যখন আপনি একা বোধ করেন এবং চারপাশের পৃথিবীটাকে অন্ধকার ও এলোমেলো মনে হয়, তখন অসহায় লাগে, তাই না? মন খুলে কারও সঙ্গে কথা বলবেন, সেটাও হয়তো পারছেন না। আজকাল মানুষের সঙ্গে সত্যিকারের আত্মিক যোগাযোগ একদম কমে গেছে, কারণ, অনলাইনের অগভীর সম্পর্কগুলো কেবল ‘লাইক’, ‘কমেন্ট’ ও ‘ইমোজি’র মাধ্য়মেই এখন বেশি সরব। রোজকার নানান ঘটনা যখন নিজের ভেতরের শক্তিকে ক্ষয় করতে থাকে, তখন সারা দিনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করাও কঠিন হয়ে পড়ে। রোজকার কিছু অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্য়মে নিজের ভেতরের শক্তিকে ক্ষয় থেকে বাঁচানো যেতে পারে। পড়ে নিন এখানে–
অন্যের খারাপ আচরণ বা কথাকে ব্যক্তিগতভাবে নেবেন না। মনে রাখবেন, আমরা সবাই একটি সমষ্টির অংশ, কেউ একা নই। ঘৃণার বদলে পাল্টা ঘৃণা বা উগ্র প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে নিজেকে মনে করিয়ে দিন—সমস্যাটি যেন আপনাকে আপনার কক্ষপথ থেকে বিচ্য়ুত করে না দেয়। আপনার নিজের মানসিক শক্তি রক্ষার দায়িত্ব আপনারই। এমন একটি মন্ত্র বা বাক্য তৈরি করুন ও নিজেকে রোজ কয়েকবার বলুন, যা আপনাকে শান্ত রাখবে এবং অন্যের নেতিবাচক আচরণ থেকে বাঁচাবে। যেমন: ‘এই মুহূর্তে, আমি ভালোবাসাকে বেছে নিচ্ছি’, ‘আমি নিজের শক্তির অপচয় করব না এবং আমি ইতিবাচক থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি’ অথবা ‘আমি ভালোবাসা ও আলোর উৎস, কারও সাধ্য নেই আমাকে অন্ধকারে টেনে নেওয়ার।’ এককথায় নিজেকে ভালো রাখার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ আপনার।
প্রতিটি নেতিবাচক কথার বিপরীতে একটি করে ইতিবাচক কাজ করুন। আপনার নিজস্ব উপায়ে যতটুকু সম্ভব মানুষকে সাহায্য করুন। এটি যে খুব বড় পরিসরে হতে হবে, তা নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মনে রাখা—আপনি নিজেই একটি আলো এবং আপনি অন্যদের সাহায্য করতে পারেন। আমাদের সবারই ভালোবাসা ছড়ানোর ক্ষমতা রয়েছে। যেমন—কাজের জায়গায় সহকর্মীর শিফট বদলে নিতে হলে তাঁকে সহায়তা করা, দুস্থদের পোশাক দান করা, কোনো বয়স্ক প্রতিবেশীকে সাহায্য করা ইত্যাদি। এটি সাধারণ একটি প্রশংসার মাধ্যমেও হতে পারে, যেমন—কাউকে ধন্যবাদ বলা, কারও জন্য দরজাটি খুলে ধরা কিংবা চোখের দিকে তাকিয়ে হাসা। আবার কোনো পছন্দের সামাজিক কাজের সক্রিয় সমর্থক হওয়ার মতো বড় কিছুও হতে পারে। যতক্ষণ আপনি ভালোবাসা থেকে কোনো কিছু দিচ্ছেন বা সমর্থন করছেন, ততক্ষণই আপনি আলো ছড়াচ্ছেন।
ঘাসের ওপর খালি পায়ে হাঁটুন, গাছ স্পর্শ করুন, পুলে সাঁতার কাটুন, পশুপাখিকে খাওয়ান কিংবা গাছে পানি দেওয়ার কাজগুলোও নিজেকে পরিতৃপ্ত করে। প্রকৃতি মনকে শান্ত করে, এটি আপনার আত্মাকে তৃপ্ত করবে। পৃথিবীর সৌন্দর্যকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করুন। আপনার ব্যক্তিগত জীবনে বা চারপাশের পৃথিবীতে যতই হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটুক না কেন, নিজেকে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার অনুমতি দিন। যদি প্রকৃতিতে যাওয়ার সুযোগ না থাকে, তবে হালকা গরম পানিতে স্নান করুন এবং শরীর বেয়ে পানির ধারা বইতে দিন। সাউন্ড মেশিনে বা ফোনে ঝরনা, বাতাস বা বৃষ্টির শান্ত শব্দ শুনুন এবং মনে মনে সেই সৌন্দর্য কল্পনা করুন।
পারস্পরিক যোগাযোগ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা করুন, মুখোমুখি বসুন এবং হাসুন। তবে ‘এনার্জি ভ্যাম্পায়ার’ বা যারা আপনার ইতিবাচক শক্তি শুষে নেয়, তাদের থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। এমন মানুষের সঙ্গে থাকুন, যারা আপনাকে উৎসাহিত করে এবং যাদের লক্ষ্য আপনার মতোই ইতিবাচকতা ছড়ানো। এটি সত্যিই অনেক বড় প্রভাব ফেলে। টেক্সট মেসেজ পাঠানোর বদলে কোনো বন্ধুকে বাড়িতে আমন্ত্রণ জানান, কফি খেতে বাইরে যান অথবা প্রিয় খাবার ও পানীয় নিয়ে আড্ডা দিন।
এটি করার উপায় হলো, নিজের শরীর ও মনের ভাষা বোঝা। কোনো যোগাযোগ বা আড্ডা আপনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না, তা বুঝতে শিখুন। আপনার শরীর আপনাকে বিভিন্ন সংকেত দেবে—যেমন দ্রুত হৃৎস্পন্দন, পেটে অস্বস্তি বা মোচড় দেওয়া, বুকে চাপ লাগা, ঘাড়ের পেছনে ব্যথা হওয়া কিংবা হুট করে মাথা ধরা। যদি কারও সঙ্গে কথা বলার সময় বা কোনো পরিবেশে আপনি ক্লান্ত বা অস্বস্তি বোধ করেন, তবে সেখানে একটি সুস্থ সীমানা টেনে দিন। আপনার শরীর যেসব সংকেত দিচ্ছে, সেদিকে মনোযোগ দিন, শরীর প্রতিনিয়ত আমাদের সঙ্গে কথা বলে এবং জানায় তার কী প্রয়োজন। আমরা অনেকেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে থাকতে থাকতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু বাইরের পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, নিজের ভেতরে শান্তি খুঁজে পাওয়ার পথ তৈরি করতে নিজের শরীর ও মনের কথা শোনার গুরুত্ব অপরিসীম।
সূত্র: ওয়ান্ডার মাইন্ড ও অন্যান্য