বৈবাহিক সম্পর্ক সাধারণত হঠাৎ খারাপ হয়ে যায় না। দায়িত্ব, যোগাযোগ ও ব্যক্তিগত ছোট ছোট অমিল ধীরে ধীরে জমে বড় ফাটল তৈরি করে। এমনটাই মনে করেন চীনের ঝেজিয়াং ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের মনোবিজ্ঞানী লুয়ো মিংজিন। তিনি ‘লাইফ নেভার এন্ডস’ বইয়ে লিখেছেন, ‘অনেক আধুনিক দম্পতি একই ছাদের নিচে থেকেও গভীর একাকিত্বে ভুগছেন।’
হাজারো দাম্পত্য কাউন্সেলিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এমন চার ধরনের অমিল চিহ্নিত করেছেন, যা নীরবে একটি সংসারকে ভাঙনের পথে ঠেলে দেয়। তবে তিনি শুধু সংকটের কথাই বলেননি, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথও দেখিয়েছেন।
দায়িত্বের অমিল
ড. লুয়োর ভাষায়, ‘দাম্পত্য জীবন একধরনের যুগল নাচ। তাল মিল না হলে পায়ের ওপর পা পড়বেই।’ একজন সঙ্গীর প্রত্যাশা আর বাস্তব দায়িত্বের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হলেই দ্বন্দ্ব শুরু হয়। যেমন স্বামী যদি মনে করেন, ‘পুরুষ বাইরে কাজ করবে, নারী ঘর সামলাবে’। কিন্তু স্ত্রী আধুনিক কর্মজীবী হয়ে সংসার ও সন্তান পালনে স্বামীর সক্রিয় অংশগ্রহণ চান, এখানেই মূল দ্বন্দ্ব।
সমাধান: অস্পষ্ট প্রত্যাশা না রেখে দুজনে বসে দায়িত্বগুলো স্পষ্টভাবে ভাগ করে নিন। কে বাসন মাজবে, কে সন্তানকে পড়াবে। এসব লিখিত তালিকা কথার চেয়ে বেশি কাজে দেয়। অভিযোগ না করে অনুরোধের ভাষা ব্যবহার করুন। যেমন ‘আমি বাচ্চাদের পড়া শেষ করেছি, তুমি কি টেবিলটা গুছিয়ে দিতে পার?’
যোগাযোগের অমিল
এটা দুজন দুই ফ্রিকোয়েন্সির ওয়াকি-টকি ব্যবহার করার মতো। স্ত্রী যখন বলেন, ‘তুমি পরিবার নিয়ে ভাব না’, এর মানে তার আসল চাওয়া বোঝাপড়া। কিন্তু স্বামী সেটাকে অভিযোগ হিসেবে নেন। আবার স্বামী চুপ থাকলে স্ত্রী সেটাকে শাস্তি বা ‘নীরব সহিংসতা’ হিসেবে দেখেন।
সমাধান: প্রতিটি দম্পতিরই নিয়মিতভাবে নিরিবিলি কথা বলার আলাদা সময় থাকা জরুরি। সপ্তাহে অন্তত ৩০ মিনিট এমন সময় রাখুন যখন দুজন ছাড়া আর কিছুই গুরুত্বপূর্ণ নয়। সেই সময় মোবাইল ফোন, টিভি বা অন্য কোনো ব্যস্ততা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। এতে সঙ্গী বুঝতে পারেন, এই সময়টুকু পুরোপুরি তাঁর জন্যই বরাদ্দ।
এই কথোপকথনে অভিযোগ বা তর্কে যাওয়ার দরকার নেই। নিজের অনুভূতি শান্তভাবে প্রকাশ করুন। অনেক সময় দাম্পত্য কলহের মূল কারণ কথার অভাব নয়, ঠিকভাবে বুঝতে না পারা। নিয়মিত এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে সম্পর্কের দূরত্ব ধীরে ধীরে কমে আসে এবং বোঝাপড়ার জায়গা আরও শক্ত হয়।
সংসারের ভেতরে নিঃসঙ্গতা
এই সমস্যা তৈরি হয় যখন স্বামী-স্ত্রীর নিজের পরিবার আর দুপক্ষের বাবা-মায়ের ভূমিকায় সামঞ্জস্য না থাকে। যেমন শাশুড়ি যদি নাতি-নাতনির বিষয়ে অতিরিক্ত সিদ্ধান্ত নিতে চান আর স্বামী সেখানে স্ত্রীর পাশে না দাঁড়িয়ে মায়ের পক্ষ নেন, তখন স্ত্রী নিজের সংসারেই একা ও অসহায় বোধ করেন।
সমাধান: নীতিগতভাবে স্বামী-স্ত্রী দুজনকে আগে একমত হতে হবে যে তাদের সম্পর্কই সবার আগে। সংবেদনশীল বা জটিল বিষয়ে সরাসরি একে অপরের বাবা-মাকে জড়িয়ে না দিয়ে, প্রত্যেকে নিজের অভিভাবকের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবেন। এতে ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রয়োজনীয় টানাপোড়েন কমে।
ব্যক্তিগত বিকাশে অমিল
যদি একজন সঙ্গীকে ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করেন। কিন্তু অন্যজন একই জায়গায় থেমে থাকেন, তখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। ধীরে ধীরে মিলের জায়গাগুলো কমে আসে।
সমাধান: যিনি এগিয়ে যাচ্ছেন, তিনি যেন সহজভাবে বিষয়গুলো সঙ্গীর সঙ্গে ভাগ করে নেন। পাশাপাশি দুজন মিলে নতুন কিছু শেখার চেষ্টা করুন। যেকোনো দক্ষতা অর্জন, বই পড়া বা ছোট কোনো কোর্স হতে পারে। যাতে সম্পর্কের দূরত্ব তৈরি না হয়।
সংকটের মুহূর্তে করণীয়
স্বল্প মেয়াদ (১ থেকে ৭ দিন): এটি হলো বড় ঝগড়া বা মানসিক আঘাতের পরের সময়। এই সময়ে আবেগ সবচেয়ে তীব্র থাকে। তাই আগে রাগ ঠান্ডা করুন। রাগের মাথায় বিচ্ছেদ বা চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেবেন না। নিজের মন হালকা করতে ডায়েরি লিখুন, হাঁটুন বা ব্যায়াম করুন।
মাঝারি মেয়াদ (১ থেকে ৩ মাস): প্রাথমিক আবেগ কিছুটা কমে এলে এই সময়টা কাজে লাগান সম্পর্কের সমস্যা বুঝতে ও ঠিক করতে। কথা বলার ধরন বদলান, একে অপরের কথা মন দিয়ে শুনুন। প্রয়োজন হলে মনোবিজ্ঞানী বা দাম্পত্য কাউন্সেলরের সাহায্য নিন।
দীর্ঘ মেয়াদ: এই ধাপ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার সময়। সম্পর্ক টিকে থাকুক বা ভেঙে যাক, নিজের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনুন, জীবনের লক্ষ্য নতুন করে ঠিক করুন এবং মানসিকভাবে নিজেকে শক্ত করে তুলুন।
সূত্র: ভিএন এক্সপ্রেস