আগামী বছর কোথায় যেতে পারেন—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ করার জন্যই ভ্রমণ ম্যাগাজিনগুলো নানা সময়ে বিভিন্ন তালিকা প্রকাশ করে। তেমনই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক প্রকাশ করেছে, আগামী বছর ভ্রমণের জন্য উল্লেখযোগ্য গন্তব্যগুলো কোথায় হতে পারে। সেই তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে এশিয়ার কয়েকটি জায়গা। সেগুলোর মধ্যে একটি মালয়েশিয়ার অনিন্দ্যসুন্দর দ্বীপ পেনাং। কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়ি বনাঞ্চল, ইতিহাস-ঐতিহ্যে ঘেরা প্রাচীন গলি আর বিশ্বখ্যাত স্ট্রিট ফুডের বৈচিত্র্যই পেনাংকে এনে দিয়েছে এই অনন্য স্বীকৃতি। সাধারণত নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলে বর্ষা থাকে। তবে পেনাংসহ পশ্চিম উপকূলের দ্বীপগুলোতে এ সময় আবহাওয়া থাকে ভীষণ চমৎকার ও মনোরম। ফলে শীতের এই সময়ে পরিবার কিংবা প্রিয়জন নিয়ে ঘুরে আসার জন্য এটি এখন সবচেয়ে আদর্শ জায়গা।
‘প্রাচ্যের মুক্তো’ খ্যাত মালয়েশিয়ার পেনাং দ্বীপটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সুস্বাদু খাবারের এক অপূর্ব মিলনমেলা। এর রাজধানী জর্জ টাউনের আনাচ-কানাচে ছড়িয়ে থাকা প্রাচীন মন্দির, ঔপনিবেশিক আমলের ম্যানসন এবং এশিয়ার অন্যতম সেরা স্ট্রিট ফুড পেনাংকে ভ্রমণপিয়াসিদের কাছে এক অন্য রকম আকর্ষণে পরিণত করেছে।
ঐতিহাসিক জর্জ টাউন ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন: ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে স্বীকৃত জর্জ টাউনের প্রাচীন গলিগুলো যেন এক জীবন্ত জাদুঘর।
আধ্যাত্মিকতা এবং প্রকৃতির অপূর্ব সম্মিলন দেখতে চাইলে ঘুরে আসতে হবে মালয়েশিয়ার বৃহত্তম বৌদ্ধমন্দির ‘কেক লোক সি’। জর্জ টাউনের প্রধান আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নান্দনিক খোদাইয়ের ‘খু কংসি’ ক্ল্যান হাউস, পানির ওপর চীনা পরিবারগুলোর তৈরি কাঠের বাড়িওয়ালা ‘ক্ল্যান জেটিজ’ এবং জমকালো ‘পিন্যাং পেরানাকান ম্যানসন’। ঐতিহ্যবাহী ক্ল্যান হাউসগুলো অতীত ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। স্থানীয় পেডেলচালিত রিকশায় চড়ে জর্জ টাউনের ঐতিহাসিক অলিগলি ঘুরে বেড়ানোর মজাই আলাদা। রঙিন শপহাউস, প্রাচীন মন্দির ও ঔপনিবেশিক ভবনগুলোর পাশ দিয়ে ধীরগতিতে চলার সময় কোনো লোকাল ক্যাফেতে চা-কফি পানের অভিজ্ঞতা আপনাকে পেনাংয়ের সত্যিকারের স্থানীয় বাসিন্দার অনুভূতি দেবে।
পেনাং হিল এবং অত্যাধুনিক কেব্ল কার: প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উঁচুতে অবস্থিত পেনাং হিল বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভে যাওয়া চাই-ই চাই। বোটানিক গার্ডেন থেকে পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর জন্য তৈরি করা ১০ মিনিটের নতুন ড্রামাটিক কেব্ল কার রাইড থেকে পুরো দ্বীপের প্যানারামিক দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করবে। এ ছাড়া রয়েছে অরগানিক ফার্ম ট্রেইল ও হিল-টু-প্লেট রান্নার অভিজ্ঞতা।
ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও রিভার ক্রুজ: কেবল সৈকতই নয়, পেনাংয়ের মূল ভূখণ্ডের সতুঙ্গাই জুরু নদীতে রয়েছে দুই ঘণ্টার ‘পেনাং রিভার ক্রুজ’। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ঘুরে দেখা, সামুদ্রিক কাঁকড়া ধরা এবং গ্রামীণ কম্পং জীবনের আসল রূপ উপভোগ করার সুবর্ণ সুযোগ রয়েছে এখানে।
খাবারপ্রেমীদের কাছে পেনাং এক পরম তীর্থস্থান। পেনাংয়ের জীবনযাত্রার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলো খাবার। ‘স্ট্রেইটস অ্যান্ড ওরিয়েন্টাল মিউজিয়াম’-এ জাহাজডুবির আমলের সিরামিক দেখার পাশাপাশি স্ট্রিট ফুড খেতে পারেন। এ ছাড়া ‘ওয়ান্ডারফুড মিউজিয়াম’ ঘুরে স্থানীয় হকার সেন্টারে নানা পদের সুস্বাদু খাবারের স্বাদ নেওয়া বা লিটল ইন্ডিয়ায় শপিং করার সুযোগ তো রয়েছেই। এখানকার ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘চার কোয়ে তিও’ বা ডিম ও প্রন দিয়ে তৈরি চাটু-ভাজা চালের নুডলস এবং টক-ঝাল স্বাদের ‘পেনাং আসাম লাকসা’ পুরো এশিয়ায় সমাদৃত। ঐতিহ্যবাহী নিয়োনিয়া থেকে শুরু করে ‘মিশেলিন’ স্বীকৃত ফাইন ডাইনিং—সবই মিলবে এই দ্বীপে।
ইতিহাস, প্রকৃতি আর সুস্বাদু খাবারের এই দারুণ মেলবন্ধন উপভোগ করতে ২০২৭ সালের আগেই পেনাং ভ্রমণের পরিকল্পনা সেরে ফেলতে পারেন।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ভিএন এক্সপ্রেস