দেশের বিচার বিভাগ আগের ধারায় ফিরে যাচ্ছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশই বাতিল করেছে জাতীয় সংসদ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা খর্বের অভিযোগ এনে বিরোধীদলীয় সদস্যদের জানানো আপত্তি নাকচ করে গতকাল বৃহস্পতিবার এ-সংক্রান্ত দুটি বিল পাস করা হয়েছে জাতীয় সংসদে। এগুলো হলো ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল’ এবং ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল’। ফলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ এবং বিচার বিভাগের প্রশাসনিক কার্যক্রম বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশ পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগের আর কোনো আইন থাকছে না।
এ দুটিসহ গতকাল মোট ৩১টি বিল পাস হয়েছে। ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সন্ধ্যা ৬টার আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল।
সংসদে পাস করা বিলে রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলে তা আইনে পরিণত হয়। এরপর সরকার গেজেট জারি করে।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিল উত্থাপন করেন। এতে আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান বলেন, এই বিলটি বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ। স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন। ফ্যাসিবাদী কায়দায় নিম্ন আদালতকে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। বিচার বিভাগ এখন স্বাধীনভাবে কাজ করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় কিছু বিচারককে শোকজ দেওয়া হয়েছে। আগে মন্ত্রণালয়ের কথা না শুনলে বিচারকদের খাগড়াছড়ি বদলি করা হতো, সেটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হচ্ছে।
উচ্চ আদালতের রায়ের কথা উল্লেখ করে নাজিবুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ পরিবর্তন অসাংবিধানিক। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১১৬ অনুচ্ছেদ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সে অনুযায়ী অধ্যাদেশ জারি ও কার্যকর করা হয়েছিল। সেখানে বর্তমান আইনমন্ত্রীও ছিলেন। আজ কীভাবে তিনি এটা রহিত করার বিল আনেন?
বিলটি পাস না করে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে নাজিবুর রহমান বলেন, রহিতকরণ বিলটি অসাংবিধানিক। জুলাই জাতীয় সনদে সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবে বিএনপির আপত্তি ছিল না। আজকে কেন রহিতকরণ বিল আনা হচ্ছে? জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো আইন অসাংবিধানিক কি না সেটা সুপ্রিম কোর্ট বলতে পারেন। কিন্তু সংসদকে কোনো আইন করার জন্য ‘ডিক্টেট’ করতে পারেন না। এ সময় তিনি মাসদার হোসেন মামলার কথা উল্লেখ করেন।
জামায়াতের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আমরাও চাই। ওনাদের পিতারা বিচার বিভাগের কাছে অবিচারের শিকার হয়েছিলেন। সে স্বাধীনতা যেমন অ্যাবিউজড হয়েছে। সে বিচারকেরা সবচেয়ে স্বাধীন ছিলেন। বিচারকেরা বিচারের নামে ট্রাইব্যুনালে বসে ওনার পূর্বপুরুষ, ওনার পিতাদের ফাঁসি দিয়েছিলেন। সে সুপ্রিম কোর্ট খালেদা জিয়াকে ৫ বছর থেকে ১০ বছর জেল দিয়েছিলেন।’ তিনি বলেন, বিরোধী দলের নেতাদের সাজা দিতে রাতে মোমবাতি জ্বালিয়েও বিচারকাজ করা হয়েছে। ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও একজনকেও সুপ্রিম কোর্ট ডিসিপ্লিনারি প্রসিডিউরের আওতায় আনেন নাই।
বিচারকদের শোকজের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, আচরণবিধি অনুযায়ী বিচারক থাকা অবস্থায় কোচিং সেন্টারে সংযুক্ত থাকতে পারেন না। কিন্তু কেউ কেউ ক্লাস নেওয়ার বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। কোনো কোনো বিচারক ফেসবুকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ হচ্ছেন।
পরে কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের আপত্তি নাকচ হয়ে যায়। বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (রহিতকরণ) বিলে বলা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশ দুটি বাতিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওই অধ্যাদেশের অধীনে প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় বিলুপ্ত হবে।
বিল অনুযায়ী, অধ্যাদেশগুলো রহিত করা সত্ত্বেও সুপ্রিম কোর্ট, রেজিস্ট্রি, প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনাল, অধস্তন আদালত ও অন্যান্য দপ্তরের জন্য সৃজিত পদ, সাংগঠনিক কাঠামো, যানবাহন ও অফিস সরঞ্জামাদি বিদ্যমান থাকবে এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আইন ও বিচার বিভাগে ন্যস্ত হবে। যেসব ব্যয়ভার সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ের ওপর ন্যস্ত ছিল, তা আইন ও বিচার বিভাগ বহন করবে। সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়ে কর্মরত বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের চাকরি আগে যে আইনে পরিচালিত হতো, আবার সে আইনের অধীনে ন্যস্ত ও পরিচালিত হবে।
সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ বিল) পাস
আইনমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ (রহিতকরণ) বিল পাসের প্রস্তাব তুললে এনসিপির সংসদ সদস্য আখতার হোসেন আপত্তি জানান। তিনি বলেন, ঘুড়ির নাটাই হাতে থাকলে ঘুড়ি যত ওপরেই যাক, টান দিলে হাতেই আসবে। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রেও এটা ছিল। বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই রাষ্ট্রপতিকে বিচারক নিয়োগসহ সব কাজ করতে হয়। যে কারণে মানিকের মতো ব্যক্তিরা হাসিনার হাত ধরে বিচারপতি হয়েছিলেন।
আখতার হোসেন বলেন, সংবিধানে বিচারক নিয়োগে আইন করার কথা বলা আছে। কিন্তু এত বছর সেটা করা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কথামতো বিচারপতি নিয়োগের বিধান ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার সেখানে পরিবর্তন এনেছিল। একটা অধ্যাদেশ তাঁরা করেছেন। সেই অধ্যাদেশের মধ্যে কোনো অসাংবিধানিকতা নেই। এটাকে অসাংবিধানিক ঘোষণার জন্য একটা রিট হয়েছিল। এখনকার ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন। তখন বর্তমান আইনমন্ত্রী অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন। তাঁর দপ্তর তখন এই আইনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট রিট বাতিল করে রায় দেন। পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছিল যে এ আইনে কোনো অসাংবিধানিকতা নেই। কোন যুক্তিতে সেই আইন বাতিল করে দেওয়া হবে? জুলাই সনদে বিচারক নিয়োগে আলাদা কাউন্সিল করার কথা বলা আছে। সেখানে বিএনপি এটা সংবিধানে যুক্ত না করে আলাদা আইন করার কথা বলেছিল। এখন কেন তারা সেটা মানে না?
জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, থিওরিটিক্যালি তিনি বিরোধী দলের সদস্যের বক্তব্যের সঙ্গে একমত। সুপ্রিম কোর্টের নিয়োগের ক্ষেত্রে অতীতে এমন হয়েছে, বিশেষ করে গত ১৭ বছরের ফ্যাসিস্ট আমলে পার্টি ক্যাডারদের বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। যে নিয়োগের মাধ্যমে বিচার বিভাগকে কলঙ্কিত করা হয়েছে, যে নিয়োগের মাধ্যমে খায়রুল হকের জন্ম হয়েছে। তিনি বলেন, তাঁরা চান, এই নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হোক। ভালো বিচারপতি নিয়োগ হোক। সুপ্রিম কোর্ট মানুষের ন্যায়বিচারের আস্থার জায়গা হয়ে উঠুক।
আইনমন্ত্রী জানান, তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে ওই সময় ডিফেন্ড করেছিলেন। রাষ্ট্রের আইনজীবী সরকারের নির্দেশনা অনুসরণ করেন। বিরোধী দলের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তের ঋণ পরিশোধ করতে সঠিক পথে যেতে হলে একটি সাংবিধানিক কমিটি গঠন করে আসেন চুলচেরা বিশ্লেষণ করি। আসেন কোন কোন জায়গায় রোগ আছে সেটা নির্ণয় করি।’
এরপর কণ্ঠভোটে আখতার হোসেনের আপত্তি নাকচ হওয়ার পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। স্পিকার সংসদকে জানান, একজন বিচারপতির নামের শেষে একটা বিশেষণ যুক্ত করা হয়েছে। সেটা এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশের অধীনে নিয়োগ পাওয়া ২৫ জন বিচারকের নিয়োগের বৈধতা বিলে দেওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলের ওয়াকআউট
এদিকে ‘গণবিরোধী’ বিল পাসের অভিযোগ তুলে সন্ধ্যা ৬টার আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধী দল। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। এ নিয়ে ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দল তৃতীয়বার ওয়াকআউট করল।
ওয়াকআউটের আগে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য, বিরোধী দলের যৌক্তিক বাধা সত্ত্বেও যে কয়টি গণবিরোধী বিল আজকে পাস হয়েছে, আমরা তার দায় নিতে চাই না। এ জন্য আমরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করছি।’ এরপর তাঁর নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদকক্ষ ত্যাগ করেন।
বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের পর ওয়াকআউটের কোনো মানে আছে কি না এটা জানার জন্য উঠেছি। সব প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য ধন্যবাদ। আশা করি মাগরিবের নামাজের পর আবারও (বিরোধী দল) অংশগ্রহণ করবেন।’
সংসদে গতকাল মোট ৩১টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে বিচার বিভাগসংক্রান্ত দুটি বিল ছাড়াও স্থানীয় সরকার (পৌরসভা) সংশোধন বিল, জেলা পরিষদ (সংশোধন) বিল, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) বিলে আপত্তি ছিল বিরোধী দলের।