মাতৃত্ব একটি ২৪ ঘণ্টার ডিউটি। সেখানে কোনো দিন নেই, রাত নেই। মাঝরাতে যখন নবজাতকের কান্না থামতেই চায় না, তখন একজন মায়ের মানসিক অবস্থা কতটা বিপর্যস্ত হতে পারে, তা শুধু ভুক্তভোগী মায়েরা জানেন। চারপাশের নীরবতার মাঝে একাকী শিশুর কান্না সামলানো। এই সময়টুকুই সম্ভবত মাতৃত্বের সবচেয়ে নিঃসঙ্গ ও ক্লান্তিকর মুহূর্ত। এই নির্ঘুম রাত পৃথিবীর সব প্রান্তের মায়েদের কাটাতে হয়। জাপানের মায়েরা যখন এমন এক চরম একাকিত্ব ও মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই তাঁদের জন্য একচিলতে স্বস্তির আলো নিয়ে হাজির হয়েছে কিছু ‘নাইটটাইম ক্রাইং ক্যাফে’ বা ‘রাত জেগে বাচ্চার কান্না থামানোর ক্যাফে’। মাঝরাতের এই বিশেষ ক্যাফেগুলো কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং সন্তান লালন-পালনের সবচেয়ে কঠিন সময়ে মায়েদের একটুখানি মানসিক আশ্রয় দিতেই দরজা খুলে দিচ্ছে।
মজার বিষয় হলো, এই ক্যাফেগুলোর ধারণা কিন্তু কোনো সমাজবিজ্ঞানী বা নীতিনির্ধারকের মাথা থেকে আসেনি। প্রায় এক দশক আগে ২০১৭ সালে একজন কার্টুনিস্ট মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছোট কমিকস শেয়ার করেছিলেন। সেখানে তিনি ‘ইয়োনাকিগোয়া’ বা ‘নাইট ক্রাইং হাউস’ নামের একটি কাল্পনিক জায়গার কথা ফুটিয়ে তোলেন; যা শুধু মাঝরাতে সন্তান সামলাতে হিমশিম খাওয়া মায়েদের আশ্রয়ের জন্য অদৃশ্য থেকে জেগে ওঠে। ২০২৩ সালে এই গল্প ইন্টারনেটে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হলে পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। কমিকসের সেই লেখিকা নিজেও একসময় ভাবেননি যে তাঁর এই কাল্পনিক ভাবনা কখনো বাস্তবে রূপ নেবে। কিন্তু মায়েদের সেই চিরন্তন একাকিত্ব দূর করতে এখন জাপানের বিভিন্ন প্রান্তে ছোট ছোট সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে।
উত্তর জাপানের হোক্কাইডোর মেমুরো শহরের একটি ফ্রেঞ্চ টোস্টের দোকান দিনের বেলা বন্ধ থাকলেও প্রতি রবিবার রাত ৯টা বাজলেই আলোয় ঝলমল করে ওঠে। ২৮ বছর বয়সী মাদোকা নোজাওয়া নামের এক নারী এই ক্যাফে পরিচালনা করেন। যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ওয়াকো নো কোয়া’ বা ‘পিতা-মাতা ও শিশুর ঘর’। কোনো মা যদি তাঁর অবিরাম কাঁদতে থাকা শিশুকে নিয়ে মাঝরাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তবে তিনি সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে এই ক্যাফেতে চলে আসতে পারেন। ক্যাফেটির ভেতরে শিশুদের হামাগুড়ি দেওয়া বা ঘুমানোর জন্য নরম ম্যাট বিছানো থাকে। এ ছাড়া স্তন্যপান করানো বা ডায়াপার পরিবর্তনের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। নোজাওয়ার এই উদ্যোগে পাশে দাঁড়িয়েছেন কিছু নারী স্বেচ্ছাসেবক। তাঁরা মায়েদের কথা শোনেন এবং প্রয়োজনে কিছুক্ষণের জন্য শিশুকে আগলে রাখেন। ভোর ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকা এই ক্যাফেতে একা একা আসা মায়েরা কোনো সামাজিক সংকোচ বা লোকলজ্জা ছাড়াই অন্য অপরিচিত মায়েদের পাশে বসেন। কেউ একটু ঘুমিয়ে নেন, কেউবা মনের কথা বলে হালকা হন।
জাপান বর্তমানে এক তীব্র জনমিতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে জন্মহার রেকর্ড পরিমাণ কমে গেছে। ২০২৫ সালের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, সেখানে মাত্র ৭ লাখ ৫ হাজার ৮০৯ শিশু জন্মগ্রহণ করেছে। সংখ্যাটি আগের বছরের চেয়ে ২ দশমিক ১ শতাংশ কম এবং ১৮৯৯ সালের পর থেকে সর্বনিম্ন। গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, মাঝরাতে একাকী শিশু সামলানোর এই তীব্র মানসিক চাপ ও ক্লান্তি জাপানি নারীদের পরবর্তী সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে আসার অন্যতম বড় কারণ। জন্মহার কমে যাওয়ার অর্থ হলো, প্রতিবেশী অঞ্চলে একই বয়সী বাচ্চার মায়েদের সংখ্যা কমে যাওয়া; যা মায়েদের আরও বেশি একাকী করে তোলে।
তবে এই চমৎকার উদ্যোগগুলো টিকিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই ক্যাফেগুলো সম্পূর্ণ ফ্রি সেবা দেয় এবং এগুলো মূলত ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অনুদান এবং স্বেচ্ছাসেবকদের শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। রাতভর এমন সেবা চালু রাখার আর্থিক ও শারীরিক ধকল অনেক বেশি। টোকিও ইউনিভার্সিটি অব ইনফরমেশন সায়েন্সেসের পোস্টপার্টাম (প্রসবোত্তর) কেয়ার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক কাওরি ইচিকাওয়া মনে করেন, এই উদ্যোগগুলোকে টিকিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ সহযোগিতা প্রয়োজন। কারণ, সরকারি সহায়তা সাধারণত রাতের বেলা বা ছুটির দিনগুলোতে সীমিত থাকে। তাই মায়েদের এই নিঃসঙ্গ রাতের কঠিন সময়ে সাহায্য করতে এমন নাইটটাইম ক্রাইং ক্যাফের পরিধি আরও বাড়ানো জরুরি।
সূত্র: ফার্স্ট পোস্ট, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ইভিএন এক্সপ্রেস