ফিড স্ক্রল করছিলেন শান্ত মনে। হঠাৎ চোখ আটকে গেল চমৎকার এক দৃশ্যে। ঝুম বৃষ্টিতে এক মা পাখি ডানায় আগলে রেখেছে ছানাদের। পাখিটি নড়ছে না একচুলও। ক্যাপশনে লেখা—‘মায়ের ভালোবাসা’। দৃশ্যটি দেখে মনটা ভরে গেল, তাই না? কিন্তু কিছুক্ষণ দেখার পর বুঝতে পারলেন ভিডিওটি আসলে সত্য নয়। পুরোটাই এআই দিয়ে তৈরি। ইন্টারনেটের দুনিয়ায় এখন এমন ভুয়া ভিডিওর ছড়াছড়ি। প্রথম দর্শনে এগুলোকে নির্দোষ মনে হয়। কিন্তু এটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। তাঁরা বলছেন, এসব মিষ্টি ভিডিও মোটেও নির্দোষ নয়। তাঁদের দাবি, বাস্তব দুনিয়ার বন্য প্রাণীদের জন্য এটি এক বড় হুমকি।
ক্যাট মিমে ও কৌতুকপূর্ণ প্রাণীদের ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্ব ইন্টারনেটের যে বিস্তার, সেখানে এখন থাবা বসিয়েছে জেনারেটিভ এআই। কৃত্রিমভাবে তৈরি এসব বন্য প্রাণীর ফুটেজ সাধারণ মানুষের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাচ্ছে, যা প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতি করছে বৈশ্বিক পরিবেশ সংরক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার। সম্প্রতি কনজারভেশন বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব কর্ডোবার একদল গবেষক এ বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। গবেষকদের মতে, এআই-নির্মিত বন্য প্রাণীর ভিডিও পশুপাখির আচরণ সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করছে।
ভুল মাতৃত্বের চিত্রায়ণ: পাখিছানাদের বৃষ্টি থেকে বাঁচানোর ভাইরাল ভিডিওগুলোতে বলা হচ্ছে এটি ‘মায়ের ভালোবাসা’। অথচ গবেষণায় দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ পাখি প্রজাতিতেই বাবা-মা উভয়ই ছানা লালন-পালন করে। আবার সরীসৃপ, উভচর বা মাছের অনেক প্রজাতি সন্তানদের কোনো যত্নই নেয় না।
অবাস্তব হিংস্রতা বা প্রীতি: হিংস্র শিকারি ও শিকারের মধ্যকার কৃত্রিম বন্ধুত্ব কিংবা পরজীবীদের অদ্ভুত ভালোবাসা দেখানো হচ্ছে।
অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য: হিংস্র বন্য প্রাণীকে উদ্ধার বা মানুষের সঙ্গে তাদের কৃত্রিম সখ্য দেখানোর দৃশ্য মানুষকে বন্য প্রাণী সম্পর্কে একটি মিথ্যা নিরাপত্তাবোধ দিচ্ছে। এটি বিদেশি পোষা প্রাণীর চাহিদা ও অবৈধ বাণিজ্য বাড়াতে পারে।
এ ছাড়া এআই কনটেন্ট প্রধানত স্তন্যপায়ী প্রাণীদের দিকে বেশি ঝুঁকে থাকে। ফলে যেসব প্রাণী দেখতে ততটা সুন্দর নয়, সেগুলোর সংরক্ষণ প্রকল্পে তহবিলসংকট তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে ভূ-ট্যাগযুক্ত ভুয়া ভিডিও দেখে পর্যটকেরা এমন স্থানে ভিড় জমাতে পারেন, যেখানে ওই প্রাণী কখনোই ছিল না, যা স্থানীয় পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে।
নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভল্যুশন সাময়িকীতে প্রকাশিত আরও একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, এআই সম্পাদিত বা মান উন্নত করা ছবি নাগরিক-বিজ্ঞান প্ল্যাটফর্মে জমা পড়ায় গবেষকদের ডেটা দূষিত হচ্ছে। গবেষকেরা একটি বাস্তব উদাহরণ তুলে ধরেন। তাঁরা দেখান, ব্রাজিলে পাওয়া একটি পাখির ছবি ‘আইন্যাচারালিস্ট’-এ জমা পড়ে, যা উত্তর আমেরিকার ‘রেড-উইঙ্গড ব্ল্যাকবার্ড’ বলে মনে করা হয়েছিল। অথচ সেটি ছিল স্থানীয় সাধারণ ‘এপোলেট ওরিয়ল’। মূলত, ব্যবহারকারী ছবিটির মান উন্নত করতে গুগলের এআই ইমেজ এডিটর ব্যবহার করেছিলেন। এটি এআইয়ের ট্রেইনিং ডেটার ওপর ভিত্তি করে ভুল মার্কিং যোগ করে দিয়েছিল। ব্যবহারকারীর অসৎ উদ্দেশ্য না থাকলেও বৈজ্ঞানিক ডেটার মারাত্মক ক্ষতি হয়ে যায়।
জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালযের মিডিয়া স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক জেসিকা ম্যাডক্স ও বিবিসির জ্যেষ্ঠ প্রযুক্তি সাংবাদিক থমাস জার্মেইনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআইয়ের এই ভুয়া ভিডিও মানুষের ভেতরের পারস্পরিক মানবিক সংযোগ নষ্ট করছে। আসল কোনো ঘটনার ভিডিও দেখে যে আনন্দ পাওয়া যেত, এআই তা পুরোপুরি মুছে দিচ্ছে এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের আরও হতাশ ও সন্দেহপ্রবণ বানিয়ে তুলছে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে এআই ভিডিওর বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী কঠোর আইনি নিয়ন্ত্রণ সহজলভ্য নয়। তাই গবেষকেরা আইনি ব্যবস্থার চেয়ে সাধারণ মানুষের মিডিয়া সচেতনতা বাড়ানো ও অনলাইনের সবকিছুকে প্রশ্ন করার মানসিকতা তৈরির ওপর জোর দিচ্ছেন।
সূত্র: বিবিসি, ইউরো নিউজ