হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

ভ্যাপের বিরুদ্ধে আরও প্রচার প্রয়োজন

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র 

ড. বিভূতি ভূষণ মিত্র। ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি তামাকবিরোধী নারী জোট (তাবিনাজ) নামের একটি সংগঠন ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুমোদনের সিদ্ধান্তকে সাহসী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এই অধ্যাদেশের ইতিবাচক দিক রয়েছে কয়েকটি। যেমন সব পাবলিক প্লেস ও গণপরিবহনে তামাক ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধকরণ; তামাকজাত পণ্যের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সব ধরনের বিজ্ঞাপন ও প্রদর্শনী নিষিদ্ধকরণ; তামাকজাত পণ্যের মোড়কে উপরিভাগে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তার আকার ৭৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং নতুন নিকোটিন পাউচকে আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা। তারা আরও বলেছে, নতুন অধ্যাদেশের মাধ্যমে ই-সিগারেট, হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট এবং আধুনিক নিকোটিনজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন নিষিদ্ধ করায় তরুণ প্রজন্মকে তামাকের নেশা থেকে দূরে রাখতে কার্যকর ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

তাবিনাজের এই কথাগুলো সবার কথাই। মানে সব তামাকবিরোধী মানুষই এসব কথায় একমত হবেন। কিন্তু এই বিষয়গুলো নিয়ে মানুষের ভেতরে কতটুকু জানাশোনা রয়েছে, সেটাও দেখতে হবে। যেমন ই-সিগারেট বা ভ্যাপ নিয়ে প্রায় সব জায়গায় একটা ভ্রান্ত ধারণা আছে বা বিভ্রান্ত করা হচ্ছে যে ই-সিগারেট প্রচলিত সিগারেটের বিকল্প। ধূমপান ত্যাগ করতে চাইলে অর্থাৎ ধূমপান থেকে রক্ষা পেতে ই-সিগারেট ব্যবহার করতে বলা হয়। মানে ই-সিগারেট ক্ষতিকর না বা কম ক্ষতিকর—এসব বিভ্রান্তি ছড়িয়ে যারা ধূমপান ত্যাগ করতে চাইছে, তাদের ভ্যাপের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু আদতে কি তাই?

এবারের অধ্যাদেশে তামাকজাত দ্রব্যের সংজ্ঞা সম্প্রসারিত করা হয়েছে। এর আওতায় ই-সিগারেট, ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম (ইউএনডিএস), হিটেড টোব্যাকো প্রোডাক্ট (এইচটিপি), নিকোটিন পাউচসহ সব ধরনের পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আর ভ্যাপ হলো একধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস। এটি তরলকে গরম করে ধোঁয়ার মতো অ্যারোসল সৃষ্টি করে। এটি ব্যবহারকারীরা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করে। ভ্যাপ মূলত একটি ব্যাটারিচালিত যন্ত্র। এটি দেখতে কলম বা পেনসিলের মতো। এর ভেতরে নিকোটিন, প্রোপিলিন গ্লাইকল, গ্লিসারিন, স্বাদবর্ধক উপাদান ও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান থাকে। ডিভাইসটি এসব তরলকে গরম করে। ফলে বাষ্পে পরিণত হয়। এটিই ব্যবহারকারীরা মুখে নিয়ে ফুসফুসে টেনে নেয়। এই ভ্যাপও আসক্তি বাড়ায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ই-সিগারেটও আসক্তি বাড়ায়। এটিও স্বাস্থ্যের প্রতি হানিকর। এর মধ্যে এমন কিছু বিষাক্ত পদার্থ আছে, যার কারণে ক্যানসার, ফুসফুস ও হার্টের রোগের ঝুঁকি বাড়ে। বুদ্ধি বিকাশ বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি অন্তঃসত্ত্বা নারীদের ভ্রূণের বিকাশও বাধাগ্রস্ত করে। মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ডা. অরূপ রতন চৌধুরী একটি প্রতিবেদনে বলেন, ই-সিগারেট থেকে বের হওয়া ক্ষতিকর ধোঁয়া ফ্রি র‍্যাডিক্যালস এবং ফুসফুসে বিষক্রিয়া সৃষ্টি করে। হিটিং এলিমেন্ট যেটা তরল জুসের মতো থাকে, সেটা অ্যারোসলে রূপান্তরিত হয়। এতে বিষক্রিয়ার পথ সুগম হয়।

