হোম > মতামত > উপসম্পাদকীয়

প্রথম পর্ব

প্রাভদার সাংবাদিকের চোখে ভয়াল ২৫ মার্চ

আলেকসান্দর ফিলিপভ

(‘অতীতকে ছিন্ন করে’ নামের একটি বই লিখেছিলেন আলেকসান্দর ফিলিপভ। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র ‘প্রাভদা’র নিজস্ব সংবাদদাতা। প্রাভদার সংবাদদাতা হিসেবে তৎকালীন পাকিস্তানে তিনি বহু বছর কাটিয়েছেন। তিনি তাঁর এই বইয়ে পাকিস্তানের বহু ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তারই একটি অংশ ২৫ মার্চের ভয়াবহতা নিয়ে। এই অংশ পাঠকের জন্য রুশ ভাষা থেকে অনুবাদ করে দেওয়া হলো। আজ রইল এর প্রথম পর্ব।)

২৫ মার্চ ১৯৭১ এসে গেল। সংবাদদাতাদের সঙ্গে আমি প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে যাচ্ছি, যেখানে আলোচনা চলছে। সাংবাদিকদের মধ্যে আমি এক পুরোনো পরিচিতকে দেখলাম—মাজহার আলি খান। তিনি ঢাকায় এসেছেন ‘ফোরাম’ পত্রিকার জন্য কয়েকটি প্রতিবেদন তৈরি করতে।

আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলো এক ব্যক্তির, যিনি এত দিন বিদেশি সংবাদদাতাদের তালিকায় ছিলেন না। তিনি হলেন হাঙ্গেরির পত্রিকা ‘নেপসাবাদশাগ’-এর জর্জ কালমার। তিনি গতকাল মাত্র দিল্লি থেকে থাই এয়ারলাইনসের বিমানে এসে পৌঁছেছেন। আমাদের দলে নতুন সদস্য যোগ হলো।

পুরো এলাকা সাঁজোয়া গাড়ি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। আকাশে তিনটি যুদ্ধ হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে। সাংবাদিকদের কাছে এসে সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হামিদ খান, এক শান্ত-স্বভাবের সাদা-চুলের জেনারেল, হাসিমুখে বললেন: ‘সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলছে, প্রিয় সাংবাদিকেরা। ক্ষমতা তার বৈধ প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রেসিডেন্ট ঢাকা ছেড়ে করাচি যাচ্ছেন, সেখান থেকে তিনি সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবেন। খবরের দিকে নজর রাখুন।’

বিকেলের দিকে জে এ ভুট্টো হোটেলে ফিরে এলেন। সাংবাদিকেরা তাকে ঘিরে ধরল। —‘শেষ মুহূর্তে আলোচনা অচল হয়ে গেছে। আমাদের প্রতিনিধিদল করাচি ফিরে যাচ্ছে।’ হলের মধ্যে আমি আরেক পুরোনো পরিচিতকে দেখলাম—মাহমুদ আলি কাসুরি, এখন তিনি পিপিএনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। আমি তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি অদ্ভুতভাবে এক কক্ষ থেকে আরেক কক্ষে দৌড়াতে লাগলেন, নিজের বদলে ছেলেকে রেখে গেলেন।

—‘বলো উমর, আলোচনার শেষ খবর কী?’ আমি জিজ্ঞেস করলাম।

‘মনে হচ্ছে, সব ভেঙে গেছে। প্রেসিডেন্ট করাচি উড়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে।

ব্যাপারটা ভালো নয়।’

হোটেলের সামনে কয়েকটি গাড়ি এসে দাঁড়াল। কুলিরা স্যুটকেস বের করতে লাগল। ভুট্টোর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের লোকেরাও হোটেল ছেড়ে যেতে লাগল। হোটেলের প্রবেশদ্বারের ওপরে

দুই বাঙালি, পাকিস্তানি সৈন্যদের উদাস দৃষ্টির সামনে, আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিল। নোটিশ বোর্ডের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমি টাইপরাইটারে লেখা একটি ঘোষণা দেখলাম: ‘প্রযুক্তিগত কারণে আজ ও আগামীকাল সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করা হলো।’

হলে সংবাদপত্র বিক্রি করা ছেলেরা ঢুকল। ঢাকার ‘পিপল’ পত্রিকার জরুরি সংখ্যায় লেখা: ‘পূর্ব পাকিস্তান আর নেই! দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ!’

রাত প্রায় ৮টার দিকে শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত সচিব এসে সব বিদেশি সাংবাদিককে আওয়ামী লীগের নেতার প্রেস কনফারেন্সে আমন্ত্রণ জানালেন।

মুজিবুর রহমানের বাড়িটি ধানমন্ডির অভিজাত এলাকায়। কাছেই একটি খোলা মাঠ, যেখানে আগুন জ্বালিয়ে ছাত্ররা পুরোনো রাইফেল নিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে অনুশীলন করছে, নকল গ্রেনেড ছুড়ছে। কোথাও থেকে বাংলা গানের সুর ভেসে আসছে।

বাগানভর্তি সাংবাদিক, আওয়ামী লীগের কর্মী। মুজিবুর রহমান এলেন। মুখে উদ্বেগ। তিনি বললেন: ‘প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে আলোচনা ভেঙে দিয়েছেন এবং করাচি চলে গেছেন। আমরা খবর পেয়েছি, পাকিস্তানি বাহিনী আজ সকাল থেকে পুরো প্রদেশে কৌশলগত অবস্থান দখল করছে। রাস্তা বন্ধ, বাঙালি পুলিশ ব্যারাকে আটক। আমি জনগণকে শান্ত থাকতে বলেছি, উসকানিতে পা না দিতে অনুরোধ করছি। আগামীকাল সর্বাত্মক হরতাল। সাংবাদিকদের অনুরোধ করছি সত্য খবর প্রকাশ করতে।’

কেউ জিজ্ঞেস করল, আওয়ামী লীগের কমিটির সদস্যরা কি শহর ছাড়ছে?

