ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর বিদেশে আশ্রয় নেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঘনিষ্ঠজনেরা দেশে থাকা সম্পদ নিয়ে নতুন করে তৎপর হয়ে উঠেছেন। বিদেশে বসেই তাঁরা বিভিন্ন বাংলাদেশ মিশনে আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) জমা দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে দেশে থাকা তাঁদের প্রতিনিধিদের সম্পত্তি দেখভাল, বিক্রি ও মালিকানা হস্তান্তরের ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র বলছে, এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক আমমোক্তারনামা জমা পড়েছে। আবেদনকারীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, রাষ্ট্রদূত, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, অভিনয়শিল্পী, আইনজীবী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, হত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা বা তদন্ত চলছে।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর সেই সরকারের মন্ত্রী, নেতা-কর্মী, সামরিক ও বেসামরিক সুবিধাভোগীদের অনেকেই পরিবারসহ বিদেশে আশ্রয় নেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনগুলোতে এসব আমমোক্তারনামা জমা পড়া শুরু হয়। শুরুতে আবেদন সংখ্যা সীমিত থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ও প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি। আর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত সচিব (জনকূটনীতি) শহীদুল করীম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। তাঁদের অনেকেই সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দ্বৈত নাগরিক।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণায়ের নথিপত্র বলছে, আমমোক্তারনামা আবেদনের তালিকায় উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে রয়েছেন আলোচিত ব্যবসায়ী সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আজিজ খান, আঞ্জুমান আজিজ খান, আয়েশা আজিজ খন্দকার, আজিজা আজিজ খান, আদিবা আজিজ খান, মোহাম্মদ ফরিদ খান ও মোহাম্মদ ফয়সাল করিম খান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা প্রয়াত এইচ টি ইমামের মেয়ে নুসরাত আহমেদ, নিহাদ আহমেদ ও তাহসিন ইমাম। পদ্মা ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের মালিক চৌধুরী নাফিস সরাফাত এবং তাঁর স্ত্রী আঞ্জুমান আরা শহিদ, ছেলে রাহিব সাফওয়ান সরাফত চৌধুরী, রেস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসান তাহের ইমাম। সাবেক হাইকমিশনার সৈয়দা মুনা তাসনিমের স্বামী তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরী ও পরিবারের অন্য সদস্য চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরীর ছেলে সাফায়েত আহমেদ চৌধুরী দীপ্ত, তৌহিদুল ইসলাম চৌধুরীর ছেলে জাবেদ আপগেনহাফেন। আরও আছেন ছাগলকাণ্ডে গ্রেপ্তার বিতর্কিত রাজস্ব কর্মকর্তা মতিউর রহমানের কানাডাপ্রবাসী মেয়ে ফারজানা রহমান ইপ্সিতা।
নথি পর্যালোচনায় জানা যায়, এ তালিকায় আরও রয়েছেন সাবেক ডিজিএফআইয়ের প্রধান লে. জে. (অব) মোল্লা ফজলে আকবর, আওয়ামী লীগ নেতা রাশেক রহমান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব শফিউল আলম, ইডিসিএলের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. এহসানুল কবির জগলুল এবং তাঁর ভাই মাহবুবুল কবির ও তারিকুল কবির, পুলিশের উপ-মহাপরিদর্শক মো. আবদুল বাতেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল কাহার আকন্দ।
আরও রয়েছেন সিলভিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মজিবুর রহমান মিলন, সাবেক সংসদ সদস্য মো. ওয়াকিল উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য আবু জাফর মোহাম্মদ শফি উদ্দিন, সাবেক সংসদ সদস্য সুবর্ণা মুস্তাফার স্বামী বদরুল আনাম সৌদ, ১১ কোটি বাংলাদেশির তথ্য বিক্রির অভিযোগে অভিযুক্ত ডিজিকন গ্লোবাল সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক ওয়াহিদুর রহমান শরিফ, প্রতীক গ্রুপের চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ ফারুকী হাসান ও তাঁর মেয়ে ফারজানা হাসান এবং তাঁর স্ত্রী নাসিমা আক্তার; জেনেক্স ইনফোসিস লিমিটেডের চেয়ারম্যান চৌধুরী ফজলে ইমাম।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, অধিকাংশ আবেদনেই প্রতিনিধিদের সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, বিক্রি, হস্তান্তর ও বিনিময়ের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে এসব আমমোক্তারনামা কার্যকর হলে দেশে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ নগদায়ন কিংবা মালিকানা পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এর মাধ্যমে নতুন করে অর্থ বিদেশে পাচারের ঝুঁকিও সৃষ্টি হতে পারে।
জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপপরিচালক আকতারুল ইসলাম বলেন, দুদক আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ আদালতের আদেশে অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) বা জব্দ (অ্যাটাচমেন্ট) করা হলে আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত ওই সম্পদ নিয়ে কোনো ধরনের লেনদেন, হস্তান্তর বা অন্য কোনো সুবিধা গ্রহণের সুযোগ থাকে না। আদালতের নির্দেশনাই এ ক্ষেত্রে চূড়ান্তভাবে কার্যকর হবে।
তবে বিদেশে অর্থ পাচার প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সরকার। সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং দুর্নীতি দমন কমিশনে এ-সংক্রান্ত একটি চিঠি পাঠিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। চিঠিতে বলা হয়েছে, বিগত সময়ে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, এমনকি দেশে এ সম্পর্কিত চলমান বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বিদেশে অবস্থান করে অবৈধ পন্থায় অর্জিত অর্থসম্পদ বিদেশে পাচারের অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন। তাঁদের অনেকেরই বিদেশে থাকা বাংলাদেশ মিশনগুলোতে উপস্থিত হয়ে আমমোক্তারনামার মাধ্যমে তাঁদের দেশে থাকা সম্পত্তি ও অর্থ হস্তান্তরের চেষ্টা করছে।
ওই চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত এবং দেশে এ সম্পর্কিত চলমান বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের একটি হালনাগাদ তালিকা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিদেশে বাংলাদেশ মিশনগুলোর কাছে থাকা প্রয়োজন। এ কারণে এ-সংক্রান্ত চলমান কোনো মামলায় বিচারাধীন ব্যক্তিদের একটি হালনাগাদ তালিকা অনতিবিলম্বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানোর অনুরোধ করা হলো।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সর্বশেষ রায়ের আলোকে কোনো ফেরারি ব্যক্তি আইনের বিশেষ সুরক্ষা বা সুবিধা দাবি করতে পারেন না। এ বিষয়ে সরকারের কোনো কর্তৃপক্ষ মতামত চাইলে আইন কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে একই অবস্থান তুলে ধরা হবে।