মানচিত্রে থাকা আকৃতির কারণে বিশ্বে একটি দেশকে বলা হয় ‘দ্য হার্ট শেপড ল্যান্ড’। দেশটির নাম বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। এক ছাদের নিচে থাকা দুই স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল। শুধু ভৌগোলিক আকৃতিই নয়, ইতিহাস, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা। একদিকে যেমন রয়েছে অটোমান সাম্রাজ্যের মুসলিম ঐতিহ্যের ছোঁয়া, অন্যদিকে অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান যুগের ইউরোপীয় আধুনিকতা। ইউরোপের এই দেশ আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাত ১টায় বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হতে চলেছে কাতারের বিপক্ষে।
ট্রেডার বা অটোমান বণিকদের হাত ধরে ১৪৬৩ সালে বসনিয়ায় কফির আগমন ঘটে। তবে বসনিয়ান কফি তৈরির পদ্ধতি তুর্কি কফির চেয়ে আলাদা। এখানে পানি ফুটিয়ে তারপর কফি যোগ করা হয়। যার ফলে এর স্বাদ হয় আরও গাঢ়। তামা বা পিতলের ঐতিহ্যবাহী পাত্র ‘জেজভা’-তে করে ছোট সিরামিকের কাপ, চিনির কিউব ও লোকুম সহকারে কফি টেবিলে পরিবেশন করা হয়। কফি খাওয়ার আগে এক চুমুক পানি দিয়ে মুখ পরিষ্কার করে নেওয়া এখানকার নিয়ম। কফি সংস্কৃতির মতোই সারায়েভো শহরের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে ‘সাহাত-কুলা’। এটি বিশ্বের একমাত্র পাবলিক ‘লুনার ক্লক’ বা চাঁদের গতিবিধি অনুযায়ী চলা ঘড়ি। এই ঘড়ির কাঁটা যখন ১২টা স্পর্শ করে, তখন মূলত সূর্যাস্ত হয়। যা মুসলিমদের মাগরিবের নামাজের সময় নির্দেশ করে। প্রতিদিন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজ হাতে এই ঘড়ির সময় সংশোধন করেন।
লন্ডন বা প্যারিসের মতো বড় বড় ইউরোপীয় শহরগুলোর অনেক আগেই বসনিয়ার রাজধানী সারায়েভোতে বৈদ্যুতিক ট্রাম চলাচল শুরু হয়েছিল। ১৮৮৫ সালে ঘোড়ায় টানা ট্রাম দিয়ে শুরু হলেও ১৮৯৫ সালেই সারায়েভো পূর্ণাঙ্গ বৈদ্যুতিক ট্রাম সিস্টেমে রূপান্তর হয়। লন্ডন এই প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিল ১৯০১ সালে। বহু যুদ্ধ ও দীর্ঘ অবরোধ পার করেও এই ট্রাম লাইন আজও টিকে রয়েছে। ভূগোলপ্রেমীদের জন্য আরেকটি মজার তথ্য হলো, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার সমুদ্র উপকূল মাত্র ২০ কিলোমিটার বা ১২ দশমিক ৪ মাইল। অটোমান সাম্রাজ্যের সুবাদে পাওয়া নেউম অঞ্চলের এই ছোট উপকূল ক্রোয়েশিয়ার বিশাল সমুদ্রসৈকতকে দুই ভাগে ভাগ করেছে। উপকূলে থাকা দেশগুলোর মধ্যে মোনাকোর পর এটিই বিশ্বের দ্বিতীয় সংক্ষিপ্ততম উপকূলরেখা।
১৯৯৫ সালের ডেটন শান্তিচুক্তির পর থেকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার রাজনৈতিক কাঠামোটি বিশ্বের অন্যতম জটিল ও অনন্য এক শাসনব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। দেশটিতে কোনো একক রাষ্ট্রপতি নেই। তিনজন সদস্য নিয়ে একটি ‘ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রেসিডেন্সি’ গঠিত হয়। এখানে থাকে একজন বসনিয়াক, একজন ক্রোট ও একজন সার্ব। এটি প্রতি আট মাস পরপর আবর্তিত হয়। পুরো দেশ মূলত দুটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে বিভক্ত। ‘ফেডারেশন অব বসনিয়া অ্যান্ড হার্জেগোভিনা’ ও ‘রেপাবলিকা শ্রপস্কা’। তবে এর বাইরেও রয়েছে ব্রচকো জেলা। এটি ইউরোপের একমাত্র ‘মুক্ত শহর’ হিসেবে পরিচিত। এটি সম্পূর্ণ স্বশাসিত এবং এর নিজস্ব আদালত, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুলিশ ব্যবস্থা রয়েছে; যা প্রায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের মতো কাজ করে।
১৪ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের বসবাসের ইতিহাস রয়েছে এই অঞ্চলে। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ঘটনাটি ঘটেছিল এখানেই। ১৯১৪ সালে সারায়েভোর ‘ল্যাটিন ব্রিজ’-এর কাছে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দকে হত্যা করা হয়। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মূল অনুঘটক বা স্পার্ক হিসেবে কাজ করেছিল। আবার এই সারায়েভো শহরই ১৯৮৪ সালে শীতকালীন অলিম্পিক গেমসের আয়োজন করেছিল। কোনো কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে শীতকালীন অলিম্পিক অনুষ্ঠিত হওয়ার সেটিই ছিল প্রথম ঘটনা। এখানে আছে ইউরোপের অন্যতম শেষ আদিম অরণ্য ‘সুতজেস্কা ন্যাশনাল পার্ক’, যাকে বলকানের ইয়োসেমাইট বলা হয়। আরও আছে মোস্তারের ঐতিহাসিক পুনর্নির্মিত ‘স্তারি মোস্ত’। এসব মিলিয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা এক জীবন্ত জাদুঘর, যা প্রতি মুহূর্তে পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
সূত্র: বিবিসি, দ্য ফ্যাক্ট ইনস্টিটিউট, রাস্টিক পাথওয়েজ