‘হ্যাঁ’, তিনি বললেন। ‘কিন্তু আমি আমার পরিবারসহ ঢাকায় থাকব, যা-ই ঘটুক।’

আরেক প্রশ্ন: পশ্চিম পাকিস্তানি ও ভারতীয়দের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা কি করা হয়েছে?

‘বাজে কথা! এগুলো ইয়াহিয়া খানের গোয়েন্দাদের চক্রান্ত। আমরা সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়ছি। পশ্চিম পাকিস্তানের কৃষক-শ্রমিক আমাদের ভাই।’

এরপর শেখ মুজিব বললেন: ‘আগামীকাল, ২৬ মার্চ সকাল ৯টায় এখানে সাক্ষাৎকার দিতে পারি, যদি শহরের পরিস্থিতি অনুমতি দেয়।’

আমরা হোটেলে ফিরলাম। শহর উত্তেজিত। ছাত্ররা মিছিল করছে, হাতে বাঁশের লাঠি, বন্দুক, তলোয়ার। লাউডস্পিকারে শোনা যাচ্ছে: ‘জয় বাংলা!’

হোটেলে এসে দেখি সৈন্য নেই, ঢোকা-বেরোনোর দরজা উন্মুক্ত।

হলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা। বিদ্রোহী ছাত্ররা বলছে—ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই দরকার।

কেউ আওয়ামী লীগের কৌশল সমর্থন করছে, কেউ মুজিবকে ধীর বলে সমালোচনা করছে।

এই সময় খবর এল—পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাইরে বেরিয়ে এসেছে। নারায়ণগঞ্জে ট্যাংক দিয়ে শ্রমিকদের ওপর গুলি করা হয়েছে।

কিছুক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা হোটেলে ঢুকে পড়ল।

অফিসার লাউডস্পিকারে বলল: সবাই বেরিয়ে যান, বিদেশিরা নিজেদের কক্ষে যান।

সৈন্যরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে মানুষ তাড়াতে লাগল... সৈন্যরা রাইফেলের বাঁট দিয়ে সবাইকে বের করে দিতে লাগল। বাইরে ইতিমধ্যে ত্রিপলে ঢাকা ট্রাক দাঁড়িয়ে ছিল। শহীদুল্লা কায়সার আমার সঙ্গে হাত মিলিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। এক সৈন্য তার পিছু নিল। সেই সময় এক বাঙালি তরুণী, হোটেলের বইয়ের দোকানের কর্মী, সামনে এসে দাঁড়াল। সৈন্যটি তার চুলের বেণি ধরে টেনে ট্রাকের দিকে নিয়ে গেল। আমাদের, সাংবাদিকদের, লাথি মেরে, ধাক্কা দিয়ে লিফটের দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়া হলো। যখন আওয়ামী লীগের ব্যাজ পাওয়া গিয়েছিল বলে এক বাঙালি কর্মচারীকে মারধর করা হচ্ছিল, তখন একজন সাংবাদিক ছবি তোলার চেষ্টা করছিলেন। সৈন্যরা ক্যামেরা কেড়ে নিয়ে মেঝেতে আছাড় মেরে ভেঙে ফেলল।

অফিসারের গর্জন শোনা গেল: ‘পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হচ্ছে। সব বিদেশি সাংবাদিক নিজেদের কক্ষে চলে যান। না হলে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।’

হল ফাঁকা হয়ে গেল। বাইরে হঠাৎ গোলন্দাজের শব্দ, দূরে বিস্ফোরণ, মেশিনগানের শব্দ শোনা গেল। হোটেলের পঞ্চম তলা থেকে দেখা গেল, পুরান ঢাকার দিকে আগুনের শিখা উঠছে। আকাশে আলোক রকেট দেখা যাচ্ছে।

স্বাধীনতা দিবস: অর্জন, অপ্রাপ্তি ও প্রত‍্যাশা

কেঁদেও পাব না তাঁদের অজস্র জলাধারে

২৫ মার্চের বিভীষিকা

সম্প্রীতির ঈদুল ফিতর

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জিতে যাচ্ছে রাশিয়া-চীন

আমাদের সময়ের ঈদ আর এখনকার ঈদ

জেট ফুয়েলের দাম ১০ দিনে লিটারে বাড়ল ১০০ টাকা, এভিয়েশন ব্যবসায় অশনিসংকেত

ইরান যুদ্ধে স্পষ্ট হচ্ছে স্বার্থের দ্বন্দ্ব

তথ‍্য ও অপতথ‍্যে জর্জরিত চারপাশ

চাই সুপরিকল্পিত শিক্ষানীতি, প্রজ্ঞাবান নেতৃত্ব