২০৪০ সালের মধ্যে ১৮টি ভিন্ন খাতে ১ কোটি এআই-চালিত রোবট মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে জাপান। এই ঐতিহাসিক রোবোটিকস অভিযানের জন্য দেশটির সরকার আগামী পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার তহবিল বরাদ্দ করেছে। জাপানের ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় রোবোটিকস চালুর উদ্যোগ। ২০৪০ সালের মধ্যে ১ কোটি রোবটের এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা জাপানের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে দেশটির চরম শ্রমিকসংকট মেটাতে ফিজিক্যাল এআই-ভিত্তিক এই রোবট প্রযুক্তিই হতে চলেছে তাদের টিকে থাকার মূল কৌশল।
জাপানের ‘অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়’ এবং উদ্ভাবনী সংস্থা ‘এনইডিও’-এর অধীনে গঠিত হয়েছে একটি নতুন কনসোর্টিয়াম। এর নাম দেওয়া হয়েছে নোয়েত্রা। সফট ব্যাংক, এনইসি, সোনি এবং হোন্ডার যৌথ মালিকানাধীন এই কনসোর্টিয়ামের মূল লক্ষ্য হলো একটি ফিজিক্যাল এআই ফাউন্ডেশন মডেল তৈরি করা। এটি এমন একটি মাল্টিমোডাল এআই সিস্টেম, যা ভাষা, ছবি, ভিডিও এবং সেন্সর ডেটা একসঙ্গে প্রসেস করবে এবং রোবটকে বাস্তব পরিবেশে সিদ্ধান্ত নিতে ও নির্ভুলভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে। ফুজিতসু ও রাকুটেনও এই কনসোর্টিয়ামে যোগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে। ২০২৬ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই নোয়েত্রার প্রথম ব্যবহারিক মডেল উন্মোচন করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।
১৯৯৫ সালে জাপানের কর্মক্ষম জনসংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছানোর পর থেকে তা ক্রমাগত কমছে। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৭৩ দশমিক ৭ মিলিয়নে। বর্তমানে দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বা তার বেশি। রিক্রুট ওয়ার্কস ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সালের তুলনায় ২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে শ্রমিকের ঘাটতি দাঁড়াবে ১১ মিলিয়ন বা ১ কোটি ১০ লাখে। অন্যদিকে ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে জাপানের ৬৫ লাখ বা ৬ দশমিক ৫ মিলিয়ন বিদেশি কর্মী প্রয়োজন। কিন্তু দেশটির অত্যন্ত কঠোর অভিবাসন নীতির কারণে এটি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই জাপানের এই বিশাল রোবট বাহিনী গড়ার সিদ্ধান্ত কেবল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা নয়, অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
এই পরিকল্পনার অধীনে মূলত ১৮টি শিল্প ও সেবা খাতকে রোবট দিয়ে সচল করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রধান হলো খাবার তৈরি ও রেস্তোরাঁয় স্বয়ংক্রিয়ভাবে খাবার তৈরি, প্যাকেজিং ও পরিবেশন করা।
হাসপাতাল ও নার্সিং হোমে রোগীদের সেবা দেওয়া, তাদের গতিশীলতায় সহায়তা করা এবং নিয়মিত কাজের তদারকি।
ফুকুশিমা দাইইচি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চুল্লি নিষ্ক্রিয় করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সংগৃহীত ডেটা ব্যবহার করে দুর্যোগকালীন উদ্ধার কাজ পরিচালনা।
জাপানের এই ঘোষণার পরপরই দক্ষিণ কোরিয়া ৮৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিশাল প্রযুক্তিগত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তারা ২০২৮ সালের মধ্যে ১০টি প্রধান শিল্পে হিউম্যানয়েড অর্থাৎ মানুষের মতো রোবট বাণিজ্যিকভাবে নামাতে চায়। বর্তমানে প্রতি ১০ হাজার কর্মীর বিপরীতে ১ হাজার ১২টি রোবট নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের সবচেয়ে বেশি রোবট ব্যবহারকারী দেশ। এ ছাড়া হুন্দাই তাদের বোস্টন ডায়নামিকস সাবসিডিয়ারির মাধ্যমে প্রতিবছর ৩০ হাজার অ্যাটলাস রোবট তৈরির পরিকল্পনা করছে। পাশাপাশি চীনও এজিবোট ও ইউনিট্রির মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এই প্রতিযোগিতায় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: দ্য ডেইলি ডাইজেস্ট, মিমবার্ন