জ্বালানি সংকট
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ডিপোতে তেল রাখার জায়গা নেই। তেলবোঝাই জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছালেও খালাস করা যাচ্ছে না। তেলভর্তি জাহাজ ভাসছে সাগরে। অন্যদিকে বেসরকারি তেল শোধনাগারগুলোও জানাচ্ছে, তাদের ডিপোতেও তেল রাখার জায়গা নেই। তেল নেওয়ার জন্য তারা বিপিসির কাছে ধরনা দিচ্ছে। এই যখন অবস্থা, তখনো দেশজুড়ে পেট্রলপাম্পগুলোর সামনে দিনরাত যানবাহনের দীর্ঘ সারি। জ্বালানি তেলের জন্য হাহাকার চলছে দেশজুড়ে।
দেশের বেসরকারি শোধনাগারগুলোর মধ্যে অন্যতম সুপার পেট্রোকেমিক্যাল। অপরিশোধিত তেল আমদানি করে পরিশোধনের পর অকটেন ও পেট্রলের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে তারা।
বিপিসি ও জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মার্চে দেশে জ্বালানি সংকট শুরু হলে সরকার সুপার পেট্রোকেমিক্যালের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি সরবরাহ পায়নি। মার্চে কম দিয়ে এখন এপ্রিলে দেশে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পর প্রতিষ্ঠানটি বাড়তি তেল দিতে চাইছে।
এ ব্যাপারে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) প্রণব কুমার সাহা বলেন, অকটেনের একটি জাহাজ ফেব্রুয়ারিতে আসার পর বিপিসি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তেল নেয়নি। ফলে মার্চে বাধ্য হয়ে তেল সরবরাহ বন্ধ করে দেয় তারা। এখন আবার এপ্রিলে এসে তাদের কাছ থেকে তেল নেওয়া বন্ধ করেছে বিপিসি। এই অবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি এখন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।
কারণ, তাদের তিনটি ট্যাংকার উপচে পড়ছে। অথচ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে বারবার বলা হলেও তারা তেল নিচ্ছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিতরণ কোম্পানি মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহীরুল হাসান বলেন, অকটেন রাখার মতো জায়গা নেই। তাই বেসরকারি কোম্পানির কাছ থেকে তেল নেওয়া হচ্ছে অল্প অল্প করে।
জানা গেছে, ১৬ এপ্রিল বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল একটি চিঠি দেয়। চিঠিতে বলা হয়, ৫ এপ্রিল বিপিসির সঙ্গে এক সভায় সুপার পেট্রোকেমিক্যালের পক্ষ থেকে এপ্রিলে ৩৭ হাজার টন অকটেন/পেট্রল ও ৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ নেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছিল। সে অনুযায়ী পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে কোম্পানিটি। কিন্তু ৮ এপ্রিল থেকে উৎপাদন অনুযায়ী বা সরবরাহের সূচি অনুযায়ী বিপিসির কোম্পানিগুলো সরবরাহ নিতে অপারগতা জানায়। বর্তমানে পেট্রলবাহী তিনটি ট্যাংকার সরবরাহের জন্য ভাসমান অবস্থায় আছে। সীমিত মজুতব্যবস্থার কারণে পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারছে না বলেও চিঠিতে দাবি করা হয়।
চিঠিতে উৎপাদন অনুযায়ী অকটেন ও পেট্রলের সরবরাহ গ্রহণের নিশ্চয়তা দিতে অনুরোধ করা হয়। চিঠিতে আরও বলা হয়, উচ্চমূল্যে আমদানি করা কাঁচামাল থেকে অকটেন/পেট্রল উৎপাদন করে সময়মতো সরবরাহ করতে না পারলে বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে।
জানতে চাইলে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘সুপার পেট্রোকেমিক্যালের লোকজন আজকেও (সোমবার) দেখা করে গেছেন। তাঁদের পক্ষ থেকে তেল না নেওয়ার বিষয়ে কোনো অভিযোগ নেই। মার্চে বেসরকারি শোধনাগারের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সরবরাহ না পেয়ে সরকারকে তখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বেশি অর্থ খরচ করে তেল কিনতে হয়েছে। এপ্রিলে মূল্যবৃদ্ধির পর এখন পত্রপত্রিকায় এই ধরনের নিউজ আসছে। কিন্তু তাঁরা তো আমাদের কিছু বলছেন না।’
তেল নিয়ে সাগরে ভাসছে জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দর ও বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, ২৭ হাজার টন অকটেন নিয়ে একটি জাহাজ (লাইটারেজ) ভাসছে সাগরে। দুই দিন ধরে ভাসতে থাকা এই জাহাজের তেল রাখার জন্য বিপিসির ট্যাংকে জায়গা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিপিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে, ১৭-২৪ এপ্রিলের মধ্যে ১০ জাহাজের সব কটি জ্বালানি নিয়ে আসবে। এর মধ্যে গতকাল সোমবার পর্যন্ত সাত জাহাজে প্রায় আড়াই লাখ টন জ্বালানি চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছে গেছে। ছয় জাহাজে ২ লাখ ১৩ হাজার টন ডিজেল রয়েছে। এক জাহাজে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেন রয়েছে। বাকি তিনটি জাহাজে ১ লাখ ১ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ২৪ এপ্রিলের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছাবে। এর মধ্যে একটি জাহাজ ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ২১ এপ্রিল, ৩৪ হাজার টন নিয়ে ২৪ এপ্রিল এবং ৩৩ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ২৩ এপ্রিল তিনটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়বে।
বিপিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, ১৭ এপ্রিল মালয়েশিয়া থেকে ২৭ হাজার ৩৬৩ টন অকটেন নিয়ে এমটি নেভি সাইলো (মাদার ভেসেল) বন্দরের বহির্নোঙরে আসে। এর আগে ১৬ এপ্রিল এই অকটেন খালাস প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসে শুল্কায়ন সম্পন্ন হয়। গত রোববার মাদার ভেসেল থেকে এমটি সেন্ট্রাল স্টারে (লাইটারেজ) অকটেন ভরা হয়। এর পর থেকেই খালাসের অপেক্ষায় সাগরে ভাসছে অকটেনবাহী লাইটারেজটি।
এ বিষয়ে বিপিসি জিএম (বাণিজ্য ও অপারেশন) জাহিদ হোসাইন জানান, জাহাজে অকটন রয়েছে। দু-এক দিনের মধ্যেই খালাস সম্পন্ন হবে। এর বাইরে তিনি আর কোনো কথা বলতে চাননি।