্য আড্ডার মাধ্যমে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ককে সাধারণের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, সাহিত্যই হলো সামাজিক পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁদের লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। ধর্মীয় সংস্কারের পাশাপাশি জীবন ও সাহিত্যকে বিজ্ঞানসম্মত যুক্তিযুক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা।

আন্দোলনের ভাবধারাকে বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ তাদের বাৎসরিক মুখপত্র ‘শিখা’ প্রকাশ করে, যা ছিল মূলত একটি সংকলনধর্মী পত্রিকা। ১৯২৭ সালে যার প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়। আবুল হুসেন প্রথম সংখ্যার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ‘শিখা’র প্রধান উদ্দেশ্য ছিল, যেমনটি আবুল হুসেন বলেছিলেন, ‘বর্তমান মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন সাধন করা। ‘শিখা’র পাতায় প্রকাশিত প্রবন্ধগুলো ছিল রীতিমতো যুক্তিতর্ক ও জিজ্ঞাসার ফসল, যা সেই সময়ের প্রচলিত ধর্মীয় ও সামাজিক গোঁড়ামিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছিল। এই লেখকেরা উপলব্ধি করেছিলেন, কেবল অতীতের গৌরব বা ধর্মীয় সংস্কার আঁকড়ে থাকলে বাঙালি মুসলমান সমাজ আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। তাই তাঁরা কেবল ইসলামের ঐতিহাসিক বা শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর না করে, এটিকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আধুনিকীকরণ করতে চেয়েছিলেন। তাঁদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যকে কেবল রসসৃষ্টির মাধ্যম না রেখে, এটিকে চিন্তাচর্চা ও মননশীলতার বাহন হিসেবে ব্যবহার করে সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতি সাধন করা।

এই সংগঠনের নামের সঙ্গে ‘মুসলিম’ শব্দটি যুক্ত থাকলেও এর সদস্যরা ছিলেন সম্পূর্ণভাবে ধর্মনিরপেক্ষ ও উদার মনের। এই গোষ্ঠী কখনোই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মের প্রচারক ছিল না। সদস্যরা ছিলেন যুক্তি ও মানবিকতার প্রদর্শক। তাঁদের চিন্তাধারা কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ ছিল না। তাঁরা ধর্ম পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানুষ হিসেবে যুক্তি ও মূল্যবোধের স্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতেন। এর প্রমাণস্বরূপ, প্রতিষ্ঠানের অধিবেশনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলামসহ হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের চিন্তাবিদদের সক্রিয় উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। বঙ্গভঙ্গ-পরবর্তীকালে যখন সাম্প্রদায়িক বিভেদ তীব্র হচ্ছিল, তখন এই গোষ্ঠীর সমন্বয়বাদী ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি বৃহত্তর বাঙালি সংস্কৃতি গঠনে এবং সহাবস্থানের ভিত্তি রচনায় অত্যন্ত জরুরি ভূমিকা পালন করেছিল। এমন দৃষ্টিভঙ্গি বাঙালিকে শিখিয়েছিল যে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে নাগরিক পরিচয় এবং মানবিক সম্পর্ক অনেক বেশি জরুরি।

এই প্রগতিশীলতার ঢেউ নারীসমাজকেও স্পর্শ করেছিল। সেই রক্ষণশীল সমাজে ফজিলাতুন্নেসা, ফাতেমা খানম, শামসুন নাহারের মতো নারীরা প্রকাশ্যে এসে প্রবন্ধ পাঠ করেন এবং নিজেদের মুক্তচিন্তকের পরিচয় দেন। এটি ছিল সেই সময়ে বাঙালি মুসলমান সমাজে নারীমুক্তির পথে এক বৈপ্লবিক পদক্ষেপ। এই নারী লেখকেরা কেবল নিজেদের পারিবারিক মুক্তি চাননি, তাঁরা চেয়েছিলেন সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে নারীর মেধা ও যুক্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। তাঁদের এই লড়াই বাঙালি সমাজের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল, পর্দাপ্রথা-আবদ্ধ কাঠামোতে একটি বিরাট আঘাত হেনেছিল, যা পরবর্তী প্রজন্মের নারী আন্দোলনের দুয়ার খুলে দিয়েছিল।

এই আন্দোলন অত্যন্ত স্বল্পস্থায়ী ছিল। সক্রিয়ভাবে মাত্র ১০ বছর (১৯২৬-১৯৩৬) ছিল এর কার্যক্রম। এটি বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল রক্ষণশীল সমাজের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও প্রবল বিরোধিতাপূর্ণ আক্রমণ। মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধে ধর্মীয় ফতোয়া জারির ফলে জনমানসে একধরনের ভীতি সৃষ্টি হয়। গোঁড়া ধর্মীয় নেতারা এই মুক্তচিন্তাকে সরাসরি ‘ধর্মদ্রোহিতা’ বা ‘নব্য-খ্রিষ্টানিজম’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে এর নেতাদের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেন। ১৯২৮ সালে আবুল হুসেনকে ঢাকার বলিয়াদির জমিদার কাজেম উদ্দিন সিদ্দিকীর কাছে মুচলেকা দিতে বাধ্য করা হয়, যাতে তিনি আর বিতর্কিত লেখা না লেখেন। এটি ছিল আন্দোলনের ওপর রক্ষণশীল সমাজের সরাসরি আঘাত। সে সময়ের রক্ষণশীল মহল এই প্রগতিশীল চিন্তকদের ‘শয়তানের পূর্ণাবতার’, ‘বুনো বর্বর’ ইত্যাদি কটু নামে আখ্যায়িত করে সমাজ থেকে একঘরে করে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। প্রধান সংগঠক আবুল হুসেনের ঢাকা ত্যাগ (১৯৩২) এবং সমাজের মূলধারার অসহযোগিতা আন্দোলনটির সাংগঠনিক স্থিতিশীলতা ভেঙে দেয়।

এই আক্রমণের মুখে কিছু লেখক পিছু হটতে বাধ্য হলেও আদর্শ বিলীন হয়নি। শিখাগোষ্ঠীর এই আন্দোলন বাঙালির মনন জগতে যে আলো ফেলেছিল তা কখনোই নিভে যায়নি। এটি স্বল্পস্থায়ী হলেও বাঙালি মুসলমান সমাজের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নবজাগরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি রচনা করেছিল।

আজ শতবর্ষ পরেও, যখন সমাজে উগ্রতা ও সংকীর্ণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন ‘বুদ্ধির মুক্তি’র সেই পুরোনো আহ্বান—সবকিছুকে যুক্তি, মানবিকতা ও উদারতার সঙ্গে বিচার করার সাহস—আমাদের জন্য আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। এই আন্দোলন ইতিহাসের পাতায় কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী অধ্যায় নয়, এটি বাঙালি জাতির চেতনার এক প্রগতিশীল ও চিরন্তন উত্তরাধিকার।

বাড়িভাড়া সমাচার

কেন ব্যর্থ হলো পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগ

সরস্বতীর শাস্ত্রীয় গুরুত্ব

জঙ্গল সলিমপুর

ন্যাটো কি ভাঙনের মুখে

ইরান ভেঙে পড়লে মধ্যপ্রাচ্যের পরিণতি কী হবে

আর্কটিক ভূরাজনীতিতে গ্রিনল্যান্ড

বস্তুকে না মেনে বদলানো চাই

টেকসই উন্নয়নে ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া লিংকেজ

আত্মহত্যা