ক্রিস্টিয়ান রোমেরো বললে অনেকে না-ও চিনতে পারেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডারকে। কিন্তু যদি বলা হয় ‘কুটি রোমেরো’ তাহলে বেশির ভাগ ফুটবলপ্রেমী চিনবেন তাঁকে। হ্যাঁ, আপনাদের প্রিয় কুটি রোমেরোর পুরো নাম ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। তবে আর্জেন্টিনার সাবেক গোলরক্ষক সার্জিও রোমেরোর সঙ্গে তাঁকে গুলিয়ে ফেলবেন না যেন। উপাধি এক হলেও এই দুই ফুটবলারের মধ্য়ে কোনো সম্পর্ক নেই।
রোমেরোর জন্ম ১৯৯৮ সালে আর্জেন্টিনার কর্ডোবা শহরে। মাদক মাফিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন নেতিবাচক পরিবেশে বড় হয়ে উঠতে গিয়েই ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। বছর বিশেক বয়স হলে তিনি নিজ শহরের বিখ্যাত ক্লাব আতলেতিকো বেলগ্রানোতে ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করেন। তারপর ইতালির জেনোয়া, জুভেন্টাস ও আটলান্টা হয়ে ইংল্যান্ডের ক্লাব টটেনহাম হটস্পারে যোগ দেন। একই সঙ্গে তিনি আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ডিফেন্ডার হিসেবে অপরিহার্য হয়ে ওঠেন। চলতি বিশ্বকাপ আসরে তাঁর নৈপুণ্য তো দেখছেনই।
ফুটবল মাঠের খ্যাতি আর প্রতিপত্তির বাইরে রোমেরো একেবারে ভিন্ন এক মানুষ। বলা চলে, তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। ক্যারিয়ারের কারণে জন্মস্থান থেকে প্রায় ১১ হাজার ১১০ কিলোমিটার বা ৬ হাজার ৯০০ মাইল দূরে বসবাস করলেও মা-বাবা বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে রোমেরোর।
ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর স্ত্রীকে ছবিতে দেখা গেলেও তাঁর সম্পর্কে তথ্য বেশ কম। রোমেরোর স্ত্রী ক্যারেন ক্যাভালার। রোমেরোর পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুর দিনগুলো থেকেই ক্যারেন তাঁর পাশে রয়েছেন ছায়ার মতো।
এই দম্পতি ২০১৮ সালে তাঁদের নিজ শহর আর্জেন্টিনার কর্ডোবাতে ডেটিং শুরু করেন। রোমেরোর ক্যারিয়ার তাঁকে আর্জেন্টিনা থেকে ইতালি এবং পরে ইংল্যান্ডে নিয়ে গেলেও ক্যারেন তাঁকে সঙ্গে দিয়ে গেছেন। এখন তাঁকে প্রায়ই রোমেরোর বড় সাফল্যগুলো উদ্যাপন করতে দেখা যায়। দেখা যায় গ্যালারিতে বসে রোমেরোকে উৎসাহ দিতে। রোমেরো ও ক্যারেন দুই সন্তানের গর্বিত মা-বাবা। তাঁদের প্রথম পুত্র ভ্যালেন্তিনো রোমেরো জন্মেছে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে, লন্ডনে। তিন বছর পর, ২০২৪ সালের নভেম্বরে জন্মে এই দম্পতির দ্বিতীয় সন্তান লুসি রোমেরো। পুত্র ও কন্যা নিয়ে এখন তাঁদের সুখের সংসার। এই সুখ সবার সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার জন্য রোমেরো নিয়মিত সোশ্যাল মিডিয়ায় পারিবারিক মুহূর্তগুলো শেয়ার করেন।
ভিক্টর রোমেরো এবং রোজা রোমেরোর পুত্র ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। আর্জেন্টিনার কর্ডোবা শহরে, বলতে গেলে দারিদ্র্যসীমার নিচেই ছিল তাঁদের বসবাস। কিন্তু ভিক্টর রোমেরো ছেলের ফুটবলার হয়ে ওঠার পথে কোনো বাধা তৈরি করেননি। বরং কর্ডোবার মাদক-সাম্রাজ্য থেকে বাঁচিয়ে রোমেরোকে ফুটবলার করে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে গেছেন তিনি। ফলও পেয়েছেন। নিজের শহরের ক্লাব আতলেতিকো বেলগ্রানোতে তিনি ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু করে, এখন খেলছেন ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ক্লাব টটেনহাম হটস্পারে।
নিজের ক্যারিয়ারের উত্থানের ক্ষেত্রে মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের অবদান ভুলে যাননি রোমেরো। নিজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো করার কথা ভাবেন তিনি। রোমেরোর জীবনে সেটা দারুণ এক যাত্রাই বটে। আছে অনেক আবেগঘন গল্প।
মাঠের রুক্ষ ও আগ্রাসী ডিফেন্ডার রোমেরো মাকে খুব ভালোবাসেন। রোমেরো আর্জেন্টিনার ক্লাব আতলেতিকো বেলগ্রানোতে খেলে ক্যারিয়ারের প্রথম বড় অঙ্কের বেতন পান। সে অর্থ দিয়ে তিনি তাঁর মায়ের জন্য একটি বাড়ি কেনার পরিকল্পনা করেন। কথাটি মাকে না জানালেও জানিয়েছিলেন বাবাকে। মায়ের জন্মদিনের তিন সপ্তাহ আগে মাকে নিয়ে রোমেরো এবং তাঁর বাবা ভিক্টর বিভিন্ন নতুন বাড়ি দেখাতে নিয়ে যান। মা রোসা ভেবেছিলেন, ছেলে হয়তো নিজের থাকার জন্য বা ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে কোনো বাড়ি কিনতে চাচ্ছেন। সে ভাবনা থেকে তিনি ছেলেকে একটি সুন্দর বাড়ি পছন্দ করে দেন। বাড়ি পছন্দ হওয়ার পর রোমেরো আচমকা তাঁর মায়ের হাতে সেই বাড়ির চাবি তুলে দিয়ে বলেন, ‘এই বাড়িটি তোমার জন্মদিনের উপহার।’ রোমেরোদের নিজের কোনো বাড়ি ছিল না। ছেলের কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত ও বিশাল উপহার পেয়ে তাই তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন ভীষণ।
রোমেরো নিজে এখন খেলার সূত্রে লন্ডনে থাকলেও তাঁর মা-বাবা তাঁদের চেনা পরিবেশ আর্জেন্টিনার কর্ডোবাতেই স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। শুধু স্ত্রী আর সন্তান নিয়েই রোমেরোর পরিবার নয়। বাঙালি যে অর্থে পরিবার বোঝে, সেই মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে নিয়েই তাঁর পরিবার, এখনো।
সূত্র: অ্যাথলন স্পোর্টস ও অন্যান্য