হাওর এলাকায় বজ্রপাতে প্রাণহানি ঠেকাতে আশ্রয় কেন্দ্র ও বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপনের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। এ নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে সুনামগঞ্জের হাওরে বিয়ে করা নিয়ে রসিকতা করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
আজ সোমবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ অনুযায়ী সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুলের জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশের ওপর আলোচনায় এ ঘটনা ঘটে। বজ্রপাতজনিত ক্ষতি মোকাবিলায় সঠিক গবেষণা ও বিজ্ঞানভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান কামরুজ্জামান।
তাঁর নোটিশের জবাব দেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। মন্ত্রীর বক্তব্য শেষে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এত বজ্র সুনামগঞ্জে, এত বজ্রপাত হয় জানলে তো বিয়েই করতাম না ওখানে।’
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বজ্রপাত ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে হাওর অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলে প্রায়ই বজ্রপাতে প্রাণহানি ঘটছে।’
বজ্রপাতকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘হাওর অঞ্চলসহ দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলে বজ্রপাতের তীব্রতা ও ঘনত্ব তুলনামূলক বেশি হওয়ায় সরকার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘বজ্রপাতজনিত প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়েছে। প্রথমত সচেতনতা বাড়াতে হবে। বজ্রপাত ভূমিকম্পের মতো একেবারে আগাম বার্তা ছাড়া ঘটে। আকাশে ঘন মেঘ জমলে মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে গেলে প্রাণহানি কমবে।’
এ জন্য হাওরাঞ্চলে সাইরেনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘মাঠে কাজ করা কৃষকেরা যাতে সময়মতো নিরাপদ স্থানে যেতে পারেন, সে ব্যবস্থা করতে চায় সরকার।’
প্রাকৃতিকভাবে ঝুঁকি কমাতে তালগাছ রোপণের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘সেটি খুব বেশি এগোয়নি। তবে তালগাছ রোপণ কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে বলে সরকার মনে করে। তিনি বলেন, বজ্রপাত হলে টাওয়ার বসিয়ে তা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে টিআর প্রকল্প থেকে কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। তবে তা খুব বেশি কার্যকর হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা সাম্প্রতিক সময়ে এটি নিয়ে গবেষণা করেছি। যাতে অধিক মাত্রায় এবং শক্তিশালী নিরোধক স্থাপনের মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের প্রাণহানি না ঘটে, সে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’
বজ্রপাতে মানুষের পাশাপাশি গবাদিপশুও মারা যায় উল্লেখ করে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে এ ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা ছিল না। কৃষক যখন গবাদিপশু হারিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে যান, তখন তাঁকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার জন্য নীতিমালা সংশোধন করা হয়েছে।’
সরকার বজ্রপাতজনিত ক্ষয়ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘হাওর অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।’
মন্ত্রীর বক্তব্যের পর কামরুজ্জামান কামরুল বলেন, ‘নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৭ সালে এই অঞ্চলকে বজ্রপাতের কেন্দ্রস্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গতকালও বজ্রপাতে আটজনের মৃত্যু হয়েছে। মার্চ থেকে মে মাসে বজ্রপাত বেশি হয়। ওই সময়ই হাওরে সবচেয়ে বেশি কাজ থাকে, কারণ মানুষের জীবিকা হাওরনির্ভর।’
সাইরেনের ব্যবস্থা যথেষ্ট হবে না মন্তব্য করে কামরুজ্জামান বলেন, ‘একেকটি হাওরের দূরত্ব ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার। তাই সাইরেন দিয়ে সমাধান হবে বলে তিনি মনে করেন না। তিনি বলেন, হাওরে আশ্রয় কেন্দ্র করা যেতে পারে, বজ্রনিরোধক দণ্ড বসানো যেতে পারে। মানুষ হাওরে গেলে যাতে সহজলভ্য কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা পায়, সে ধরনের বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে।’
জবাবে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘আশ্রয় কেন্দ্রের প্রস্তাবটি ভালো। সরকার বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র ও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্র করে থাকে, যা সাধারণত বহুমুখী কাজে ব্যবহার হয়। সারা বছর শিক্ষা কার্যক্রম চলে, দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয় নেয়। হাওর ও উত্তরাঞ্চলে শক্তিশালী বজ্রনিরোধক যন্ত্র স্থাপন করা গেলে প্রাণহানির ঝুঁকি কমবে।’
আলোচনায় গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের সংসদ অধ্যাপক মাজেদুর রহমান সদস্য বলেন, তাঁর উপজেলার ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়নে গতকাল বজ্রপাতে একই পরিবারের তিনজন মারা গেছেন। একই ঘটনায় দুটি গরুও মারা গেছে।
উল্লেখ্য, গতকাল রোববার দেশের আট জেলায় কালবৈশাখীর সঙ্গে বজ্রপাতে ১৫ জন নিহত হয়েছেন। রোববার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পঞ্চগড়, জামালপুর, নাটোর, ঠাকুরগাঁও ও শেরপুরে এসব ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে উত্তরাঞ্চলের ছয় জেলায় ১২ জন নিহত হয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি (৫ জন) ঘটেছে গাইবান্ধায়। সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুরে দুজন করে নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া বগুড়ায় একজন, পঞ্চগড়ে একজন, নাটোরে একজন ও শেরপুরে একজন নিহত হয়েছেন।
আজ সোমবার এখন পর্যন্ত নেত্রকোনায় বজ্রপাতে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।