মাঝেমধ্যেই আমাদের চকলেট খাওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছা বা ‘ক্রেভিং’ হয়। আমরা একে সাধারণ মিষ্টি খাওয়ার ইচ্ছা মনে করি। কিন্তু শরীর আসলে এর মাধ্যমে আমাদের বিশেষ কিছু সংকেত দেয়। এর বিশেষ কিছু কারণ আছে। মনে রাখবেন, চকলেটের প্রতি তীব্র ইচ্ছা আপনার শরীরের কোনো দুর্বলতা নয়। এটি শরীরের একটি ফিডব্যাক। সঠিক পুষ্টি ও বিশ্রামের মাধ্যমে এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
শরীরে পানির অভাব
শরীর যখন পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তখন জমানো শর্করা বা গ্লুকোজ ব্যবহার করা শরীরের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে শরীর দ্রুত শক্তির উৎস হিসেবে মিষ্টি বা চকলেট জাতীয় খাবারের সংকেত পাঠায়।
মানসিক চাপ ও ক্লান্তি
চকলেটকে বলা হয় ‘কমফোর্ট ফুড’। মানসিক চাপের সময় চকলেট খেলে মস্তিষ্কে ডোপামিন ও সেরোটোনিন হরমোন নিঃসৃত হয়, যা সাময়িকভাবে মন ভালো করে দেয়। এ ছাড়া চকলেট থাকা ক্যাফেইন ক্লান্ত শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে।
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি
কোকো বা চকলেটে প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেশিয়াম থাকে। আপনার শরীরে যদি এই খনিজের অভাব থাকে, তবে শরীর অবচেতনভাবেই চকলেটের খোঁজ করে। ম্যাগনেশিয়াম পেশি শিথিল করতে এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা ঠিক রাখতে সাহায্য করে।
রক্তে শর্করার ভারসাম্যহীনতা
যদি আপনার খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন বা হেলদি ফ্যাট না থাকে, তবে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত কমে যেতে পারে। এ সময় মস্তিষ্ক দ্রুত শক্তির জন্য চকলেটের দাবি জানায়। বিশেষ করে রাতে চকলেটের ক্রেভিং হওয়ার অর্থ হলো, আপনার রাতের খাবারে পুষ্টির ঘাটতি ছিল।
পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও অভ্যাস
অনেক সময় চকলেটের বিজ্ঞাপন দেখা বা মিষ্টি কোনো গন্ধ পাওয়া আপনার চকলেটের ইচ্ছাকে জাগিয়ে তোলে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে এটি একটি সাংস্কৃতিক অভ্যাস (যেমন—পিরিয়ডের সময় চকলেট খাওয়া), যা মূলত মনস্তাত্ত্বিক।
হরমোনের পরিবর্তন
নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ওঠানামা মেজাজ এবং খাওয়ার ইচ্ছার ওপর প্রভাব ফেলে। এ সময় শরীর মানসিক প্রশান্তির জন্য চকলেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। পিল বা পিরিয়ডের সময় চকলেট খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা হওয়াকে আমরা সাধারণত একটি জৈবিক প্রক্রিয়া মনে করি। কিন্তু এর পেছনে বড় একটি কারণ হতে পারে সাংস্কৃতিক প্রভাব। অনেকেই মনে করেন, পিরিয়ডের সময় হরমোনের ভারসাম্যহীনতা বা পুষ্টির ঘাটতির কারণে চকলেট খেতে ইচ্ছা করে। কিন্তু আধুনিক গবেষণায় এ তত্ত্বগুলো অনেকটা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা এখন মনে করছেন, এটি শরীরের প্রয়োজনের চেয়েও বেশি আমাদের সংস্কৃতির একটি অংশ। পিরিয়ডের সময় চকলেটের প্রতি এই বিশেষ আকর্ষণ মূলত যুক্তরাষ্ট্রে বেশি দেখা যায়; কিন্তু বিশ্বের অন্য অনেক দেশে এটি বিরল। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নারীদের মধ্যে ৩২.৭ শতাংশের পিরিয়ডের সময় চকলেট খাওয়ার তীব্র ইচ্ছা অনুভব করেন। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী কিন্তু অন্য দেশে জন্ম নেওয়া নারীদের মধ্যে এই হার মাত্র ১৭.৩ শতাংশ। গবেষকদের মতে, আমরা ছোটবেলা থেকে যা শুনি বা দেখি তা আমাদের মস্তিষ্কে একধরনের প্রত্যাশা সৃষ্টি করে। আমেরিকান সংস্কৃতিতে পিরিয়ড এবং চকলেটের এই যোগসূত্রটি এতটাই দৃঢ় যে, নারীরা অবচেতনভাবেই এ সময়ে চকলেটের খোঁজ করেন।
চকলেট ক্রেভিং কমানোর উপায়
-পর্যাপ্ত পানি পান করুন। তৃষ্ণা অনেক সময় ক্ষুধার বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।
-ডার্ক চকলেট বেছে নিন। অন্তত ৭০ শতাংশ কোকোসমৃদ্ধ ডার্ক চকলেট খান। এতে চিনি কম এবং পুষ্টি বেশি থাকে।
-পুষ্টিকর খাবার খান। নিয়মিত বাদাম, বীজ, ডিম ও চর্বিহীন প্রোটিন খান, যা ম্যাগনেশিয়াম ও প্রোটিনের ঘাটতি মেটাবে।
-মনোযোগ ঘুরিয়ে নিন। যখনই ক্রেভিং হবে, নিজেকে অন্য কাজে ব্যস্ত রাখুন অথবা হালকা ব্যায়াম করুন।
সূত্র: ভেরি ওয়েল হেলথ, হেলথ শর্টস