নিয়মিত জাতীয় সম্মেলন আয়োজন করে না দেশের ১৬টি রাজনৈতিক দল। এর মধ্যে গত ১০ বছরের বেশি সময় জাতীয় সম্মেলন করেনি বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপি। শুধু সম্মেলন আয়োজনেই নয়, দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রেও বড় ঘাটতি রয়েছে। এমনকি অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের দলীয় সদস্য বা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হওয়া ঠেকানোর কার্যকর বিধানও নেই অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) পরিচালিত ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’—শীর্ষক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর আয়-ব্যয়ের হিসাব, নিরীক্ষা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। দলগুলো নিয়মিত বাজেট প্রণয়ন করে না। বড় অংশের আর্থিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয় অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর প্রক্রিয়ায়।
আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে টিআইবি।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৮টি রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সদস্য হওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ন্যূনতম শুদ্ধাচার ও নৈতিকতার কোনো শর্ত নেই। অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের সদস্যপদ দেওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বসানো ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। ফলে চাঁদাবাজি, মানব পাচার, চোরাচালান, অস্ত্র ও মাদক ব্যবসাসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক দলে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা, ব্যয় নির্বাহ, আধিপত্য বিস্তার এবং নির্বাচনের সময় ভোটকেন্দ্র নিয়ন্ত্রণের জন্য অর্থ ও পেশিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রতি আগ্রহী হয়। অন্যদিকে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনকারী ও পেশিশক্তির অধিকারীরা নিজেদের সুরক্ষা এবং সামাজিক প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য রাজনৈতিক ক্ষমতার বলয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোতে বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশের প্রবণতা বেশি। বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৮ থেকে ৩২ শতাংশ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এক বা একাধিক মামলা ছিল। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন ও আচরণবিধি পরিপালনের ক্ষেত্রেও দলগুলোর জবাবদিহির ঘাটতি রয়েছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী দলগুলোর মনোনীত প্রার্থীরা নির্বাচনী আচরণবিধিসহ রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বিধিবিধান লঙ্ঘন করলেও দলীয় গঠনতন্ত্রে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট বিধান নেই। এমনকি এ ধরনের ঘটনায় দলগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্তও পাওয়া যায়নি।
কিছু প্রার্থীর নির্বাচনী হলফনামায় সম্পদ, ঋণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও বিদেশি নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত তথ্য গোপন কিংবা ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে গবেষণায়। প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয়ের পরিকল্পনা, অর্থের উৎস, ব্যয় তদারকি এবং আর্থিক প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়ে দলগুলোর গঠনতন্ত্রে স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্ধারিত ব্যয়সীমার তুলনায় প্রার্থীরা গড়ে ১৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি ব্যয় করলেও দলগুলোর পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
দলীয় নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধ, অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দলগুলোর দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। ক্ষেত্রবিশেষে লঘু শাস্তি দিয়েই দায় শেষ করা হয়।
তথ্যপ্রকাশের ক্ষেত্রেও দলগুলোর দুর্বলতা রয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ৩২টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ২৪টির ওয়েবসাইট থাকলেও সক্রিয় রয়েছে মাত্র ১৬টির।
গবেষণার পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে গণতান্ত্রিক চর্চা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি রয়েছে। আইন ও বিধিমালায় দলীয় কার্যক্রম এবং জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বিভিন্ন নির্দেশনা থাকলেও অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মতো শক্তিশালী আইনি কাঠামো নেই। বিদ্যমান আইনও আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলো সংবিধান, সংশ্লিষ্ট আইন ও নিজেদের গঠনতন্ত্র যথাযথভাবে অনুসরণ করে না। যতটুকু করে, তার বড় অংশই প্রতীকী। দল পরিচালনায় বিপুল অর্থের প্রয়োজন হলেও অর্থ ব্যবস্থাপনার বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক ও ব্যক্তিনির্ভর হওয়ায় আনুষ্ঠানিক আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত ব্যয়ের বড় ধরনের পার্থক্য তৈরি হচ্ছে।
এ ধরনের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও দলীয় অবস্থান ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যবসায়িক মডেলে পরিণত হচ্ছে।
নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণেও দলগুলোর অগ্রগতি সীমিত। আইনি বাধ্যবাধকতা ও দলীয় অঙ্গীকার থাকলেও নারীদের অন্তর্ভুক্তিতে অনীহা রয়েছে। কোনো কোনো দলে নারীদের অংশগ্রহণ কেবল আনুষ্ঠানিক বা প্রতীকী পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। তৃণমূলের অংশগ্রহণ ও নারী কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি একক বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, পরিবারতন্ত্র, কর্তৃত্বপরায়ণতা ও পুরুষতান্ত্রিকতাকে আরও শক্তিশালী করছে।
সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় অবদান রয়েছে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোর দায়ও তাদের নিতে হবে।
তিনি বলেন, গণতন্ত্র কার্যকর হতে পারে না, যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্যতম কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সুশাসন নিশ্চিত না হয়। রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের কথা বলা হলেও রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের বিষয়টি অনেক সময় উপেক্ষিত থাকে। অথচ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা ও মানুষের প্রত্যাশা বিবেচনায় নিয়ে এ গবেষণা করা হয়েছে। ২০২৩ সালের জুনে গবেষণার কাজ শুরু হলেও দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের পরিবর্তন এবং দলগুলোর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহে অসহযোগিতাসহ নানা কারণে প্রতিবেদন সম্পন্ন করতে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় লেগেছে।
গুণগত পদ্ধতিতে পরিচালিত এ গবেষণায় ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিআইবি। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত ও পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। তথ্য পাওয়া গেছে ৩২টি দলের কাছ থেকে। বাকি ১০টি দলের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা তথ্য দেয়নি। গবেষণার তথ্য সংগ্রহ করা হয় দুই পর্যায়ে-২০২৩ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি এবং ২০২৫ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
গবেষণার সুপারিশে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। টিআইবির মতে, গণতন্ত্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। এ সংস্কারের দায় ও দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে।