সম্প্রতি নেত্রকোনার মদন উপজেলায় ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের পর অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়েছেন এক মাদ্রাসাশিক্ষক। আবার দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলায় ১২ বছরের এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়ে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয় প্রায়ই। কিন্তু তারপরেও ঘটনা থেমে নেই। আজকাল স্মার্টফোনের স্ক্রিনে এমন সব খবর যেন একটু বেশি চোখে পড়ছে।
শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিশ্বব্যাপী এই ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার কথা বললে, সাম্প্রতিক একটি গবেষণায় দেখা যায়, এই অঞ্চলে প্রতি আটজন শিশুর মধ্যে একজন শিশু ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সে জন্য সাধারণ মানুষের মনে একটি প্রশ্ন রয়েই যায়, কেন শিশুরা এই পরিস্থিতির শিকার? এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায় না তেমন।
গবেষণা বলছে, বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ মেয়ে এবং ১১ দশমিক ৫ শতাংশ ছেলে তাদের শৈশবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, শিশু যৌন নির্যাতন হচ্ছে কোনো শিশুকে এমন যৌন কার্যকলাপে জড়িত করা, যা সে পুরোপুরি বোঝে না, যাতে সম্মতি দিতে অক্ষম বা যা সমাজের আইন ও রীতিনীতি লঙ্ঘন করে। এটা কোনো শিশুর সঙ্গে কোনো প্রাপ্তবয়স্কের বা এমন অন্য শিশুর কার্যকলাপ, যে বয়স ও দায়িত্বের কারণে শিশুর ওপর ক্ষমতা ও বিশ্বাসের জায়গা নিয়ে থাকে। এখানে উদ্দেশ্য থাকে শুধু নিজের চাহিদা পূরণ করা। এটা শুধু শারীরিক নয়, এটি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়। যারা বয়ঃসন্ধির আগের শিশুদের ধর্ষণ করে, তাদের অধিকাংশই পেডোফিলিয়া রোগে ভোগে। অর্থাৎ, তাদের যৌন আকর্ষণ আছে শিশুদের প্রতি। তারা নিজেরাই শৈশবে নির্যাতিত হয়ে থাকতে পারে। তাদের মধ্যে সহানুভূতি নামক উপলব্ধি একেবারেই নেই। নিজের যৌন চাহিদা মেটাতে তারা শিশুকে শুধু একটি বস্তু হিসেবে দেখে।
শিশু ধর্ষকের মানসিকতায় কয়েকটি জিনিস সাধারণত দেখা যায়। তারা শিশুদের অনুভূতি বুঝতে পারে না। তারা প্রথমে শিশুদের বিশ্বাস অর্জন করে তারপর তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। পরে ব্যাপারটি যদি জানাজানি হয়, তখন নিজের দোষ স্বীকার না করে শিশুর ওপর চাপিয়ে দেয়।
বিভিন্ন গবেষণা বলছে, শিশু ধর্ষকদের মস্তিষ্ক আমাদের সবার মস্তিষ্কের চেয়ে আলাদা কাজ করে। ‘জার্নাল অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল নিউরোসাইকোলজিক্যাল সোসাইটি’তে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ধর্ষক শুধু শিশুদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে (পেডোফিল), তাদের মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়া করতে ধীরগতিতে কাজ করে। তাদের চিন্তা করার ক্ষমতায় দুর্বলতা থাকে। আর যারা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক—উভয়কে ধর্ষণ করে, তাদের শব্দ ও ভাষা বোঝার ক্ষমতা কম।
‘ইরানিয়ান জার্নাল অব মেডিকেল সায়েন্স’-এ প্রকাশিত ২০২৫ সালের আরেক গবেষণায় দেখা গেছে, শিশু ধর্ষকদের মস্তিষ্কের সামনের অংশে (ফ্রন্টাল পোল) রক্ত চলাচলে অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। এই অংশ আমাদের রাগ, আবেগ আর সিদ্ধান্ত নেওয়া নিয়ন্ত্রণ করে। ধর্ষকেরা যখন পরীক্ষা দেয়, তাদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা খুব কম থাকে।
পলিগ্রাফ মেশিনে দেখা গেছে, শিশুদের অর্ধনগ্ন ছবি দেখলে ধর্ষকদের বুকের ধড়ফড় বেড়ে যায়, গায়ে ঘাম আসে, যা সাধারণ মানুষের হয় না। তাদের আবেগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অনেক কম।
‘দ্য ইউরোপিয়ান জার্নাল অব সাইকোলজি অ্যাপ্লাইড টু লিগ্যাল কনটেক্সট’-এ বলা আছে, সব ধরনের ধর্ষকেরই কিছু দুর্বলতা থাকে। কিন্তু শিশু ধর্ষকদের যুক্তি দক্ষতা এমন থাকে, যাতে করে তারা খুব ঠান্ডা মাথায় অপরাধ করে এবং ধরা পড়তে চায় না। এটা তাদের আরও ভয়ংকর করে তোলে।
আপনার সন্তানের দায়িত্বে রয়েছেন বা আশপাশের কোনো প্রাপ্তবয়স্কের আচরণে কিছু বিষয় দেখলে সাবধান হতে হবে। সে বিষয়গুলো হলো—
যদি শিশুর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু লক্ষণ দেখা যায়, তবে সঙ্গে সতর্ক হতে হবে।
শৈশবে ধর্ষিত একজন মানুষ যখন বড় হন, তখন তাঁর জীবনযুদ্ধ কঠিন হয়ে যায়। তিনি যে সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে পারেন—
জরুরি ব্যবস্থা (৭২ ঘণ্টার মধ্যে)
দীর্ঘমেয়াদি সাইকোথেরাপির ব্যবস্থা করুন। এটি শিশুকে পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করবে।
আদালতের প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিশুকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
বাংলাদেশে যদি কোনো শিশু ধর্ষিত হয়, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে আইনি সহায়তা নেওয়া ব্যবস্থা করুন। সে জন্য—
জাতীয় জরুরি সেবা: ৯৯৯ নম্বরে ফোন করে পুলিশ ও অন্যান্য সহায়তা নিন। ১০৯ নম্বরে ফোন করে ধর্ষণের অভিযোগ জানান।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল: নিকটস্থ আদালতে সরাসরি মামলা করা যায়। তার ব্যবস্থা করুন।
জেলা আইনি সহায়তা কমিটি: বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা পেতে পারেন।
অভিভাবকদের এখন জেনে রাখা উচিত, শুধু অপরিচিত কেউ নয়, কখনো কখনো সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেও সন্দেহ করতে হয়। তাঁদের দ্বারাও শিশুর বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি হতে পারে। তাই সন্তানের কথা মন দিয়ে শুনুন। তাহলে বুঝতে পারবেন, সে কোন পরিস্থিতির মধ্য় দিয়ে যাচ্ছে।
অধ্যাপক ডা. সানজিদা শাহরিয়া, চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার বিডি