গত রোববার অর্থাৎ ২৬ এপ্রিল বজ্রপাতে সারা দেশে মারা গেছেন ১৪ জন। পরদিনই একই কারণে সারা দেশে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। কালবৈশাখীর মৌসুম, অর্থাৎ এপ্রিল-মে মাসেই বজ্রপাত তুলনামূলক বেশি হয়। এ ছাড়া জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসের বিভিন্ন সময় বজ্রসহ ঝড় হয়ে থাকে। প্রতিবছর এই বজ্রপাতে দেশে অসংখ্য মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এই প্রাণহানি কমাতে বজ্রপাত হলে দুর্ঘটনা এড়াতে যা করবেন, তা জানা থাকতে হবে।
বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা
২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বজ্রপাতে মৃত্যু হয়েছে ১ হাজার ৭৪৬ জনের। দেশের ইতিহাসে এক দিনে বজ্রপাতে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের আগস্টে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৭ জনের প্রাণহানি উল্লেখযোগ্য। পরিসংখ্যান বলছে, গত এক দশকে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা দেশের মোট প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত মৃত্যুর এক-তৃতীয়াংশের বেশি।
যে কারণে বজ্রপাত বেড়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত তাপমাত্রা বজ্রপাত বাড়ার অন্যতম কারণ। মোবাইল ফোনের টাওয়ারের চার্জ, বায়ুদূষণ এবং নগরায়ণের ফলে সৃষ্ট তাপ নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এ ছাড়া বড় গাছ কেটে ফেলার ফলেও ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে।
বজ্রপাতে মৃত্যুঝুঁকি কেন বাড়ছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গায় থাকার কারণে মূলত দুর্ঘটনা বেশি ঘটে। বিশেষ করে কৃষক, জেলে বা মাঠে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ বাইরে থাকা অবস্থায় ঝড়ের কবলে পড়লে দুর্ঘটনার শিকার হন। এ ছাড়া নিরাপদ আশ্রয় এবং সচেতনতার অভাব এই ঝুঁকির অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত।
বজ্রপাতের সময় করণীয় কী, তা জেনে রাখলে দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব।
বজ্রপাতের সময় দুর্ঘটনা এড়াতে যা করা যেতে পারে
আকাশে ঘন কালো মেঘ দেখা দিলে বাইরে বের না হওয়াই ভালো। একান্তই বের হতে হলে রাবারের জুতা পরে বের হতে পারেন। এ ছাড়া যা করবেন—
- বজ্রপাতের সময় খোলা জায়গা, খোলা মাঠ বা উঁচু জায়গায় থাকবেন না। ঝড়ের পূর্বাভাস পেলে যত দ্রুত সম্ভব কোনো দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। টিনের ছাউনি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলুন।
- বজ্রপাতের সময় ধানখেত বা খোলা মাঠে থাকলে দ্রুত পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকুন।
- উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও তার বা ধাতব খুঁটি, মোবাইল ফোন টাওয়ার থেকে দূরে থাকুন।
- বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভেতরে অবস্থান করলে গাড়ির ধাতব অংশের সঙ্গে শরীরের সংযোগ ঘটাবেন না। সম্ভব হলে গাড়িটি নিয়ে কোনো কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিন।
- বাড়িতে থাকলে জানালার কাছাকাছি বা বারান্দায় থাকবেন না। জানালা বন্ধ রাখুন এবং ঘরের ভেতরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম থেকে দূরে থাকুন।
- বজ্রপাতের সময় মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, ল্যান্ডফোন, টিভি, ফ্রিজসহ সকল বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন এবং এগুলো বন্ধ রাখুন।
- বাইরে থাকলে এ সময় ধাতব হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করবেন না। প্রয়োজনে প্লাস্টিকের বা কাঠের হাতলযুক্ত ছাতা ব্যবহার করতে পারবেন।
- বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে যাবেন না। এ সময় সমুদ্র বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে অবস্থান করুন।
- বজ্রপাত ও ঝড়ের সময় বাড়ির ধাতব কল, সিঁড়ির রেলিং, পাইপ ইত্যাদি স্পর্শ করবেন না।
- খোলা জায়গায় অনেকে একত্রে থাকার সময় বজ্রপাত শুরু হলে প্রত্যেকে ৫০ থেকে ১০০ ফুট দূরে দূরে সরে যান।
- বজ্রপাতে কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহতদের মতো করেই চিকিৎসা করতে হবে। প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসককে ডাকতে হবে বা হাসপাতালে নিতে হবে। বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
- যাঁরা নতুন ভবন নির্মাণ করছেন, তাঁরা বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন করার বিষয়টি নিশ্চিত করুন।