শীতের আমেজ কাটিয়ে প্রকৃতি এখন বসন্তের অপেক্ষায়। ঋতু পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে চারপাশের ধুলোবালি যেমন বাড়ছে, তেমনি বদলাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের ধরন। শীতের ভয়ে যাঁরা এত দিন গোসল নিয়ে কিছুটা আলসেমি করেছেন, তাঁদের এখন নিয়মিত রুটিনে ফেরার সময় হয়েছে। তবে গোসল মানেই কেবল শরীরে পানি ঢালা নয়; চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, উজ্জ্বল ও সুস্থ ত্বকের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে গোসলের সঠিক পদ্ধতির ওপর। ত্বকের যত্ন শুধু দামি সেরাম বা ক্রিম মাখায় হয় না। এটি শুরু হয় গোসলখানা থেকে। গোসলের নিয়মে কিছু ছোটখাটো পরিবর্তনে আপনার ত্বক শুধু পরিষ্কারই থাকবে না, বরং বসন্তের ধুলোবালির মাঝেও দেবে স্বাস্থ্যকর ও উজ্জ্বল আভা।
গোসলের সময় ও তাপমাত্রা
অনেকের সকালে গোসল করে দিন শুরু করা পছন্দ। আবার অনেকে রাতে শান্তিতে ঘুমানোর জন্য গোসল করেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময় যা-ই হোক, আসল বিষয় হলো, আপনি কীভাবে গোসল করছেন। যেমন খুব বেশি সময় ধরে পানির নিচে থাকা ত্বকের প্রাকৃতিক আর্দ্রতা কমিয়ে দেয়; বিশেষ করে যাঁদের ত্বক শুষ্ক, তাঁদের ৫ মিনিটের বেশি গোসল করা উচিত নয়। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে না থেকে গোসলের কাজ দ্রুত শেষ করুন। হাড়কাঁপানো শীতে গরম পানি আরামদায়ক হলেও ত্বকের জন্য তা ক্ষতিকর। গোসলের জন্য কুসুম গরম পানি বেছে নিন। এটি ত্বকের লোমকূপ পরিষ্কার করে কিন্তু প্রাকৃতিক তেল কেড়ে নেয় না। আর গোসল শেষ করার ঠিক আগে শরীরে একবার ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিন; এতে লোমকূপ বন্ধ হয় এবং রক্তসঞ্চালন বাড়ে।
চুল ও মাথার ত্বকের যত্ন
ভেজানোর আগে চুলে ভালোভাবে চিরুনি দিয়ে জট ছাড়িয়ে নিন। এতে গোসলের সময় চুল ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় থাকে না। চুল মৃত কোষ দিয়ে তৈরি বলে প্রতিদিন শ্যাম্পু করার প্রয়োজন নেই। তবে মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্প সপ্তাহে অন্তত একবার পরিষ্কার করা জরুরি, যাতে খুশকি বা লালচে ভাব না হয়। কন্ডিশনার ব্যবহারের সময় সেটি চুলের গোড়া বাদ দিয়ে শুধু লম্বা অংশে লাগান এবং তা বেশিক্ষণ রেখে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
পরিষ্কারক ও স্ক্রাবিংয়ের নিয়ম
সাবান বনাম ক্লিনজার: সাধারণ ক্ষারযুক্ত সাবান ত্বকের তেল নষ্ট করে দেয়। এর বদলে সুগন্ধহীন ও কোমল বডি ওয়াশ বা ক্লিনজার ব্যবহার করুন। অ্যান্টি-ব্যাকটেরিয়াল ক্লিনজার অনেক সময় ত্বক বেশি শুষ্ক করে ফেলে, তাই সতর্ক থাকুন।
পরিষ্কার করার ধাপ: গোসল শুরু করুন ওপর থেকে নিচে। অর্থাৎ মাথা থেকে পায়ের দিকে। শরীরের ভাঁজগুলো ও পায়ের পাতায় সাবান ব্যবহারে বেশি গুরুত্ব দিন। কারণ, শরীরের এই অংশগুলো থেকে মূলত দুর্গন্ধ ছড়ায়।
লুফা ও স্ক্রাবিং: লুফায় ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর ভয় থাকে। তাই এটি ব্যবহার করলে নিয়মিত শুকিয়ে নিন এবং প্রতি মাসে বদলে ফেলুন। সপ্তাহে বড়জোর একবার বা দুবার ত্বক এক্সফোলিয়েট করুন। ত্বকে ব্রণ থাকলে সেখানে ঘষাঘষি না করে রাসায়নিক এক্সফোলিয়েট ব্যবহার করা বুদ্ধিমানের কাজ।
