বিগত সময়ে স্বাস্থ্য খাতের বিপর্যয়, ভুল নীতি ও হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের কারণে দেশের অর্থনৈতিক খাত সম্পূর্ণভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, দেশের উৎপাদন ও বিনিয়োগ প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছিল, পুঁজিবাজারে সর্বস্ব হারিয়ে সাধারণ মানুষ আত্মহত্যা করেছিল এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছিল। একই সঙ্গে বিগত সরকারের নেওয়া কয়েকটি ‘ভ্যানিটি প্রজেক্ট’ বা অহেতুক প্রকল্পের জন্য নেওয়া দেশি-বিদেশি ঋণ এখন জাতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আজ সোমবার (২৯ জুন) জাতীয় সংসদে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
বিরোধী দলের নেতার বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের অর্থনৈতিক সংকটকে অস্বীকার করতে চায় না। তবে সংকটকে কোনো অজুহাত হিসেবেও ব্যবহার করা হবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর নীতির মাধ্যমে এই সংকট সফলভাবে মোকাবিলা করা হবে।
সরকারের যাত্রালগ্ন থেকেই রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সংকটের কারণে যে বড় চাপ তৈরি হয়েছিল, দেশের সাধারণ মানুষও তা উপলব্ধি করেছে। এমন একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি ও বহুমুখী সংকটকে সামনে রেখেই এবারের বাজেট প্রণয়ন করতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারি এক অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষ সরকারকে যে পবিত্র দায়িত্ব দিয়েছে, তা রক্ষা করতে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের মূল দর্শন হলো—‘সবার আগে বাংলাদেশ’ ও ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’।
‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’—শিরোনামে উপস্থাপিত এবারের বাজেটকে শুধু বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং অর্থনীতিকে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর রূপকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটের অন্যতম লক্ষ্য হলো অর্থনীতিকে মুষ্টিমেয় সুবিধাভোগীদের কবল থেকে বের করে এনে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ ও উৎপাদনের চাকা সচল ও গতিশীল করতে উন্নয়ন ব্যয় ৫০ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
সরকারি বিনিয়োগ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো, সেটিই বড় বিষয় নয়; বরং সেই প্রকল্প মানুষের জীবনে কী ভূমিকা রাখবে এবং কতটা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, সেটিই সরকারের মূল বিবেচনা।
অর্থনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নে সরকারের তিনটি ধাপের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রথম ধাপে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংকিং খাতের পুনর্গঠন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ করা হবে। আর চূড়ান্ত ধাপে উৎপাদনশীল, উদ্ভাবননির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতির ভিত সুদৃঢ় করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়লেই প্রকৃত উন্নয়ন হয় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই হয়, যখন সাধারণ মানুষের ঘরে স্বস্তি আসে এবং তরুণেরা তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পান।
তারেক রহমান বলেন, ঋণনির্ভর নয়, বরং উৎপাদন ও বিনিয়োগনির্ভর এমন একটি বাংলাদেশ গড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যেখানে চাকরির জন্য তরুণদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হবে না, বরং তাঁরা নিজেরাই নিজেদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবেন। দেশীয় শিল্পের বিকাশ, রুগ্ন শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবিত করা এবং নতুন শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে একটি রপ্তানিমুখী ও উদ্ভাবননির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।