বিশ্ব অর্থনীতির ‘ব্যারোমিটার’ হিসেবে পরিচিত সিঙ্গাপুর। দেশটি ২০২৬ সালে পর্যটন খাতের আয় কিছুটা কমার পূর্বাভাস দিয়েছে। যদিও দেশটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এরপরও বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে পর্যটন ব্যয়ে কিছুটা মন্দাভাব দেখা যেতে পারে। সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট মহলের সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি এই ফিচারে তুলে ধরা হলো দেশটির বর্তমান পর্যটন পরিস্থিতি।
সিঙ্গাপুর ট্যুরিজম বোর্ডের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পর্যটন আয় হতে পারে ৩১ থেকে ৩২.৫ বিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার। অথচ গত বছর এটি ছিল রেকর্ড ৩২.৮ বিলিয়ন ডলার। আয় কমার এই আশঙ্কার পেছনে মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা। এই ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মানুষের ভ্রমণের মানসিকতায় কিছুটা প্রভাব পড়েছে। এরপরই আসে জ্বালানি খরচ। উড়োজাহাজের জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বিমানভাড়া বেড়েছে, যা পর্যটন চাহিদাকে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে পর্যটকেরা এখন খরচের বিষয়ে কিছুটা রক্ষণশীল হয়ে উঠছেন।
অনিশ্চয়তা থাকলেও দমে নেই সিঙ্গাপুর। দীর্ঘমেয়াদি ‘ট্যুরিজম ২০৪০’ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে দেশটির সরকার বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে। আগামী পাঁচ বছরে ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে আরও ৭৪০ মিলিয়ন সিঙ্গাপুর ডলার যুক্ত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে সিঙ্গাপুরে বিভিন্ন কোরিয়ান ড্রামা চিত্রায়িত হচ্ছে; যা পর্যটকদের আকর্ষণ করবে। আগামী ডিসেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার জনপ্রিয় ব্যান্ড বিটিএসের কনসার্ট সিঙ্গাপুরের পর্যটন চাহিদাকে চাঙা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিমান ভ্রমণের অস্থিরতা কাটাতে সিঙ্গাপুর এখন ক্রুজ বা প্রমোদতরি পর্যটনে বেশি জোর দিচ্ছে। আমেরিকার বাইরে ডিজনির সবচেয়ে বড় জাহাজ এখন সিঙ্গাপুর থেকে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২৬ সালের ১০ মার্চ থেকে সিঙ্গাপুর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। এটি ডিজনি ক্রুজ লাইনের অষ্টম এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় জাহাজ, যা প্রায় ২ লাখ ৮ হাজার টন ওজনের। এই সুবিশাল জাহাজটিতে প্রায় ৬,৭০০ জন যাত্রী এবং ২,৫০০ জন ক্রু মেম্বার ভ্রমণ করতে পারেন। সিঙ্গাপুরের মেরিনা বে ক্রুজ সেন্টার থেকে এটি যাত্রা শুরু করেছে। ডিজনি অ্যাডভেঞ্চার মূলত ৩ এবং ৪ রাতের ‘ক্রুজ-টু-নোয়্যার’ ভ্রমণ পরিচালনা করবে। এতে ৭টি ভিন্ন থিমযুক্ত এলাকা, মার্ভেল ল্যান্ডিং, পিক্সার মার্কেট, ব্রডওয়ে-স্টাইলের শো এবং জাহাজের ওপর প্রথম রোলার কোস্টারের ব্যবস্থা রয়েছে।
সিঙ্গাপুর তার অত্যাধুনিক স্থাপত্য আর আধুনিক জীবনযাত্রার জন্য পরিচিত হলেও বর্তমানে শহরটি বিশ্ববিখ্যাত বিলাসবহুল ব্র্যান্ডগুলোর প্রধান গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে মন্দাভাব থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুরে নতুন লাক্সারি স্টোর খোলার হিড়িক পড়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে বিলাসবহুল দোকানের ভাড়ার গড় বৃদ্ধি ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ। অথচ সিঙ্গাপুরে এই হার ছিল ২ শতাংশ, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি। ২০২৪ সালের তুলনায় বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি অনেকটা কমলেও সিঙ্গাপুর তার অবস্থান শক্তভাবে ধরে রেখেছে। সিঙ্গাপুরের অর্চার্ড রোড এবং মেরিনা বে এলাকায় এখন নতুন জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। জায়গার এই সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো সেখানে তাদের ফ্ল্যাগশিপ স্টোর খুলতে বা বিদ্যমান স্টোরগুলোকে আরও বড় ও আধুনিক করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আপনি যদি ২০২৬ সালে সিঙ্গাপুর ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে মনে রাখবেন, দেশটি এখন শুধু ভ্রমণের জায়গা নয়, এটি একটি বিশ্বমানের বিনোদনকেন্দ্র। তবে ভ্রমণের আগে বিমানের টিকিটের দাম ও হোটেল বুকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নিয়ে পরিকল্পনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
সূত্র: সিএনবিসি, সিঙ্গাপুর বিজনেস