ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসার মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার দেশে শুরু হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনর্যাত্রা। এই যাত্রা শুরু হচ্ছে নবম সংসদের পর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের তিনটি সংসদ, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগের পতন, অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের ধাপ পেরিয়ে। এই সংসদের সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ ২১৯ জন সংসদ সদস্যই নতুন।
জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদকক্ষে আজ বেলা ১১টায় শুরু হবে অধিবেশন। সংসদকে কার্যকর, গঠনমূলক এবং অর্থবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা বলেছে সরকারি দল ও বিরোধী দল। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলীয় জোট জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে জোর দিচ্ছে। অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিষয়ে বিরোধিতা আছে তাঁদের। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সংসদকে কার্যকর করতে সরকার ও বিরোধী দল ভূমিকা রাখবে।
সংসদবিষয়ক গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমদ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অনেক দিন সংসদ নেই। বর্তমান সংসদের সরকারি ও বিরোধী দল বড় মাত্রায় ভুক্তভোগী। অতীতে যে কারণে সংসদ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারেনি, সেগুলো বিবেচনা করে তাঁরা সতর্ক হবেন।’ তিনি বলেন, সরকারকে সরকার চালানোর সুযোগ দিতে হবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলকে বিরোধিতা করার সুযোগ দিতে হবে। এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালা। যেহেতু দুই দলেরই অভিন্ন শত্রু (আওয়ামী লীগ) আছে, তাই তারা বিরোধিতার ক্ষেত্রে একটি জায়গায় স্থির থাকবে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংসদকে বিলুপ্ত ঘোষণা করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। দ্বাদশ সংসদের সর্বশেষ অধিবেশন বসেছিল ২০২৪ সালের ৩ জুলাই। সে হিসাবে ১ বছর ৮ মাস ৭ দিন পর আবার বসছে সংসদের অধিবেশন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি এই সংসদের সরকারি দল এবং জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দল। আর আগের চার সংসদে সরকারি দলের আসনে থাকা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) কোনো প্রতিনিধিত্বই নেই এই সংসদে।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে। এরপর সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন এবং শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হবে। শোক-প্রস্তাবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত খালেদা জিয়া ও জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে আলোচনা হবে বলে জানিয়েছেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন করবেন আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের ২০২৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন উপস্থাপন করবেন। এরপর কমিটি গঠন করবেন। পরে সংবিধান অনুযায়ী অধিবেশনে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।
সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী পূর্ববর্তী সংসদের স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের সভাপতিত্বে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। তবে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করায় এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু কারাগারে থাকায় তা হচ্ছে না। এ অবস্থায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যেকোনো সংসদ সদস্যের সভাপতিত্বে সভা শুরু হবে। এ বিষয়ে চিফ হুইপ বলেন, ‘সংসদে যেহেতু স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নেই, প্রথমে খালি চেয়ার দিয়ে শুরু করব। সংসদ নেতা সভার সভাপতিত্ব করার জন্য জ্যেষ্ঠ কোনো নেতার নাম প্রস্তাব করবেন, এরপর কোনো একজন সমর্থন করবেন এবং তিনিই সভার সভাপতিত্ব করবেন। সেখানে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করব।’
স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার চূড়ান্ত করার ভার প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানকে দিয়েছেন বিএনপির সংসদীয় দলের সদস্যরা। গতকাল বুধবার বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠক শেষে নূরুল ইসলাম মনি বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের জন্য আমরা সংসদ নেতাকে দায়িত্ব দিয়েছি। তিনিই সিদ্ধান্ত দেবেন। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) আমরা জানতে পারব। সংসদ উপনেতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।’
বিএনপির একাধিক এমপি আজকের পত্রিকাকে বলেন, স্পিকার হিসেবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. এম ওসমান ফারুকের নাম আলোচনায় আছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন না দিলে বিএনপির পক্ষ থেকেই ডেপুটি স্পিকার মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে ডেপুটি স্পিকার হিসেবে ভোলা-১ আসনের এমপি আন্দালিভ রহমান পার্থ, নোয়াখালী-১ আসনের এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এবং পঞ্চগড়-১ আসনের মুহম্মদ নওশাদ জমিরের নাম আলোচনায় আছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতকে ডেপুটি স্পিকার দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়ে জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘তাঁরা অনানুষ্ঠানিকভাবে আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন, যোগাযোগ করেছেন। আমরা তাঁদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা চাই জুলাই জাতীয় সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। সেটার আলোকে বিরোধী দলের যতটুকু পাওনা ততটুকু চাই, এর বেশি চাই না। ওই প্রস্তাবেই আছে একজন ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবেন, আমরা খণ্ডিত আকারে এটা চাচ্ছি না। আমরা চাই প্যাকেজ। সেটা গ্রহণ হোক, বাস্তবায়ন হোক।’
গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদের ২৯৯ আসনে নির্বাচন হয়। আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় চট্টগ্রাম-২ ও ৪ আসন বাদে ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট ২১২, জামায়াত জোট ৭৭, স্বতন্ত্র ৭ এবং ইসলামী আন্দোলন ১টি আসনে বিজয়ী হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬ আসন থেকে নির্বাচিত হন। পরে তিনি বগুড়া-৬ আসন ছেড়ে দিয়েছেন। বর্তমান ২৯৬ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানসহ ২১৯ জনই প্রথমবারের মতো সংসদে এসেছেন। তাঁদের মধ্যে বিএনপির ১৪২ জন, জামায়াতের ৬১, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ২, খেলাফত মজলিস, গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং ইসলামী আন্দোলনের ১ জন করে এমপি প্রথমবারের মতো সংসদে যাচ্ছেন। বাকিরা স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।
সংসদ সদস্যদের কার্যপ্রণালি বিধি সম্পর্কে জানাতে বিএনপি ও জামায়াতের পক্ষ থেকে একাধিক কর্মশালা করা হয়েছে। এসব কর্মশালাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংসদ বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, অধিকাংশ সংসদ সদস্য নতুন হওয়ায় অধিবেশন কার্যকর হতে ছয় মাস-এক বছর সময় দিতে হবে।
চিফ হুইপ বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ সংসদে আইনমন্ত্রী উত্থাপন করবেন। এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সব দলের সদস্যদের নিয়ে একটি ‘বিশেষ কমিটি’ গঠন করা হবে। এই কমিটি নির্ধারণ করবে কোন অধ্যাদেশগুলো বহাল থাকবে আর কোনগুলো বাতিল হবে। প্রয়োজনীয় অধ্যাদেশগুলো পাস করার চেষ্টা করবেন তাঁরা।
প্রথম দিনের বৈঠকে কার্য উপদেষ্টা, প্রিভিলেজ কমিটি এবং হাউস কমিটি গঠন করা হবে বলে জানান চিফ হুইপ। রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে প্রথম দিনের অধিবেশন মুলতবি করা হবে। ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর পাঁচ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মনোনীত করা হবে। প্রথম অধিবেশন কত দিন চলবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। জাতীয় সংসদের কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠনের পর কমিটির বৈঠকে প্রথম অধিবেশনের সময়কাল ঠিক হবে।
প্রথম দিনের অধিবেশন শেষে দুই দিনের জন্য মুলতবি করা হবে। রবি ও সোমবার অধিবেশন বসে পবিত্র ঈদুল ফিতর ও স্বাধীনতা দিবসের ছুটির জন্য মুলতবি করা হবে। ২৯ মার্চ আবার অধিবেশন বসতে পারে। এরপর এপ্রিল মাসজুড়ে তা চলবে।