সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর মাত্র চার মাসে দেশের ঋণের বোঝা আরও ১ লাখ কোটি টাকার বেশি বেড়েছে বলে দাবি করেছেন রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন। তাঁর অভিযোগ, অর্থনৈতিক সংস্কারের অভাব, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং নীতিগত দুর্বলতার কারণে দেশের অর্থনীতি ক্রমেই ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে আখতার হোসেন এসব কথা বলেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেছেন, ‘আমরা যদি সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারি, গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে না পারি, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারি, আইএমএফের কাছ থেকে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে যেমন করে ফিরে আসতে হয়েছিল, সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে সরকারি দলকেও জনগণের কাছ থেকে ফিরে আসতে হবে।’ বাজেট বাস্তবায়নের সময় অবশ্যই জনগণের রায়, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে সঠিক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আখতার হোসেন বলেন, ‘অর্থমন্ত্রীর ২৩৪ পৃষ্ঠার বক্তব্যের মধ্যে দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় তিনি বলেছেন, অর্থনৈতিক যে বিপর্যয় চলছে, সোশ্যাল ফ্যাব্রিকে যে ক্ষতি হয়েছে, এখান থেকে যদি আমরা পুষিয়ে উঠতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের রাজনৈতিক সংস্কার করতে হবে। সেই রাজনৈতিক সংস্কার কি আমরা সরকারি দলের মধ্যে দেখতে পাই?’
আখতার হোসেন বলেন, ‘জনগণ গণভোটের রায় দিয়েছে। জনগণ সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য রায় দিয়েছে। এখন পর্যন্ত সরকারি দল সংবিধান সংস্কার পরিষদের কথা বলছে না। জনগণ স্বাধীন বিচার বিভাগের জন্য রায় দিয়েছে, এখন পর্যন্ত সরকার দল সে বিষয়ে কিছু বলছে না।’
অর্থনৈতিক সংস্কার না হওয়ায় আইএমএফ ঋণ দেয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইএমএফ চেয়েছে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতগুলোতেও একটা বড় ধরনের সংস্কার আসুক। অর্থনৈতিক খাতগুলোতে কোনো ধরনের সংস্কার হচ্ছে না। অর্থনৈতিক বিষয়গুলোতে কোনো ধরনের সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি সরকার ইতিবাচক না।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘এত দিনে এনবিআরের রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ আলাদা করার কথা সরকার বলছে। কিন্তু এই বিষয়টা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অধ্যাদেশ পাস করা হয়। সেই অধ্যাদেশ এই সংসদে প্রেজেন্ট (উত্থাপন) করা হয়। কিন্তু সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে সেই অধ্যাদেশটাকে কিন্তু ল্যাপস করে দিয়েছে। সে অধ্যাদেশটাকে কার্যকর করতে দেয়নি। সরকার সেই সময়টাতে যদি সংস্কারের বিষয়গুলোকে মেনে নিত, আর্থিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার হয়ে যেত, সে ক্ষেত্রে হয়তো বিদেশে গিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে খালি হাতে ফিরে আসতে হতো না।’
ব্যাংকিং খাত সম্পর্কে আখতার হোসেন বলেন, ‘ব্যাংক খাতে একধরনের অরাজকতা চলছে। শুধু ইসলামী ব্যাংকের বিষয়ে বলব না, আরও পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলো আগের মালিকদের কাছে আবারও বহাল হতে পারে, এমন ধরনের আইন (ব্যাংক রেজল্যুশন আইন) এখানে পাস করা হয়েছে। এই আইনের ১৮ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ব্যাংকের মালিক যাঁরা আছেন, তাঁরা যদি ৭.৫ শতাংশ টাকা ব্যাক করতে পারেন, তাহলে তাঁদের কাছে আবারও ব্যাংকের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘আমাদের প্রশ্ন হলো, যেসব মালিক এই ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, টাকা পাচার করেছে, এই ব্যাংকগুলোকে লুটপাট করেছে, সেই মালিকদের কাছেই ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার ফায়দা কী হতে পারে?’
দেশের অর্থনীতি ঝুপড়ির মতো মন্তব্য করে আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগের সময়কালের একটি শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সেই শ্বেতপত্রে আওয়ামী লীগের সময়কালে ২৪০ বিলিয়ন ডলার (প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা) বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। দেশের অর্থনীতি এখন একটা ঝুপড়ির মতো। ঝুপড়িতে আসলে টাকাপয়সা নেই। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু অবস্থায় নিয়ে গেছে। মুদ্রাস্ফীতি ১০ শতাংশের কাছাকাছি।’
আখতার হোসেন বলেন, এই সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো। কিন্তু এই কয়েক মাসে এই ঋণের পরিমাণ আরও ১ লাখ কোটি টাকার ওপরে বেড়ে এখন ২৪ লাখ কোটি টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের চার মাসে আরও ১ লাখ কোটি টাকা ঋণের জালে দেশকে বেঁধে ফেলেছে।
বাজেট ঘোষণার পর নিত্যপণ্যের দাম বাড়েনি—সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, ‘বাজেট ঘোষণার আগেই সরকার তার এই তিন মাসের সময়কালের মধ্যে দুই দফায় বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছে। যখন বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হয়, তখন পরিবহন সেক্টরে যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি সমস্ত জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যায়। অর্থাৎ সরকার শুধু বাজেট ঘোষণা করার পরে জিনিসের দাম বেড়েছে ব্যাপারটা এমন নয়, সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরই বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর মেকানিজম শুরু করে বাজেট ঘোষণা করেছে।