ডেঙ্গুর আতঙ্ক কমলেও মশা এখন রাজধানী ঢাকার অধিকাংশ এলাকার দিনরাতের যন্ত্রণা। গত জানুয়ারির চেয়ে ফেব্রুয়ারিতে মশা বেড়েছে ৪০ শতাংশের বেশি। এর ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। চলতি মার্চ মাসে মশার বিস্তার আরও বাড়তে পারে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সিটি করপোরেশনের মশা মারায় নিষ্ক্রিয়তা, কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়া এবং আবহাওয়াজনিত কারণে মশার এই ব্যাপক বিস্তার। ঘরে-বাইরে সর্বত্র মশার উৎপাত। রাজধানীর মতো সারা দেশেই একই অবস্থা।
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নবনিযুক্ত প্রশাসকেরা মশকনিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন।
সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, জানুয়ারির তুলনায় ফেব্রুয়ারিতে মশার সংখ্যা ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বর্ধিত মশার ৯০ শতাংশই কিউলেক্স। চলতি মাসে মশা আরও বাড়তে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগ এই গবেষণা করেছে।
গবেষকেরা বলছেন, এবার শীতের মাত্রা কম হওয়া, নর্দমা ও জলাশয়ের দূষণ নিয়ন্ত্রণ না করা এবং ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে জনপ্রতিনিধি না থাকায় মশকনিধনে নিষ্ক্রিয়তা—এই তিন কারণে মশা বেড়েছে।
এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার। তিনি জানান, লার্ভা পরীক্ষা করতে বিভিন্ন জলাশয় থেকে ২৫০ মিলিলিটার পানি তুলে তাতে লার্ভার সংখ্যা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় সংগৃহীত পানিতে গড়ে ৮৫০টি লার্ভা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারিতে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় গড়ে ১ হাজার ২৫০-এ। প্রাপ্তবয়স্ক মশার উপস্থিতি যাচাইয়ের জন্য একজন মানুষের পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটু পর্যন্ত ও বাহু উন্মুক্ত রেখে এক ঘণ্টায় কতটি মশা কামড়াতে আসে, তা গণনা করা হয়। জানুয়ারিতে এর সংখ্যা ছিল ৪০০ থেকে সর্বোচ্চ ৬০০। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গড়ে ৮৫০।
এই গবেষণাতেই বোঝা যায় রাজধানীতে মশা কী পরিমাণ বেড়েছে। গত মঙ্গলবার বিকেলে নন্দীপাড়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, দিনরাত সর্বক্ষণ মশার যন্ত্রণায় অস্থির থাকতে হয়। কয়েল, অ্যারোসল কোনো কিছু দিয়েই মশা দূর করা যাচ্ছে না।
বাসাবোর বাসিন্দা শামসুল ইসলাম সুজন জানান, তাঁর বাসা নয়তলায়। তারপরও মশার উৎপাত থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। অফিস শেষে বাসায় ফিরে এক ঘণ্টা ব্যাট দিয়ে মশা মারতে হয়। তাঁর প্রশ্ন, নয়তলায় কীভাবে এত মশা ওঠে?
সিটি করপোরেশনের তৎপরতায় রাজধানীর অভিজাত এলাকাগুলোতে মশার উপদ্রব কিছুটা কম। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত ও বস্তি এলাকাগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত মশায় জীবন দুঃসহ হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ এসব এলাকার বাসিন্দাদের। গুলশানের কড়াইল বস্তি এলাকার সিতারা খাতুন বলেন, রাতে মশারি টানানো ছাড়া ঘরে বসা যায় না। বাইরে বসলেও কয়েল, ধোঁয়া দিতে হয়।
বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওষুধ দিয়ে ও ফগিং করেও মশার পরিমাণ কমছে না। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার ওষুধ ছিটানোর পরও মশা না কমার কারণ সম্পর্কে আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘যে ফগিং করা হয়, তাতে আসলে কাজ হয় না। তবে লার্ভিসাইডিংয়ে কাজ করে। ফগিং না করে লার্ভিসাইডিং বাড়ানো উচিত।’ কিউলেক্স মশার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না থাকলে ড্রেনের পানি ঘন হয়ে যায়, এতে অনেক সময় ড্রেন আটকে যায়। সেখানে প্রচুর কিউলেক্স মশার জন্ম হয়। পরবর্তী সময়ে যখন তাপমাত্রা বাড়ে, তখন এই মশা আরও বৃদ্ধি পায়। চলতি বছর তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় কিউলেক্সের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আবর্জনা, বদ্ধ জলাশয় ও নর্দমা নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় কিউলেক্সের পরিমাণ বেড়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নবনিযুক্ত প্রশাসক আবদুস সালাম ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নবনিযুক্ত প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান গত মঙ্গলবার দায়িত্ব নিয়েই মশার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেছেন।
নতুন প্রশাসকেরা দায়িত্ব নেওয়ার পর সিটি করপোরেশন বিভিন্ন এলাকায় মশার ওষুধ ছিটাচ্ছে। মশার লার্ভা ধ্বংস, ফগিং, খাল-নালা পরিষ্কারসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। সিটি করপোরেশনের সূত্র বলেছে, সূচি অনুযায়ী রমজান মাসে বেলা ৩টা থেকে ইফতারের আগপর্যন্ত প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বেচ্ছাসেবীরা মশকনিধনে কাজ করছেন।
ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. জোবায়ের হোসেন আজকের পত্রিকাকে জানান, মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণে প্রতিদিন তিনবার ওষুধ প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ডিএনসিসি। এ ছাড়া গঠন করা হয়েছে বিশেষ কুইক রেসপন্স টিম। তিনি বলেন, মশার লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালিত হবে এবং বিকেল ও সন্ধ্যার পাশাপাশি বিশেষ অঞ্চলগুলোতে রাতে ফগিং করা হবে। এ ছাড়া হটস্পটগুলোতে বিশেষ অভিযান ও কিউলেক্স মশার জন্মস্থান নালা-নর্দমা, সুয়ারেজ লাইন, জলাশয়, খাল-বিলের হালনাগাদ তালিকা প্রস্তুত করে ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
মশকনিধন কার্যক্রমে কোনো ধরনের শিথিলতা প্রদর্শন করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ডিএসসিসির প্রশাসক আবদুস সালাম। তিনি মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছেন। ঘোষণা করেছেন মাসব্যাপী বিশেষ পরিচ্ছন্নতা ও ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। এ কার্যক্রম তদারকিতে ১০টি টিমও গঠন করা হয়েছে।
সামগ্রিক বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ১০টি অঞ্চলে ১০টি টিমকে তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে চিরুনি অভিযানের মতো চালানো হবে। মশার অনেক হটস্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। কিউলেক্স মশার বৃদ্ধির কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি কিউলেক্স মশা বৃদ্ধির সময়। এ সময় অনেক বেশি ফুলের চাষ হয়, তাই তারা বেশি পুষ্টি পায়। তাই এই সময় কিউলেক্স মশা বাড়ে। বর্ষা মৌসুম এলে এডিসের পরিমাণ বাড়বে।