গত এপ্রিল মাসে একটি নিউজ পোর্টালে এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়, ভ্যাপ আমদানি নিষিদ্ধ হলেও চীন থেকে একশ্রেণির যাত্রী এটি নিয়ে আসছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আমদানিনীতি আদেশ ২০২১-২৪ সংশোধন করে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য তালিকায় ই-সিগারেট অন্তর্ভুক্ত করে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ৩১ ডিসেম্বর এই আদেশ জারি করে। এই আদেশ জারির পর তিন মাসে লক্ষাধিক পিস ভ্যাপ জব্দ করে। শুধু এভাবে নয়, কুরিয়ারের মাধ্যমেও ভ্যাপ আনা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার তামাক নিয়ন্ত্রণে ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করেছে, যাকে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত ৩০ ডিসেম্বর এই অধ্যাদেশটি জারি করা হয়। নতুন অধ্যাদেশে পাবলিক প্লেস ও পাবলিক পরিবহনে ধূমপানের পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই নিয়ম না মানলে জরিমানা ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ধরা হয়েছে, যা আগে ছিল ৩০০ টাকা। বিজ্ঞাপন ও প্রচার সম্পূর্ণ নিষেধ করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে তামাকজাত দ্রব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিক্রয়স্থলে প্যাকেট প্রদর্শন ও প্রচার, করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা কার্যক্রমে তামাক কোম্পানির নাম বা লোগো ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালের আশপাশে, ক্লিনিক, খেলার মাঠ ও শিশুপার্কের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্য বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

কিন্তু এই নিষিদ্ধকরণ কি কাগজ-কলমেই? অন্য সব কথা বাদ দিলেও স্কুলের আশপাশে ১০০ মিটারের মধ্যে যে তামাকজাত দ্রব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এর বাস্তবায়ন হবে কতটুকু? অথচ স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েরাই ভ্যাপে আসক্ত হচ্ছে বেশি। ওরাই এটাকে সিগারেটের বিকল্প ভাবছে। ওরা ভাবছে যে এটা ক্ষতিকর নয়।

নতুন অধ্যাদেশে ই-সিগারেটসহ সব তামাক পণ্যের আমদানি-রপ্তানি, সংরক্ষণ, বিক্রয় ও ব্যবহারকে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এসব আইন লঙ্ঘনকারীকে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। শাস্তি অনেক। কিন্তু এই শাস্তিটা কেন, কাকে, কী করলে দেওয়া হবে, সেটাও তো জানানো দরকার। তা না হলে সাবধান হবে কীভাবে? ভ্যাপের বিস্তার ঠেকাতে এই মুহূর্তে খুব দ্রুতই এর বিরুদ্ধে প্রচার প্রয়োজন। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগুলোতে। এসব

নেশা মফস্বলেও এখন ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানেও ব্যাপক প্রচারণা প্রয়োজন।

আজকের জগৎটি অবিশ্বাস আর অনাস্থার

তিমিসমাজ যা শেখাতে পারে

এক লাখ টাকা

ফাটা বাঁশের চিপায় ইরান

ইরান সংকটের দ্বিপক্ষীয় রূপ

প্রবীণেরা আত্মহত্যা কেন করেন

সুপার ফাইভ বাহিনী

নতুন রূপে পররাজ্য দখলের সনাতনি পর্ব

মোগলহাট ও লালমনিরহাট: উন্নয়ন বঞ্চনার এক বাস্তব দলিল

একটি ভালো উদ্যোগ