প্রযুক্তির ছোঁয়ায় আজ সবকিছুই হাতের মুঠোয়। কিন্তু ই-বুক আর অডিও বুকের ভিড়েও অনেকেই আছে, যারা পাতা উল্টে বই পড়তে ভালোবাসে। কাগজের পাতার গন্ধ আর বইয়ের পাতা ওলটানোর মৃদু আওয়াজের মাঝে তারা পরম শান্তি খুঁজে পায়। ডিজিটাল স্ক্রিনের যুগেও কি বইয়ের গন্ধ আপনাকে টানে? বিশ্বের কোন জায়গাগুলো অপেক্ষা করছে বইপ্রেমীদের জন্য? জেনে নিন এখান থেকে।
বিশ্বজুড়ে এমন কিছু জাদুকরি শহর বা গ্রাম রয়েছে, যা কেবল অপেক্ষা করছে বইপ্রেমীদের জন্য। এগুলোকে বলা হয় ‘বইয়ের শহর’ বা ‘বুক টাউন’। শান্ত পরিবেশ, মধ্যযুগীয় রূপকথার রাস্তা, আর সারি সারি প্রাচীন ও দুর্লভ বইয়ের দোকানে ঘেরা এই জায়গাগুলো যেকোনো বইপাগল মানুষের জন্য একেকটি স্বর্গ। ব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি থেকে হারিয়ে যেতে চাইলে ইমিগ্রেশনের সিলমোহর নিয়ে বেরিয়ে পড়তে পারেন এই বইয়ের শহরগুলোর উদ্দেশে। প্রকৃতির শান্ত রূপ আস্বাদন করতে করতে হাতে একটি প্রিয় বই নিয়ে কফিতে চুমুক দেওয়ার চেয়ে বড় বিলাসিতা একজন বইপ্রেমীর জন্য আর কী-ই বা হতে পারে!
ইংল্যান্ড ও ওয়েলস সীমান্তের কাছে অবস্থিত এই ছোট্ট শহরটিকে বলা হয় বিশ্বের প্রথম ‘বুক টাউন’। সত্তরের দশকে রিচার্ড বুথ নামের এক ব্যক্তি এখানকার একটি প্রাচীন দুর্গে পুরোনো বইয়ের দোকান খোলেন এবং পরবর্তী সময়ে এই শহরকে ‘বইয়ের রাজ্য’ হিসেবে ঘোষণা করেন। বর্তমানে মাত্র দেড় হাজার বাসিন্দার এই শহরে ২০টির বেশি বইয়ের দোকান রয়েছে। প্রতিবছর এখানে বসে বিখ্যাত হে ফেস্টিভ্যাল। এটি বিশ্বজুড়ে সাহিত্য অনুরাগী ও লেখকদের অন্যতম বড় মিলনমেলা। তাই যদি ইংল্যান্ড ভ্রমণের পরিকল্পনা থাকে, তাহলে বইপ্রেমী হয়ে থাকলে একবার হলেও ঘুরে আসতে পারেন হে-অন-ওয়াইয়ের রাস্তা থেকে।
লিসবনের উত্তরে পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত এই মধ্যযুগীয় দুর্গ শহরটি ২০১৩ সালে এক অভিনব রূপ ধারণ করে। এখানকার স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সবাই নিজেদের আঙিনায় বইয়ের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করেছে। একদম মুদিদোকান থেকে শুরু করে বড় হোটেল পর্যন্ত এই আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে। এখানকার একটি ১৩ শতকের প্রাচীন চার্চের ভেতরে গড়ে উঠেছে বিশাল বইয়ের দোকান। এর নাম গ্রান্দে লিভরারিয়া দে সান্তিয়াগো। এ ছাড়া দ্য লিটারেরি ম্যান নামের একটি হোটেল রয়েছে এখানে। সেখানে প্রায় ৫০ হাজার বইয়ের এক অবিশ্বাস্য সংগ্রহশালা অপেক্ষা করছে পাঠকদের জন্য।
মাত্র ৩০০ বাসিন্দার শান্ত গ্রাম নরওয়ের ফিয়াডল্যান্ড। এই গ্রামে বই লুকিয়ে আছে অদ্ভুত সব জায়গায়! এখানকার বাসস্টেশনের ওয়েটিং রুম, ঘোড়ার আস্তাবল, ব্যাংক, এমনকি পুরোনো পোস্ট অফিসের ভেতরেও দেখা মিলবে বইয়ের আলমারি। তবে এখানকার চমৎকার বৈশিষ্ট্য হলো ‘সবচেয়ে সৎ বইয়ের দোকান’। এটি সম্পূর্ণ মানুষ ছাড়া পরিচালিত একটি উন্মুক্ত বুকশেলফ, যেখান থেকে বই নিয়ে পাঠকেরা নিজেদের দায়িত্বে একটি বক্সে টাকা রেখে যান। তীব্র শীতের কারণে মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পর্যটকদের জন্য এটি খোলা থাকে।
