চলতি বছর মার্চ মাসের তুলনায় এপ্রিল মাসে অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধার, গণপিটুনি ও মব সহিংসতা বেড়েছে। এপ্রিল মাসে মব বা গণপিটুনিতে ২১ জন নিহত হয়েছেন। গত মার্চ মাসে মবে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ১৯। চলতি মাসে মবের ঘটনা ঘটেছে ৪৯টি। আর মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৩৬। মবে আহত ব্যক্তির সংখ্যা মার্চ মাসে ছিল ৩১ জন। এপ্রিলে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৯ জনে।
অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যাও এই মাসে বেড়েছে। এপ্রিলে ৫৬টি অজ্ঞাতপরিচয় লাশ উদ্ধার হয়েছে। মার্চে এই সংখ্যা ছিল ৫৩। মানবাধিকার সংগঠন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) এপ্রিল মাসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। আজ বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অজ্ঞাতনামা লাশ উদ্ধারের সংখ্যা বৃদ্ধি, গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিস্তার—আইনের শাসনের দুর্বলতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। সীমান্ত এলাকায় হতাহতের ঘটনা, অপহরণ ও নির্যাতন এবং পার্বত্য অঞ্চলে মাইন বিস্ফোরণের ঘটনাও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই সচিবালয়ে গিয়ে মব কালচার (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ আক্রমণের সংস্কৃতি) পুরোপুরি বন্ধ করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এটা চলতি বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনা। ওই দিন সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে প্রথম কর্মদিবসে তিনি বলেন, ‘মব কালচার শেষ। দাবি আদায়ের নামে মব কালচার করা যাবে না। তবে যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য মিছিল ও সমাবেশ করা যাবে, স্মারকলিপিও দেওয়া যাবে। আমরা গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে চাই।’
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাও আগের মাসের তুলনায় বেড়েছে। এপ্রিল মাসে ৩১২টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এই সংখ্যা গত মাসের তুলনায় ২৩টি বেশি। এই মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৫৪টি, দলবদ্ধ ধর্ষণ ১৪টি, ধর্ষণ ও হত্যা একটি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ছয়জন প্রতিবন্ধী কিশোরী ও নারী। ধর্ষণের শিকার ৫৪ জনের মধ্যে ১৮টি শিশু ও ১৪ জন কিশোরী রয়েছে, অন্যদিকে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে এক শিশু, ৪ কিশোরী ও ৯ জন নারী এবং ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়েছে এক কিশোর ও একজন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা ২৩টি, যৌন হয়রানি ১৭টি, শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৬৮টি। অ্যাসিড নিক্ষেপে আক্রান্ত হয়েছেন একজন নারী।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিল মাসে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র ছিল অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত এবং এমএসএফ কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী এপ্রিল মাসে ২৭টি ঘটনায় ৪৬ জন সাংবাদিক দেশের বিভিন্ন জেলায় পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় নানাভাবে হামলা, আইনি হয়রানি, হুমকি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
এমএসএফের প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এপ্রিল মাসে রাজনৈতিক সহিংসতা কমেছে। মার্চে রাজনৈতিক সহিংসতায় আহত ছিল ৩৯০ ও নিহত ১৪ জন। এপ্রিল মাসে তা কমে যথাক্রমে ৩০৩ ও ৩ হয়েছে। এপ্রিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নির্যাতনের দুটি ঘটনায় পাঁচজন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। কারা হেফাজতে মৃত্যু হয়েছে ছয়জনের। এই মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) গুলিতে একজন নিহত ও একজন আহত হয়েছেন। ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ছয়টি।
এমএসএফ মনে করে, মার্চের চেয়ে এপ্রিল মাসে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে কিছু ক্ষেত্রে উন্নতির আভাস থাকলেও বেশ কিছু ক্ষেত্রে অবনতি বা নতুন ঝুঁকি স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা কিছুটা কমলেও নারী ও শিশু নির্যাতন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা এবং ডিজিটাল আইনের নিবর্তনমূলক ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।