গোসল-পরবর্তী জরুরি যত্ন
মুখ ধোয়া: সম্ভব হলে শাওয়ারের নিচে মুখ না ধুয়ে বেসিনে ধোয়ার চেষ্টা করুন। এতে ঠান্ডা পানির ব্যবহার সহজ হয় এবং ব্যাকটেরিয়া প্রবেশের ঝুঁকি কমে।
শরীর শুকানোর সঠিক পদ্ধতি: তোয়ালে দিয়ে শরীর খুব জোরে না ঘষে আলতো করে মুছে নিন। চাইলে তোয়ালের বদলে বাথরোব ব্যবহার করতে পারেন, যা ঘষা ছাড়াই পানি শুষে নেয়। তবে শরীরের ভাঁজযুক্ত অংশগুলো (যেমন আঙুলের ফাঁক, বগল ইত্যাদি) ভালো করে শুকানো নিশ্চিত করুন, যাতে ছত্রাক সংক্রমণ না হয়।
ময়শ্চারাইজিং উইন্ডো: গোসল শেষ করে বাথরুম থেকে বের হওয়ার পরবর্তী ৩ মিনিটের মধ্যে ময়শ্চারাইজার ব্যবহার করুন। এটি ত্বকের ভেতরে আর্দ্রতা আটকে রাখে। লোশনের বদলে ক্রিম ব্যবহার করা বেশি কার্যকর। কারণ, ক্রিমে অ্যালকোহলের পরিমাণ কম থাকে।
ব্যবহার করুন সঠিক সাবানটি
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, গোসলের সাবান বা বডি ওয়াশ নির্বাচনের ওপর আপনার ত্বকের স্বাস্থ্য অনেকাংশে নির্ভর করে। বাজারে সলিড বার সোপ এবং তরল বডি ওয়াশ—উভয়ই জনপ্রিয়। তবে এদের গুণাগুণ ভিন্ন। আপনার ত্বকের জন্য কোনটি সঠিক, তা বুঝতে হলে জানতে হবে কিছু তথ্য। যাঁদের ত্বকে বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রতি সংবেদনশীলতা বা অ্যালার্জি আছে, তাঁদের জন্য সাধারণ বার সোপ বেশি কার্যকর। কারণ, এতে বডি ওয়াশের তুলনায় উপকরণের সংখ্যা কম থাকে। অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল সাবান শরীরের দুর্গন্ধ এবং ব্যাকটেরিয়া কমাতে সাহায্য করে। তবে আমেরিকার এফডিএর মতে, এ ধরনের সাবানের অতিরিক্ত ব্যবহার হরমোনের পরিবর্তন বা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে গ্লিসারিনযুক্ত সাবান ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক হওয়া থেকে রক্ষা করে। অন্যদিকে সুপারফ্যাটেড বার ত্বকের ওপর লিপিডের একটি পাতলা আবরণ তৈরি করে, যা কোমল অনুভূতি দেয়। কিছু সাবানে খনিজ তেল বা প্যারাফিন থাকে, যা গবেষণায় ক্ষতিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ ছাড়া তীব্র ক্লিনজার সমৃদ্ধ সাবান ত্বক খসখসে ও রুক্ষ করে তুলতে পারে।
বডি ওয়াশে সাবানের তুলনায় উপকরণের তালিকা দীর্ঘ হলেও এতে ব্যবহৃত ক্লিনজিং উপাদানগুলো বেশ মৃদু হয়। বডি ওয়াশ বা লিকুইড জেল যাতে নষ্ট না হয় বা তাতে ছত্রাক না জন্মায়, সে জন্য বাড়তি প্রিজারভেটিভ বা সংরক্ষণকারী উপকরণ ব্যবহার করা হয়। বার সোপে এই বাড়তি রাসায়নিকের প্রয়োজন পড়ে না। গবেষণায় দেখা গেছে, নারকেল তেল বা রোজমেরির মতো ভেষজ নির্যাসযুক্ত ক্লিনজার ত্বক আর্দ্র রাখে। এ ছাড়া অ্যাভোকাডো অয়েল, শিয়া বাটার বা অলিভ অয়েল সমৃদ্ধ বডি ওয়াশ ত্বকের প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে।
ত্বক ভালো রাখার জন্য অনেক অর্থ ব্যয় করা জরুরি নয়। জরুরি হলো, নিয়ম মেনে সঠিক কাজটি করা। এ জন্য সচেতনতার বিকল্প নেই।
সূত্র: হেলথ লাইন, টু ডে, টিন ভোগ