পাহাড়ে ভ্রমণ মানে দুর্গম অঞ্চলের রোমাঞ্চ। এবারের গন্তব্য বান্দরবানের রোয়াংছড়ি।
পথ চলতে চলতে ফেনীর নিজকুঞ্জরা গ্রামে বন্ধু রাশেদের পরিত্যক্ত বাড়িতে এসে থামতে হলো। পূর্বঘোষিত ডিনার সেখানে শেষ করতে হলো। এরপর ভরা চান্দের মিঠা মিঠা আলোয় ভাইরাল গায়ক হুমায়ূন সরকারের সঙ্গে আমাদের আড্ডা চলল রাত ১১টা পর্যন্ত। তারপর গাড়ি স্টার্ট নিল গন্তব্যের উদ্দেশে।
আমরা ফজরের নামাজ পড়লাম কেরানিহাটে। লাল চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভোরের বাতাসের আলিঙ্গন পাওয়া গেল। তারপর ছুটতে ছুটতে বান্দরবান সদরের সুয়ালক চেকপোস্টে গাড়ি থামল। এখানে সব ফরমালিটি সম্পন্ন করে আমাদের মাইক্রোবাস চেকপোস্ট ছাড়ল।
গাড়ি শহর ছাড়িয়ে রোয়াংছড়ির পাহাড়ি সড়কে পড়ল। পথের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে পৌঁছে যাই কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্প। তারাছা নদীর তীরবর্তী কাঠ-বাঁশের তৈরি দোতলা এক বোর্ডিংয়ে উঠি। বারান্দা থেকে বাইরের দৃশ্যে চোখ আটকে যায়। সাঙ্গুর শাখানদী তারাছার সৌন্দর্য কম নয়। প্রায় নয়টার সময় নির্ধারিত রুট গাইড এলে তাঁর সঙ্গে সবাই বেরিয়ে পড়ি মূল গন্তব্য মূরনখলের পথে।
এই গন্তব্যের শুরুতে ভাড়ার গাড়িতে চড়ে তুলাপাড়ার মুড়ায় গিয়ে নামতে হলো। এরপর কাজুবাদামের বাগানের ভেতর দিয়ে হাইকিং করে ম্রক্ষং ঝিরিতে শুরু হলো ট্রেইল। প্রথম দিকে অন্যান্য ট্রেইলের মতো হলেও ধীরে ধীরে আমরা আবিষ্কার করলাম, এর ভিন্ন এক জাদুকরি মায়া আছে। যেন পুরো পরিবেশটাই এক মায়াময় জাদু আচ্ছন্ন করে রেখেছে। সেই জাদুর মোহ আমাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছিল গভীর থেকে গভীরে। যেতে যেতে থালার মতো গোলাকার একটি ভুতুড়ে জায়গায় এসে আমরা থামলাম। এর পাশেই ছোট্ট একটি ঝরনা; রিমঝিম শব্দ তুলে অবিরাম ধারায় পানি বয়ে চলছে। ঝরনাটা ছোট্ট হলেও অসাধারণ। কিন্তু এর তলদেশে যাওয়ার পথটা সহজ নয়—সত্যিই সহজ নয়।
গাছের শিকড় ধরে নামার সময় ৪-৫ ফুট নিচে পড়ে গেলেও পরিস্থিতি সামলে নিলাম। তবে আরেকটু হলে আনুমানিক ২০ ফুট নিচে পাথরের ওপর পড়ে জীবনলীলা হতে পারত সাঙ্গ। ঘটনার আকস্মিকতায় সবাই আরও বেশি সতর্ক হয়ে পড়ি। খাড়া পিচ্ছিল পথে নিচে নেমে ঝরনার ধারে বোল্ডারে বসি। চারদিক সুনসান নীরব। এ রকম পরিবেশে ঝরনার গান শুনতে বেশ লাগে। কিছুক্ষণ জিরিয়ে আবারও চলতে শুরু করি। ছোট-বড় পাথুরে পথ মাড়িয়ে খানিকটা সময় পেরোতেই চোখ আটকায় দুই পাহাড়ের সরু গলিতে। যেখানটায় পথের শেষ ভেবেছিলাম, এখন দেখছি মূরনখলের মূল সৌন্দর্যের ঝাঁপি যেন সেখানটাতেই শুরু!
এর জন্যই পাহাড়ের প্রেমে যে একবার মজে, তাকে ফেরানোর সাধ্য নেই কারও। এখন কী দেখছি বা সামনে কী দেখব, তা আগেভাগে বোঝা মুশকিল। আর তা যদি হয় নিষিদ্ধ ট্রেইল, তাহলে যে কথাই নেই! শুরুতে গাইডকে দিয়ে রেকি করালাম। এরপর পাহাড়ের চিপায় কোমরসমান ঘোলা পানিতে নেমে গেলাম সবাই। পানির নিচে ছোট বড় পাথর। পাহাড়ের প্রাচীর ঘেরা ঘন লতাগুল্ম। সে এক রোমাঞ্চকর অনুভূতি। যতই এগোতে থাকি, ততই শিহরিত হই। যেতে যেতে কোথাও বুকসমান পানি, কোথাওবা দিতে হচ্ছে সাঁতার। দুপাশে দিগন্ত ছোঁয়া খাড়া পাহাড়। তার ওপর ঘন জঙ্গল। মাঝে সরু পথ। সেই পথ কখনো কখনো এতটাই ক্ষীণ, সূর্যের আলোও সেখানে ভয়ে পালিয়েছে! কোথাও জনমানবের চিহ্ন নেই। শেষের দিকে কিছু কিছু পথ এতটাই সরু, একজনের বেশি এগোনো কঠিন। এমন কঠিন সরু পথে, ঘণ্টাখানেক ট্রেইল শেষে খামার পাড়া দিয়ে বের হই। এ কারণে বান্দরবানকে ভ্রমণের তালিকায় শীর্ষে রাখি। তবে অ্যাডভেঞ্চার না থাকলে ভ্রমণ পানসে লাগে।
ঢাকা থেকে বান্দরবানে যেতে হবে প্রথমে। সেখান থেকে রোয়াংছড়ি উপজেলার কচ্ছপতলী আর্মি ক্যাম্প।
কচ্ছপতলীতে সাধারণ মানের বোর্ডিং ও রেস্টুরেন্ট রয়েছে।
জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রয়োজনীয় ওষুধ, পানি এবং শুকনা খাবার সঙ্গে রাখবেন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অযাচিত আচরণ করবেন না।