জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। আজ মঙ্গলবার (স্থানীয় সময়) জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছেন তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মর্যাদাপূর্ণ এই পদের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেজ কাকাউরিস। গোপন ব্যালটে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর ভোটাভুটি হয়।
সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় ড. খলিলুর রহমান পরিষদের বর্তমান (৮০তম) অধিবেশনের সভাপতি জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ভোটাভুটিতে জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ড. খলিলুর রহমান ৯৯ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের প্রার্থী পেয়েছেন ৯১ ভোট।
এই সাফল্যের প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিষয়টি স্মরণ করেছেন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সাহসী ও দূরদর্শী নেতৃত্বে সীমিত সময়ে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সে সময় বাংলাদেশ তৎকালীন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী জাপানকে পরাজিত করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সময়ের সীমাবদ্ধতা। মাত্র তিন মাস সময় হাতে পেয়ে বাংলাদেশকে এমন এক বৈশ্বিক কূটনৈতিক প্রচারণা চালাতে হয়েছে, যা সাধারণত কয়েক বছরের প্রস্তুতি ও ধারাবাহিক যোগাযোগের মাধ্যমে সম্ভব হয়।
বাংলাদেশ ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করলেও ২০২৬ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানকে দেশের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এর পর থেকে পূর্ণমাত্রার কূটনৈতিক প্রচারণা শুরু হয়। দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির সুযোগ না থাকায় এই স্বল্প সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ ও বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক ফোরামে অত্যন্ত সক্রিয় এবং কৌশলগত প্রচারণা চালিয়ে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনে সফল হয়েছে।
এই প্রচারণায় নেতৃত্ব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। পাশাপাশি নিউইয়র্কে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনগুলো সমর্থন আদায়ে সমন্বিত ও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
অপর দিকে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাস ২০১৬ সালেই তাদের প্রার্থিতা ঘোষণা করে এবং গত এক দশক ধরে ধারাবাহিক প্রচারণা চালিয়েছে। বিশেষ করে, গত এক বছরে দেশটি অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুসংগঠিত কূটনৈতিক প্রচারণা পরিচালনা করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রার্থীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা এ বিজয়ে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল জাতিসংঘের সদর দপ্তরে গত ১৩ মে অনুষ্ঠিত ড. খলিলুর রহমানের ইন্টারঅ্যাকটিভ ডায়ালগ। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বর্তমান সভাপতি আনালেনা বায়েরবকের সভাপতিত্বে প্রায় আড়াই ঘণ্টার ওই সংলাপে বাংলাদেশের প্রার্থী ড. খলিলুর রহমান তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন এবং নির্বাচিত হলে সাধারণ পরিষদ পরিচালনায় তাঁর অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। কূটনৈতিক মহলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সংলাপ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এই সংলাপের পর বাংলাদেশের পক্ষে প্রায় ৩০টি দেশ সমর্থন ব্যক্ত করে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের প্রচারণায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে কার্যকর বহুপাক্ষিকতা, জাতিসংঘের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, উন্নয়নশীল দেশসমূহের স্বার্থ সংরক্ষণ, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বাস্তবায়ন, শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অবদান এবং বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করার বিষয়গুলো। বাংলাদেশের প্রচারণা ছিল বিষয়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে, যেখানে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমশ বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশ সংলাপ, সহযোগিতা এবং ঐকমত্যভিত্তিক কূটনীতির ওপর জোর দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘রেসিপ্রোক্যাল সাপোর্ট অ্যারেঞ্জমেন্টের’ (একে অপরকে ভোট দিতে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতামূলক চুক্তি) মাধ্যমে বাংলাদেশ আগেই জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে ৬০টির বেশি সদস্যের সমর্থন আদায় করতে পেরেছিল।
পালাক্রমে আঞ্চলিক দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি অনুযায়ী, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপের জন্য নির্ধারিত। বাংলাদেশ ও সাইপ্রাস একই গ্রুপ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, যদিও সাইপ্রাস ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ ও এর বিভিন্ন কমিটিতে নির্বাচন এবং প্রতিনিধিত্বের সুবিধার্থে সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপে বিভক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো—আফ্রিকান গ্রুপ, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপ, পূর্ব ইউরোপীয় গ্রুপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় গ্রুপ এবং পশ্চিম ইউরোপীয় ও অন্যান্য গ্রুপ।
পাঁচটি আঞ্চলিক গ্রুপের মধ্যে আফ্রিকান ও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় গ্রুপে ভোটের সংখ্যা বেশি। মাত্র তিন মাসের প্রচারণায় বাংলাদেশ নানা কূটনৈতিক কৌশলে আফ্রিকান ভোট টানার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোর ভোট পেতে চীনের সমর্থনও চেয়েছিল বাংলাদেশ। এ ছাড়া পূর্ব ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় এবং পশ্চিম ইউরোপীয় গ্রুপ থেকেও ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ। পূর্ব ইউরোপীয় গ্রুপ থেকেও কিছু ভোট এসেছে।
চলতি বছরের একদম শুরুর দিকে এশিয়া-প্যাসিফিক গ্রুপ থেকে বাংলাদেশের প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনকে এই পদের জন্য প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছিল সরকার। এরপর গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থী করা হয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানকে। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর ৮১তম অধিবেশন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে এবং ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের ভাষণের মধ্য দিয়ে শুরু হবে উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক।
এর আগে বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের স্পিকার প্রয়াত হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯৮৬ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।