সমুদ্রের কোল ঘেঁষে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত শহর উইগটাউন। স্কটল্যান্ডের জাতীয় বইয়ের শহর এটি। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ঘেরা এই জনপদে আড়াই লাখের বেশি বই এবং ১৬টি অনন্য বুকশেলফ রয়েছে। এসব বইয়ের বেশির ভাগই পুরোনো ও দুর্লভ। প্রতিবছর মে মাসে এখানে স্প্রিং উইকেন্ড পালিত হয়। এ ছাড়া শরৎকালে ১০ দিনব্যাপী বিখ্যাত উইগটাউন বুক ফেস্টিভ্যাল অনুষ্ঠিত হয়; যেখানে সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীত, নাটক ও শিল্পের চর্চা চলে।
দক্ষিণ কোরিয়ার ডিএমজেড সীমান্তের কাছে অবস্থিত শহর পাজু। এটি এক অদ্ভুত এবং অনন্য আধুনিক বুক টাউন। এখানকার প্রতিটি দালান, ক্যাফে, মিউজিয়াম এবং মানুষ কেবল বই তৈরি ও প্রকাশের কাজে নিয়োজিত। প্রায় ২৫০টি প্রকাশনা সংস্থার এই শহরে রয়েছে ‘ফরেস্ট অব উইজডম’ নামের এক সুবিশাল লাইব্রেরি এবং এখানে প্রতিবছর বসে ‘বুকশোরি’ উৎসব। সৃজনশীলতা আর আধুনিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন এই শহর।
যদিও এগুলো কোনো একক শহর নয়, তবুও বইপ্রেমীদের জন্য এই দুটি নাম তালিকায় না রাখলেই নয়।
আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতা শহরের এই বইপাড়া বিশ্বের বৃহত্তম পুরোনো বইয়ের বাজার। দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ এই রাস্তার দুই পাশে রয়েছে শত শত স্টল এবং ‘দাসগুপ্ত অ্যান্ড কোং’-এর মতো ঐতিহাসিক বইয়ের দোকান।
টোকিওর চিওডা ওয়ার্ডে অবস্থিত জিম্বোচো হলো জাপানের বইয়ের স্বর্গরাজ্য। শত শত বইয়ের দোকান, বুক-ক্যাফে এবং বইয়ের থিমভিত্তিক হোটেল নিয়ে গড়ে উঠেছে এই প্রাণবন্ত এলাকাটি।
ইউরোপ ও আমেরিকার আরও কিছু শহর
বেলজিয়ামের পাহাড়ি গ্রাম রেদু ১৯৮৪ সালে বিশ্বে দ্বিতীয় বুক টাউন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। আর ব্রুজের কাছাকাছি অবস্থিত দাম্মে তার শান্ত খাল ও পাথরে বাঁধানো রাস্তার ধারের প্রাচীন বইয়ের দোকানের জন্য বিখ্যাত।
মাত্র ১০০ জন বাসিন্দার এই মধ্যযুগীয় গ্রামে রয়েছে ১১টি পুরোনো বইয়ের দোকান। এটিকে স্পেনের প্রথম ভিল্লা দেল লিব্রো বা বইয়ের গ্রাম বলা হয়।
দক্ষিণ ফ্রান্সের একমাত্র বইয়ের শহর এটি, যা প্রাচীন বইয়ের পাশাপাশি বই বাঁধাই ও মুদ্রণশিল্পের ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে।
বার্লিনের দক্ষিণে অবস্থিত এই শহরকে বলা হয় বই ও বাংকার শহর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামরিক ইতিহাসের বাংকারের পাশাপাশি এটি এখন দুর্লভ বইয়ের এক বিশাল কেন্দ্র।
১১৮৮ সালের ইতিহাসসমৃদ্ধ এই মধ্যযুগীয় শহরে রয়েছে প্রায় ২০টি প্রাচীন বইয়ের দোকান, যেখানে ওলন্দাজ, ফরাসি ও ইংরেজি ভাষার বইয়ের মেলা বসে।
সেন্ট ক্রিক্স নদীর তীরে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক শহরটি একসময় কাঠের ব্যবসার জন্য বিখ্যাত হলেও আজ তা পরিণত হয়েছে আমেরিকার অন্যতম সেরা লিটারেরি ডেস্টিনেশনে।
সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফি, দ্য গার্ডিয়ান