মানুষের কত রূপ থাকতে পারে, তা না জানলে বোঝা কঠিন। এই ধরুন, আপনার প্রতিদিনের চেনা ভিক্ষুকটি যদি হন কোটিপতি, সে সংবাদ আপনার ‘হজম করা’ কঠিন হতে পারে। তাই ব্যস্ত রাস্তার পাশে ভিক্ষা করতে থাকা মানুষ দেখলেই দারিদ্র্য আর সংগ্রামের ছবি আঁকবেন না মনে মনে। হ্যাঁ, হতে পারে যে ভিক্ষা করা মানুষদের বেশির ভাগ সত্যিই দরিদ্র। ছেঁড়া জামাকাপড় পরে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ব্যস্ত শহরের ভিড়ে কিছু খুচরা টাকার আশায় বসে থাকেন সারা দিন। হতে পারে। কিন্তু মাঝেমধ্যে এমন কিছু ঘটনা আপনার সামনে আসতে পারে, যা আপনার পরিচিত ছবিটাকে উল্টে দেবে। ভারতের মধ্যপ্রদেশের ইন্দোর শহরের মঙ্গিলালের গল্প ঠিক তেমনই।
ইন্দোর শহর ও সরফা বাজারের প্রেক্ষাপট
ইন্দোর শহরে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ গৃহহীন মানুষ বসবাস করেন বলে জানা যায় বিভিন্ন সূত্রে। শহরের অন্যতম ব্যস্ত ও মূল্যবান ধাতুর ব্যবসার জন্য পরিচিত এলাকা হলো সরফা বাজার। সেখানেই প্রতিদিন একটি লোহার ঠেলাগাড়িতে করে চলাফেরা করতেন মঙ্গিলাল। তিনি শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী। পায়ের বদলে হাত ঢুকিয়ে জুতা ব্যবহার করে নিজেকে সামনে ঠেলে নিয়ে যেতেন। এ দৃশ্য দেখে অনেক পথচারীই তাঁকে সহানুভূতির চোখে দেখতেন। প্রতিদিন পথচলতি মানুষ ৫০০ থেকে ১ হাজার রুপি পর্যন্ত দান করতেন বলে জানা যায়।
কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর চমকপ্রদ তথ্য
ইন্দোরে ভিক্ষুক উচ্ছেদ অভিযানের সময় নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের নজরে আসেন মঙ্গিলাল। প্রাথমিকভাবে তিনি একজন অসহায় ভিক্ষুক বলেই মনে হয়েছিল সবার কাছে। কিন্তু খোঁজখবর শুরু হতেই বেরিয়ে আসে একেবারে ভিন্ন চিত্র। কর্মকর্তাদের কাছে মঙ্গিলাল নিজেই জানান, তাঁর তিনটি বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে একটি তিন তলা ভবন এবং দুটি বাড়ি শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায়। শুধু এটুকুই নয়, তাঁর নামে তিনটি ভাড়া দেওয়া অটো রেজিস্ট্রি করা আছে। এ ছাড়া তাঁর শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে রেডক্রসের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী আবাস প্রকল্পের আওতায় আলওয়াসায় এক বেডরুমের একটি ফ্ল্যাটেরও সন্ধান পেয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
ভিক্ষার বাইরেও মঙ্গিলালের আয়ের উৎস আছে
মঙ্গিলাল শুধু ভিক্ষার ওপর নির্ভর করে থাকেন না। তাঁর মালিকানায় রয়েছে তিনটি অটোরিকশা, যেগুলো ভাড়া দেওয়া হয়। তাঁর একটি গাড়িও আছে, যেটির জন্য চালক রাখা হয়েছে। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, সরফা বাজার এলাকায় তিনি সুদের বিনিময়ে টাকা ধার দেন। এই সুদ ব্যবসা থেকেই তিনি প্রতিদিন প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় করেন। কর্মকর্তাদের ধারণা অনুযায়ী, তাঁর ধার দেওয়া টাকার পরিমাণ মোটামুটি ৪ থেকে ৫ লাখ। সব মিলিয়ে তাঁর দৈনিক আয় একজন চাকরিজীবীর চেয়ে বেশি।
পরিবার ও বসবাসের অবস্থা
বর্তমানে মঙ্গিলাল আলওয়াসার সেই এক বেডরুমের ফ্ল্যাটে মা-বাবার সঙ্গে থাকেন। তাঁর ভাইদের নিজস্ব বাড়ি রয়েছে এবং তাঁরা আলাদা থাকেন। অর্থাৎ পারিবারিক দিক থেকেও তিনি পুরোপুরি অসহায় নন।
কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও পরবর্তী পদক্ষেপ
মঙ্গিলালকে নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর নারী ও শিশু উন্নয়ন দপ্তর তাঁর ব্যাংক হিসাব ও নগদ অর্থের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। যেহেতু তিনি একাধিক সম্পত্তির মালিক অথচ প্রধানমন্ত্রী আবাস প্রকল্পে ঘর পেয়েছেন, তাই বিষয়টি জেলা কালেক্টরের সামনে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করছে কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনায় সরকারি সুবিধার অপব্যবহার হয়েছে কি না, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
মুম্বাইয়ের ‘কোটিপতি ভিক্ষুক’-এর সঙ্গে মিল
মঙ্গিলালের গল্প একেবারে ব্যতিক্রমী হলেও তিনি একা নন। মুম্বাইয়ের ভরত জৈনের সঙ্গে তাঁর গল্পের মিল পাওয়া যায়। প্রায় ৪০ বছর আগে সিএসটি ও আজাদ ময়দান এলাকায় ভিক্ষা শুরু করেছিলেন ভরত জৈন। আজ তিনি দুটি ফ্ল্যাটের মালিক। সেগুলোর প্রতিটির মূল্য প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ রুপি করে। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭ কোটি ৫০ লাখ রুপি। এখনো ভিক্ষা করে তিনি দিনে ২ থেকে আড়াই হাজার রুপি আয় করেন।
মঙ্গিলালের এই গল্প শুধু চমকে দেয় না, এটি সমাজের বাস্তবতা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
সূত্র: এনডিটিভি