দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ সারচার্জের চাপে থাকা দেশের এয়ারলাইনসগুলোর জন্য অবশেষে বড় ধরনের স্বস্তির খবর এল। সরকার দেশের সাতটি বিমানবন্দরে ল্যান্ডিং, এয়ার ন্যাভিগেশন, পার্কিং, এম্বারকেশনসহ বিভিন্ন খাতে আরোপিত বার্ষিক সারচার্জ ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ নির্ধারণ করেছে।
সম্প্রতি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক গেজেটে এই সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির পক্ষে গেজেটটি জারি করেন মন্ত্রণালয়ের সচিব নাসরিন জাহান।
বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, এয়ারলাইনসগুলো বিল বকেয়ার ৩০ দিনের মধ্যে পরিশোধ করলে কোনো অতিরিক্ত চার্জ দিতে হবে না। তবে ৩১ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে বিল পরিশোধ না হলে বকেয়া বিলের ওপর ১ শতাংশ, ৬১ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ১ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ১২০ দিন অতিক্রান্ত হলে পরবর্তী প্রতিটি ১২০ দিন বা তার অংশের জন্য ৬ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করা হবে।
এই সিদ্ধান্তটি এসেছে বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোর প্ল্যাটফর্ম অ্যাভিয়েশন অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এওএবি) দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে। সংগঠনটি এয়ারলাইনসগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বার্ষিক সারচার্জ ৭২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশে নামানোর দাবি জানিয়ে আসছিল।
এর ফলে আগে যেখানে মাসিক ৬ শতাংশ হিসাবে কার্যত বছরে ৭২ শতাংশ সারচার্জ দিতে হতো, সেখানে নতুন নিয়মে বার্ষিক সর্বোচ্চ সারচার্জ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে এয়ারলাইনসগুলোর দীর্ঘদিনের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে।
প্রসঙ্গত, আগের নিয়মে প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশে সারচার্জের হার ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি। ভারতের ক্ষেত্রে এই হার ১২ থেকে ১৮ শতাংশ, সিঙ্গাপুরে ৮ শতাংশ, ওমানে ১০ শতাংশ এবং পাকিস্তানে মাত্র ২ শতাংশ।
বেসরকারি এয়ারলাইনস নভোএয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান বলেন, ‘আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতেই দীর্ঘদিন ধরে এই হার কমানোর দাবি জানানো হচ্ছিল। অবশেষে সরকারের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এসেছে। এতে দেশের বিমানশিল্প টিকে থাকার সুযোগ পাবে।’
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাবেক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য কাজী ওয়াহিদুল আলম আজকের পত্রিকাকে বলেন, শুধু বেবিচকের বকেয়া পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই অন্তত তিন থেকে চারটি এয়ারলাইনস কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছে।
জানা গেছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছে দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর মোট বকেয়া দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৩৫১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ শতাংশই সারচার্জ ও বিলম্ব ফি।
এওএবির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বন্ধ থাকা জিএমজি এয়ারলাইনসের কাছে বেবিচকের পাওনা ৩৬৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল দেনা মাত্র ৫৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, আর বাকি ৩১১ কোটি ৩০ লাখ টাকা সারচার্জ ও অন্যান্য চার্জ।
একইভাবে, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের মোট বকেয়া ৩৫৫ কোটি ৩৭ লাখ টাকা—যার মধ্যে মূল টাকা ৫৬ কোটি ৮৮ লাখ এবং জমাকৃত সারচার্জ ২৯৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
রিজেন্ট এয়ারের বকেয়া ২৮৩ কোটি ৩৮ লাখ টাকা; এর মধ্যে মূল দেনা ১৩৬ কোটি ১৮ লাখ এবং বাকি ১৪৭ কোটি ২০ লাখ টাকা বিলম্ব ফি।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সিদ্ধান্তের সুফল যাত্রীরাও পাবেন। বর্তমানে দেশে মাত্র তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনস—ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নোভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রো—পরিচালনায় রয়েছে। নতুন এয়ারলাইনস বাজারে এলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং টিকিটের দামও কমতে পারে।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম বলেন, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়ার সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সারচার্জের এই ‘কালো আইন’ দেখে বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। নতুন সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হলো।