বর্তমানে আমরা বিভিন্নভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করি—কখনো ছবি এডিট করতে, কখনো সুন্দর ক্যাপশন পেতে, কখনো কাজের ক্ষেত্রে, আবার লেখাপড়ার ক্ষেত্রেও। আপনার কি মনে হয় এআই সত্যিই বুদ্ধিমান। প্রযুক্তি দুনিয়ার অন্যতম শীর্ষ ব্যক্তিত্ব ও মেটার সাবেক প্রধান এআই বিজ্ঞানী ইয়ান লেকান কিন্তু তা একেবারেই মনে করেন না। তাঁর মতে, বর্তমানের চ্যাটজিপিটি, ক্লড বা জেমিনির মতো এআই সিস্টেমগুলোর কোনো বাস্তব বা অন্তর্নিহিত বোধশক্তি নেই। এমনকি একটি সাধারণ ইঁদুর যেভাবে বাস্তব পৃথিবীকে বুঝতে পারে, আমাদের সবচেয়ে উন্নত রোবটগুলোও আজ পর্যন্ত সেই স্তরে পৌঁছাতে পারেনি।
অবাক হচ্ছেন? ভাবছেন, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ কী। মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে—চ্যাটজিপিটির যুগ পেরিয়ে এআই প্রযুক্তি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে। এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে অন্য এক প্রযুক্তিতে; যার নাম ‘ওয়ার্ল্ড মডেলস’।
চ্যাটজিপিটি বা জেমিনির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলগুলো কোডিং করা, গণিতের সমাধান বা চমৎকার লেখা তৈরিতে দারুণ দক্ষ। কিন্তু লেকানের মতে, এগুলো কেবলই তথ্য রোমন্থন বা ‘রেগার্জিটেশন’ করে। তাদের বাস্তব দুনিয়া সম্পর্কে কোনো বাস্তবসম্মত ধারণা নেই। যেমন—একটি কলমকে খাঁড়া করে ধরে ছেড়ে দিলে সেটি পড়ে যাবে। এই তথ্য একটা শিশুও জানে। কিন্তু সেটি ঠিক কোন দিকে পড়বে, তা নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। বর্তমানের এলএলএমকে এই প্রশ্ন করলে সে তার ডেটা ঘেঁটে একটি নির্দিষ্ট দিকে পড়ার পরিসংখ্যানগত ভবিষ্যৎবাণী করার চেষ্টা করবে, যা প্রায় নিশ্চিতভাবেই ভুল হবে। কারণ, সে পরিস্থিতির পেছনের ভৌতিক বা বাস্তব সত্যটা বোঝে না। এটি শুধু সম্ভাব্য শব্দের বিন্যাস তৈরি করে। আর এই কারণেই ঘরের কাজ করা বা থালাবাসন ধোয়ার মতো সাধারণ কিন্তু পরিবর্তনশীল বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে বর্তমানের রোবট ও এআই সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
চ্যাটজিপিটির এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে প্যারিসভিত্তিক স্টার্টআপ ‘এএমআই ল্যাবস’ কাজ করছে এক নতুন প্রযুক্তি নিয়ে। যার নাম জায়েন্ট এমবেডিং প্রেডিক্টিভ আর্কিটেকচার বা জিপিএ। এটি বাস্তব দুনিয়াকে মানুষের মতো করে বুঝতে সাহায্য করে। এই প্রযুক্তি অপ্রয়োজনীয় তথ্য বাদ দিয়ে কেবল কাজের তথ্যগুলো মনে রাখে। কলমের উদাহরণে, এই এআই বুঝতে পারবে যে, কলমটি কোন দিকে পড়বে, তা নিখুঁতভাবে বলা সম্ভব নয়। তাই সে অনুমান করার পেছনে সময় নষ্ট করবে না। এনভিডিয়া ও জেফ বেজোসের মতো বড় বিনিয়োগকারীরা ইতিমধ্যেই এই প্রযুক্তিতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে।
একইভাবে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইংমার পজনার ও তাঁর দল কাজ করছে ‘মেকানিস্টিক ওয়ার্ল্ড মডেল’ নিয়ে। পজনার মনে করেন, আগামী দশকের এআই হবে এমন, যা ব্যাখ্যা করতে পারবে যে, কোন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তা ব্যাখ্যা করতে পারবে—কোন কাজের পেছনে কারণ কী এবং একটির বদলে অন্য সিদ্ধান্ত নিলে কী ঘটতে পারত। এটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো জ্ঞানকে এমনভাবে সাজিয়ে রাখবে যেন প্রয়োজন অনুযায়ী তা জোড়া দিয়ে নতুন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা যায়। গুগল ডিপমাইন্ডের ‘জিনি’, লন্ডনভিত্তিক ওয়েভের ‘গাইয়া’ এবং বিশ্বখ্যাত গবেষক ফেই-ফেই লির ‘ওয়ার্ল্ড ল্যাবস’-ও এই ওয়ার্ল্ড মডেল বা বিশ্বস্তরের সিমুলেশন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এর সাহায্যে এআই কোনো কাজ বাস্তবে করার আগেই নিজের ‘মনে মনে’ তার ভবিষ্যৎ ফলাফল বা সিমুলেশন অনুকরণ করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
ইয়ান লেকানের লক্ষ্য, ২০২৬ সালের মধ্যে এই নতুন মডেলকে শিল্পক্ষেত্রে পরীক্ষামূলকভাবে নামানো। সফল হলে ভবিষ্যতে এমন এক সাধারণ বুদ্ধিমত্তা তৈরি হবে, যা যেকোনো বাস্তব পরিস্থিতিতে সামান্য ট্রেনিংয়েই কাজ করতে পারবে। এবার ভাবছেন, তাহলে মানুষের স্থান কোথায় হবে? এ বিষয়ে লেকান বিবিসিকে আশ্বস্ত করে বলেন, রোবট স্বাধীনভাবে কাজ করলেও মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে যাবে না। কী তৈরি করতে হবে, কী প্রশ্ন করতে হবে বা কোন দিকে এগোতে হবে, তা মানুষই ঠিক করবে। ভবিষ্যতে আমাদের ও এআইয়ের সম্পর্কটা হবে একজন বড় ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে তাঁর চতুর কর্মকর্তাদের মতো। কর্মকর্তারা হয়তো নেতার চেয়েও অনেক বেশি বুদ্ধিমান বা জ্ঞানী হতে পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁরা নেতার নির্দেশেই কাজ করেন। এআইও ঠিক সেভাবেই মানুষের সহকারী হিসেবে কাজ করবে।
সূত্র: বিবিসি